
কর্মবিরতি দুই দিনের জন্য স্থগিত করেছে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। নৌপরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে গতকাল বৃহস্পতিবার বৈঠকের পর এ ঘোষণা দেওয়া হয়। নৌ উপদেষ্টা চুক্তি প্রক্রিয়া বাতিলের বিষয়ে কিছু বলেননি। উল্টো প্রক্রিয়া চালিয়ে নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে গেছেন। দাবি না মানলে রোববার থেকে আবার কর্মবিরতি কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছেন সংগ্রাম পরিষদের নেতারা।
গত শনিবার থেকে তিন দিন ৮ ঘণ্টা করে এবং মঙ্গলবার থেকে লাগাতার কর্মবিরতি পালন করছেন বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীরা। সর্বশেষ দুই দিনে বন্দরে নতুন কোনো জাহাজ নোঙর করতে পারেনি। বন্দর থেকে ডেলিভারিও হয়নি কোনো পণ্য। ২১টি ডিপো থেকে প্রতিদিন গড়ে দুই হাজার ৮০০ রপ্তানি কনটেইনার আসে বন্দরে। কিন্তু গত দুই দিনে এটি নেমেছে শতকের ঘরে। ডিপোতে ২০ ফুট এককের রপ্তানি কনটেইনার জমেছে ১৩ হাজারের বেশি। আর বন্দরে আমদানি কনটেইনার জমেছে প্রায় ৩৮ হাজার। বহির্নোঙরে পণ্য খালাসের অপেক্ষায় জাহাজ আছে শতকের বেশি। পুরোপুরি অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে বন্দর, কাস্টমস ও ডিপোতে। বন্দর ব্যবহারকারী ব্যবসায়ীরা উদ্বেগ প্রকাশ করে দ্রুত এ সমস্যা সমাধানে তাগিদ দিয়েছেন সরকারকে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল বন্দরে আসেন নৌ উপদেষ্টা। পৃথকভাবে বৈঠক করেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধান এবং শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে।
সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহীম খোকন বলেন, ‘উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে আমরা দাবি জানিয়েছি– নিউমুরিং টার্মিনাল ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়া যাবে না, কর্মচারীদের বিরুদ্ধে নেওয়া প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রত্যাহার করতে হবে, বন্দর চেয়ারম্যান এস এম মনিরুজ্জামানকে পদত্যাগ করতে হবে। নিউমুরিং টার্মিনাল নিয়ে তিনি (উপদেষ্টা) উচ্চপর্যায়ে আলাপ করার কথা বলেছেন। বাকি দাবিগুলোর বিষয়ে আশ্বস্ত করেছেন। এ জন্য আমরা শনিবার পর্যন্ত কর্মসূচি স্থগিত করেছি। তবে এর মধ্যে সিদ্ধান্ত না এলে রোববার থেকে কর্মসূচি চলবে।’
নৌ উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক
বন্দরের অচলাবস্থা দূর করতে নৌপরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন গতকাল সকালে চট্টগ্রাম বন্দরে আসেন। চার নম্বর গেটের ফটকের বাইরে তিনি বিক্ষোভকারীদের কবলে পড়েন। এ সময় আন্দোলনকারীরা ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড, ডিপি ওয়ার্ল্ড, গো ব্যাক গো ব্যাক’, ‘মা মাটি মোহনা, বিদেশিদের দেব না’ স্লোগানে প্রায় ১০ মিনিট তাঁর গাড়ি আটকে রাখেন। সেনা ও পুলিশের হস্তক্ষেপে পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। বৈঠকে যোগ দেন উপদেষ্টা।
বৈঠক থেকে বেরিয়ে নৌ উপদেষ্টা সাংবাদিকদের বলেন, ‘রোজার আগে বন্দর বন্ধ করে এ ধরনের আন্দোলন অমানবিক। বন্দর বন্ধ রাখার এখতিয়ার কারও নেই। বাধা দিলে সরকার কঠোর হতে পারবে। কাল (শুক্রবার) সকাল থেকে সচল না হলে সরকার হয়তো অন্যভাবে দেখবে।’
নিউমুরিং টার্মিনালের চুক্তি নিয়ে এম সাখাওয়াত বলেন, ‘চুক্তি বোধ হয় ঠেকানো যাবে না। তবে দেশের ক্ষতি করে কোনো চুক্তি হবে না।’ ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে নেগোসিয়েশন চূড়ান্ত হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘এখনও চূড়ান্ত হয়নি। প্রক্রিয়া চলমান।’
গত দুই দিনে খালাস হয়নি একটিও
টানা কর্মবিরতিতে প্রথম তিন দিনে কাজে বিঘ্ন ঘটে। ৩ ফেব্রুয়ারি অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি শুরু হওয়ার পর গত দুই দিনে একটি কনটেইনারও খালাস হয়নি। জাহাজ থেকেও ওঠানো-নামানো যায়নি কোনো কনটেইনার।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, ‘মঙ্গলবার বন্দর থেকে পণ্যভর্তি কোনো কনটেইনার খালাস হয়নি। বুধবারও কনটেইনার খালাস করার আগ্রহ দেখাননি কেউ। তবে কর্মবিরতি স্থগিত হওয়ায় শুক্র ও শনিবার স্বাভাবিক কাজ শুরু হবে।’
আমদানি পণ্য নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর সীমায় এখন জাহাজ আছে শতাধিক। এগুলোর বেশির ভাগ লাইটার জাহাজের মাধ্যমে পণ্য খালাস করবে। জেটিতে কনটেইনার ওঠানো-নামানোর কার্যক্রম দুই দিন ধরে বন্ধ। নতুন কোনো জাহাজ নোঙর করতে পারছে না। আবার পণ্য খালাস শেষ হলেও কোনো জাহাজ জেটি ত্যাগ করতে পারছে না। বন্দর চ্যানেল সরু হওয়ায় বিদেশি বড় জাহাজগুলোকে বন্দর ত্যাগ করতে সহায়তা করেন নিজস্ব পাইলটরা। তারা কাজে যোগ না দেওয়ায় বন্ধ হয়ে গেছে জাহাজ চলাচল কার্যক্রম।
সীমিত পরিসরে কাজ চলছে সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়ে পরিচালিত আরএসজিটি চিটাগং টার্মিনালে। বন্দরের প্রধান তিন টার্মিনালে শ্রমিক-কর্মচারী কাজে যোগ দেননি। প্রথম তিন দিন কর্মবিরতির পর তারা কাজে যোগ দিলেও অনির্দিষ্টকালের কর্মসূচি আসার পর আসেননি কেউ। গতকালও আসেননি যন্ত্রপাতি পরিচালনা করা অপারেটররা।
২১টি ডিপো থেকে বন্দরে কনটেইনার পরিবহন বন্ধ ছিল। তাই রপ্তানি কনটেইনারের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। কর্মবিরতি শুরুর আগে ৩০ জানুয়ারি ২১টি ডিপোতে রপ্তানি কনটেইনার ছিল আট হাজার ১৭টি। গতকাল সেটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ১৫০টিতে। বন্দর জেটিতে বাড়ছে আমদানি কনটেইনারের সংখ্যা। ৩০ জানুয়ারি বন্দরে আমদানি কনটেইনার ছিল ৩৫ হাজার ৩৪২টি। গতকাল তা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৮ হাজারে।
বন্দর ব্যবহারকারীরা যা বলছেন
শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান শফিকুল আলম জুয়েল বলেন, ‘বর্তমানে বন্দর সীমায় আসার পরও তাৎক্ষণিকভাবে জাহাজ জেটিতে ভেড়ানোর সুযোগ নেই। কারণ, পর্যাপ্ত জেটিই নেই বন্দরে। চ্যানেলে নেই চাহিদা মতো নাব্য। তাই জোয়ার-ভাটার হিসাব নিয়ে জাহাজ বন্দরে আনতে হয়। জট না থাকলেও এখন গড়ে ১৪ থেকে ২০ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয় প্রতিটি জাহাজকে। এনসিটি বিদেশিদের হাতে গেলে এসব সমস্যার একটিতেও নতুন কিছু যোগ হবে না। তবে দ্রুত কনটেইনার হ্যান্ডল করতে পারবে তারা জেটিতে।’
সি কম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিরুল হক বলেন, ‘আমদানি কনটেইনার কত দ্রুত খালাস হবে, তা নির্ভর করে কাস্টমসের প্রক্রিয়া কত দ্রুত শেষ হবে তার ওপর। আমার জানা মতে, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের মাধ্যমে পণ্য খালাসে গড়ে ১২ দিন সময় লাগে। এত সময় লাগে না বিশ্বের অন্য কোনো দেশে। এখানে বন্দর কর্তৃপক্ষ বা অপারেটরের কিছুই করার নেই। সাদা চামড়া কালো চামড়া সবাই এখানে সমান। তাই নজর দিতে হবে এটাতে।’
১৫ নেতার সম্পদে নজর
এদিকে আন্দোলনকারী ১৫ কর্মচারীর স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) চিঠি দিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে তাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারির অনুরোধ করা হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিমের সই করা এই চিঠির অনুলিপি পাঠানো হয়েছে নৌপরিবহন উপদেষ্টার দপ্তর, দুদক এবং জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার মহাপরিচালকের কাছে।
চিঠিতে নাম রয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক মো. হুমায়ুন কবীর, মো. ইব্রাহিম খোকন, মো. ফরিদুর রহমান, মোহাম্মদ শফি উদ্দিন, রাশিদুল ইসলাম, আবদুল্লাহ আল মামুন, মো. জহিরুল ইসলাম, খন্দকার মাসুদুজ্জামান, মো. হুমায়ুন কবীর (এসএস পেইন্টার), মো. শাকিল রায়হান, মানিক মিঝি, মো. শামসু মিয়া, মো. লিয়াকত আলী, আমিনুর রসুল বুলবুল ও মো. রাব্বানীর।
প্রকাশক ও সম্পাদক- আলি আবরার । নিরালা, খুলনা থেকে প্রকাশিত