জ্বালানি সাশ্রয়ে এলাকাভিত্তিক লোডশেডিংয়ের পরিকল্পনা ঘোষণার দিন হঠাৎ দেশের শেয়ারবাজারে বড় ধরনের দরপতন হয়েছে। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এসব বিষয় এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব পড়ায় এই দরপতন হয়েছে বলে বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক দুই মাস আগের অবস্থায় ফিরে গেছে। সূচকটি ৮৭ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ২১৭ পয়েন্টে। এর আগে সর্বশেষ গত ২৫শে মে এ সূচকটি ৬ হাজার ১৮৮ পয়েন্টের সর্বনিম্ন অবস্থানে ছিল। সব মিলিয়ে দর হারিয়েছে ৩৫২টি কোম্পানি। এর বিপরীতে বেড়েছে মাত্র ১২টি কোম্পানির দর।
বড় ধরনের দরপতনের কারণে এদিন ঢাকার বাজারে লেনদেন হওয়া কোম্পানিগুলোর বেশির ভাগই ক্রেতাশূন্য হয়ে পড়ে। আতঙ্কিত বিনিয়োগকারীদের অনেকে শেয়ার বিক্রি করতে গিয়েও ক্রেতা না থাকায় বিক্রি করতে পারেননি। বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বেশ কিছুদিন ধরে বাজারে মন্দাভাব চলছে। বিশেষ করে ঈদের ছুটির পর থেকে প্রতিদিনই একটু একটু করে সূচক কমছিল।
তারই ধারাবাহিকতায় বড় ধরনের দরপতন হয়েছে। কয়েক দিনের টানা দরপতনে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হওয়ায় বড় ধরনের এ দরপতন হয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
এক ব্রোকারেজ হাউসের শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট, জ্বালানি সংকটসহ নানা কারণে অর্থনীতিতে এক ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। যার কমবেশি প্রভাব শেয়ারবাজারের কোম্পানিগুলোর ওপর পড়ছে। জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন আপাতত স্থগিতের সিদ্ধান্তও নিয়েছে সরকার। এমন পরিস্থিতিতে শেয়ারবাজারে তার প্রভাব দেখা যাচ্ছে। কারণ, যেকোনো অর্থনৈতিক সংকটের তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ে শেয়ারবাজারে। এ ছাড়া দেশ ও বিশ্ব অর্থনীতির টালমাটাল অবস্থার পর পুঁজিবাজারের কারসাজিতে জড়িতদের শাস্তি চেয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), এমন খবর ছড়িয়ে পড়ে বাজারে। বিনিয়োগকারীদের শঙ্কা শেয়ারের দাম আরও কমতে পারে, এই ভয়ে বিক্রির হিড়িক পড়েছে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সপ্তাহের দ্বিতীয় কর্মদিবস সোমবার ব্যাংক-বিমা আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি এবং প্রকৌশলসহ প্রায় সব খাতের শেয়ারের দাম কমেছে। আর এতে ডিএসই প্রধান সূচক কমেছে ৮৭ পয়েন্ট। অপর পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সূচক কমেছে ২৪২ পয়েন্ট। এতে বিনিয়োগকারীদের পুঁজি কমেছে ৫ হাজার ৮১০ কোটি ৫৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা।
জানা গেছে, গত রোববার আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব শেখ মোহাম্মদ সলিম উল্লাহর নেতৃত্বে মন্ত্রণালয়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেট সহায়তা দিতে দেশের পুঁজিবাজার কারসাজিতে জড়িতদের শাস্তি চেয়েছে আইএমএফ। এছাড়াও খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে আইএমএফ পরামর্শ দিয়েছে। ব্যাংক খাতের তদারকি শক্তিশালী করার পাশাপাশি কর্পোরেট সুশাসন উন্নত করার তাগিদ দিয়েছে সংস্থাটি।
সার্বিক বিষয়ে ডিএসই’র সাবেক পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন বলেন, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রভাব, মুদ্রাবাজারে অস্থিরতায় বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বিক্রি করে টাকা তুলে নিচ্ছেন। পাশাপাশি আইএমএফ পুঁজিবাজারে কারসাজির সঙ্গে জড়িতদের বিচার চেয়েছে। এসবের একটা প্রভাব পড়েছে শেয়ারবাজারে।
ডিএসইর তথ্যমতে, গতকাল ক্রেতার চেয়ে বিক্রেতার সংখ্যা বেশি থাকার মধ্যদিয়ে দিনের লেনদেন শুরু হয়। ফলে দিনভর সূচক পতনের মধ্যদিয়ে লেনদেন হয়েছে। এদিন ডিএসইতে ৩৮২টি প্রতিষ্ঠানের ১৩ কোটি ৪২ লাখ ৬৮ হাজার ২২৬টি শেয়ার ও ইউনিট কেনা-বেচা হয়েছে। ডিএসইতে ৫১৫ কোটি ২৯ লাখ ৭৬ হাজার টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। আগের দিন লেনদেন হয়েছিল ৫৯৩ কোটি ৪৯ লাখ ৮১ হাজার টাকার শেয়ার। বাজারে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয়েছে ডেল্টা লাইফের শেয়ার। এরপর যথাক্রমে রয়েছে- বেক্সিমকো, ফরচুন সুজ, গ্রামীণফোন, ওরিয়ন ইনফিউশন, কেডিএস এক্সেসরিজ, তিতাস গ্যাস, বৃটিশ অ্যামেরিকান টোবাকো, ওরিয়ন ফার্মা এবং এইচ আর টেক্সটাইল লিমিটেড।
দেশের অপর পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ২৪২ পয়েন্ট কমে ১৮ হাজার ২৮০ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। এ বাজারে ২৯৭টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার লেনদেন হয়েছে। এরমধ্যে ১৭টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বেড়েছে, কমেছে ২৬০টির, আর অপরিবর্তিত রয়েছে ২০টির। এদিন সিএসইতে লেনদেন হয়েছে ১৩ কোটি ৬১ লাখ ৩৬ হাজার ৬৯৭ টাকা। এর আগের দিন লেনদেন হয়েছিল ১৯ কোটি ৫৯ লাখ ৭৩ হাজার ১৭৯ টাকা।
পিএসএন/এমআই
প্রকাশক ও সম্পাদক- আলি আবরার । নিরালা, খুলনা থেকে প্রকাশিত