অভিযোগের তীর দুই শিশুর সৎ বাবা ট্রাক ড্রাইভার রফিকের দিকে
আলি আবরার
খুলনায় ট্রিপল হত্যার মুল কিলার দুই শিশুর সৎ বাবা রফিক হওলাদারকে খুঁজছে পুলিশ। প্রতিশোধ নিতেই শাশুড়ি বেবী বেগম (৬২), সৎ ছেলে শামীম (১৩) ও মুস্তাকিমকে (৪) হত্যা করা হয়। দীর্ঘদিনের ক্ষোভের প্রতিশোধ নিতে নগরীর সোনাডাঙ্গা থানার দারুল আমান মসজিদ রোড ট্রিপল হত্যাকান্ড- সংগঠিত হয়েছে বলে পুলিশের প্রাথমিক ধারনা।
গতকাল শনিবার রাতে শিশু দু’টির প্রকৃত বাবা মাসুম ব্যাপারী বাদী হয়ে সোনাডাঙ্গা থানায় মামলা দায়ের করেন। মূল ঘাতক রফিক হাওলাদারকে গ্রেপ্তারে রাতভর দৌলতপুর থানার মহেশ্বরপাশা ও মানিকতলা এলাকায় অভিযান চালিয়ে ব্যর্থ হয় পুলিশ।
এদিকে হেফাজতে নেওয়া শিশু দু’টির মা’কে পরিবারের অন্য সদস্যদের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হবে বলে জানাগেছে। আজ রোববার দুপুরের পর ময়নতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে লাশ তিনটি হস্তান্তর করা হয়।
এর আগে গত শনিবার সন্ধ্যা ৬ টার দিকে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ এর মাধ্যমে সংবাদ পেয়ে সোনাডাঙ্গা থানা এলাকার দারুল আমান মসজিদ রোড বিলপাড় রোডের বাসিন্দা এসএম শরীফুল ইসলামে বাড়ি থেকে নানীসহ দু’টি শিশুর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। রাতে নিহত শিশু দু’টির মা মেরী বেগমকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নেয় পুলিশ।
নিহতরা হলেন, মেরী বেগমের মা নানী বেবী বেগম (৬২) এবং দুই সন্তান শামীম (১৩) ও মুস্তাকিম (৪)।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও সোনাডাঙ্গা থানার ওসি (তদন্ত) অনিমেষ মন্ডল বলেন, শিশু দু’টির মা মেরী বেগমের প্রথম স্বামী মাসুম ব্যাপরীর সাথে ছাড়া ছাড়ি হওয়ার পর মনিকতলা এলাকার বাসিন্দা আলমগীর হাওলাদারের ছেলে রফিক হওলাদারকে বিয়ে করে।
বিয়ের পর থেকে মেরী বেগমের মা বেবী বেগম ও বড় ছেলে শামীম বিষয়টি ভাল চোখে দেখত না। এ নিয়ে তাদের পরিবারের মধ্যে প্রায় কলহ লেগে থাকত। ঈদের দিন (বৃহস্পতিবার) রাত সাড়ে ১২টায় তাদের মধ্যে ঝগড়া হয়। সে সময় মেরীর মা নানী বেবী বেগম রফিককে উদ্দেশ্য করে বলে, ‘তোকে এখানে আসতে নিষেধ করেছি’. এ কথা বলে রাতে রফিককে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়।
তদন্ত কর্মকর্তা আরও জানান, ওই দিন রাতে নানীসহ দু’নাতী ঘরের ঘুমিয়ে পড়ে। পাশের ঘরে মেরী বেগম অবস্থান করে। পরের দিন সকালে ৮টার দিকে ঘুম থেকে উঠে মেরী বেগম দেখেন তার রুম বাইরে থেকে দরজা দেওয়া।
তিনি তখন সেটা খোলার একাধিক চেষ্টা করে ব্যার্থ হন। ধাক্কাধাক্কি করার এক পর্যায়ে রফিক দরজাটি খুলে দেয়। মেরী তখন তাকে জিজ্ঞাসা করে যে- ‘তুমি তো রাতে চলে গেলে কখন বাড়ি ফিরেছ’? রফিক তখন বলে ‘আমি ভোরে আসছি’। ‘আসার সময় দেখলাম মা তোমার দু’ছেলে নিয়ে চলে গেছে’। ‘ ওনারা আর আমাদের সাথে থাকবেনা। ঘরে তালা দিয়ে চলে গেছে’।
এ গল্পটা রফিক নিজেই তৈরী করে তার স্ত্রী মেরীকে সু-কৌশলে জানায়। ধারণা করা হচ্ছে এ সময় তারা দুজনই নেশার ঘোরে ছিল। পাশের ঘরে তালা দেওয়া। তাদের মনে হচ্ছেনা একবার তালাটি ভাঙ্গি।
এদিকে বেলা বাড়ার সাথে সাথে তাদের খোঁজ নেওয়ার জন্য বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুজি শুরু করেন মেরী। কিন্তু তার একবারের জন্যও মনে হয়নি যে পাশের ঘরের তালা ভাঙ্গি। এরপর মেরী পুলিশের কাছে না গিয়ে বিভিন্ন কবিরাজের কাছে যান যাতে মা ও দুই ছেলে ফিরে আসে। বিষয়টি আশপাশের লোকজনকেও জানানো হয়নি।
তদন্ত কর্মকর্তা মেরীর বক্তব্যের উদাধৃতি দিয়ে আরো জানায়, এক পর্যায়ে মেরী পাশের রুমের তালা ভাঙ্গার চেষ্টা করা হলে রফিক জানায়, তারাতো দুরে গেছে তালা ভাঙ্গবা কেনো। পরবর্তীতে বিকেলে মেরী বেগমের খালা রেনু বেগম বোন বেবী বেগমের খোঁজ নিতে গেলে পচা গন্ধ আসতে থাকলে রফিক জানায় ঘরে ইদুর মরে পচে আছে বলে তাদের জানায়।
তখন ক্ষিপ্ত হয়ে মেরী ঘরের তালা কাটবার জন্য দোকান থেকে হেক্সো ব্লেড আনতে গেলে চতুর রফিক ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। স্থানীয়দের সাথে নিয়ে ঘরের দরজা খুলে খাটের নিচে বেবী বেগম ও ট্রাংকের ওপর কম্বল দিয়ে মোড়ানো অবস্থায় শামীমের মরদেহ দেখতে পেয়ে স্থানীয়রা ৯৯৯ এ ফোন দিলে সোনাডাঙ্গা থানা পুলিশ সেখানে যায়। সেই সময় পর্যন্ত অপর সন্তান মুস্তাকিমের কোনো খোঁজ পাচ্ছিল না পুলিশ ও মেরী বেগম। পরে সিআইডির টিম ঘটনাস্থলে গিয়ে ওয়ারড্রব থেকে ছোট ছেলে মুস্তাকিমের লাশ বের করে।
রফিক এ ঘটনাটি ঘটিয়েছে বলে তিনি প্রাথমিকভাবে সন্দেহ করছেন। এর সাথে কেউ সহযোগি হিসেবে থাকতে পারে তা তদন্ত সাপেক্ষে বলা যেতে পারে।
ওসি (তদন্ত) অনিমেষ মন্ডল বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে রফিকের কাছে মেইন গেটের চাবি রয়েছে। সেই চাবির মাধ্যমে মেইন গেট খুলে রাত সাড়ে ১২ টা-আড়াইটার মধ্যে তাদের তিনজনকে হত্যা করে রফিক। শনিবার দুপুরে তারা একসাথে খাওয়া দাওয়া করেছিল।
তিনি আরও জানান, রফিক পেশায় একজন ট্রাক ড্রাইভার। তার বিরুদ্ধে এর আগে থানায় একটি চুরির মামলা রয়েছে। মেরী বেগম ও রফিক মাদকাশক্ত। গত শুক্রবারও তাকে নেশাগ্রস্থ করানো হয়।


