আলি আবরার
একসময়ের ‘শান্তির শহর’ হিসেবে পরিচিত খুলনায় দ্রুতগতির নগরায়ন ও যান্ত্রিকতার প্রভাবে দিন দিন প্রকট হয়ে উঠছে শব্দদূষণ। মানুষের চাপ বৃদ্ধি, যানবাহনের আধিক্য এবং ট্রাফিক নিয়মের তোয়াক্কা না করে অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত হর্ন ব্যবহারের ফলে নগরবাসীর জনস্বাস্থ্য এখন হুমকির মুখে।
সদ্য অনার্স শেষ করে চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছে খুলনার নিজখামার এলাকার সাকিবুর রহমান। প্রত্যেক দিনই তাকে কোচিং করতে আসতে হয় গল্লামারিতে। সাকিবুরের সাথে কথা হলে সে জানান , রাস্তাঘাটে বিভিন্ন যানবাহন বিশেষ করে ইজিবাইক অহেতুক হর্ন বাজায়৷ গল্লামারিতে জ্যামে বা গাড়ির সিরিয়ালে বসে থাকলে ইজিবাইক বা মোটরসাইকেলের হর্নে হঠাৎ হঠাৎ মেজাজ খিট খিটে হয়ে ওঠে ও সাময়িক মানসিক অস্বস্তি লাগে।
পরিবেশ অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নগরীর প্রায় প্রতিটি ব্যস্ত ও মিশ্র এলাকায় শব্দের মাত্রা নির্ধারিত সীমাকে ছাড়িয়ে গেছে। অধিদপ্তরের চলতি বছরের আগস্ট মাসের তথ্য অনুযায়ী, দৌলতপুরে শব্দের মাত্রা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৭ ডেসিবেলে, যা গত বছর ছিল ৭৬.৯ ডেসিবেল। এছাড়া সোনাডাঙ্গায় ৮৪.৫ ডেসিবেল, শিববাড়ি মোড়ে ৮২.৭৫ ডেসিবেল, বয়রা বাজারে ৮০.২ ডেসিবেল, গল্লামারীতে ৮০.৫ ডেসিবেল, নিউমার্কেটে ৭৯.৫ ডেসিবেল এবং জিরোপয়েন্টে ৭৯.৪ ডেসিবেল রেকর্ড করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বর্তমানে খুলনার বিভিন্ন এলাকায় শব্দের গড় মাত্রা প্রায় ৮০ ডেসিবেলের কাছাকাছি অবস্থান করছে। অথচ বাংলাদেশ সরকারের ‘শব্দ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা ২০২৫’ অনুযায়ী মিশ্র ও বাণিজ্যিক এলাকায় দিনের বেলায় শব্দের সর্বোচ্চ সহনীয় মাত্রা যথাক্রমে ৬০ ও ৭০ ডেসিবেল হওয়ার কথা।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, চালকদের অদক্ষতা, অসচেতনতা, ঘনঘন ও অপ্রয়োজনীয় হর্ন বাজানো এবং যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এই দূষণ তরান্বিত হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নতুন সুপারিশ অনুযায়ী সড়ক পরিবহনজনিত শব্দের নিরাপদ মাত্রা ৫৩ ডেসিবেলের নিচে হওয়া বাঞ্ছনীয় হলেও খুলনায় তা মাত্রাতিরিক্তভাবে বেড়ে চলেছে। শব্দদূষণের এই ভয়াবহতা সম্পর্কে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নাক-কান-গলা বিভাগের প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মহসিন বলেন, মানুষের কান সাধারণত সর্বোচ্চ ৭০ ডেসিবেল পর্যন্ত শব্দ সহ্য করতে পারে। এর চেয়ে বেশি মাত্রার শব্দ কানের ভেতরের হাড়গুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, যা চিরতরে বধিরতা বা শ্রবণশক্তি হারানোর কারণ হতে পারে। বিশেষ করে শিশু, অন্তঃসত্ত্বা ও হৃদ্রোগীরা এই দূষণের কারণে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। খুলনা জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. হারুন-অর-রশীদ জানান, শব্দদূষণ রোধে বিআরটিএ ও পুলিশের সহযোগিতায় নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে এবং সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ সেশন পরিচালিত হচ্ছে। খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার শফিকুল ইসলাম জানান, হাইড্রোলিক হর্ন ও সাইলেন্সার পাইপ পরিবর্তন করে অতিরিক্ত শব্দ সৃষ্টিকারী যানবাহনের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সকাল ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত ট্রাফিক সদস্যরা মাঠে থেকে প্রথমে সতর্ক এবং পরবর্তীতে নতুন যন্ত্রের সাহায্যে শব্দ পরীক্ষা করে আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছেন। অন্যদিকে, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) খুলনা জেলা শাখার সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার মনে করেন, কেবল আইন প্রণয়ন বা জরিমানা নয়, চালকসহ সাধারণ মানুষের মাঝে সচেতনতা তৈরি এবং প্রশিক্ষণের সময় বিষয়টি গুরুত্বের সাথে সামনে আনা জরুরি।
খুলনা শহরের এই নীরব স্বাস্থ্যঝুঁকি কেবল একটি সাময়িক নাগরিক সমস্যা নয়, বরং এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার পথে এক বড় অশনিসংকেত। ‘শান্তির শহর’ খুলনার ঐতিহ্য ও প্রাণ ফিরিয়ে আনতে আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং নিয়মিত অভিযানের পাশাপাশি চালক ও সাধারণ মানুষের মানসিকতা পরিবর্তনের কোনো বিকল্প নেই।


