প্রযুক্তির উৎকর্ষতা আমাদের জীবনে যেমন সুযোগের দুয়ার খুলে দিয়েছে, তেমনি নতুন নতুন সমস্যারও জন্ম দিয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম হলো সোশ্যাল মিডিয়া আসক্তি। আমরা দিন দিন বাস্তব জীবনের সম্পর্ক, অনুভূতি ও অভিজ্ঞতাগুলোকে অবহেলা করে সোশ্যাল মিডিয়ার ফ্যান-ফলোয়ার, লাইক-কমেন্ট ও শেয়ারের জগতে ডুবে যাচ্ছি। এটি শুধু আমাদের মানসিক ও সামাজিক জীবনে নয়, বরং আমাদের আত্মপরিচয় ও মূল্যবোধেও মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।
আজকাল আমরা যে কোনো মুহূর্তের মূল্য নির্ধারণ করি তার সোশ্যাল মিডিয়া প্রতিফলনের ওপর। প্রকৃতিতে ঘুরতে গেলে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগের বদলে ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল ঠিক করতে ব্যস্ত থাকি, পারিবারিক বা বন্ধুত্বপূর্ণ আড্ডায় মনোযোগ দেওয়ার পরিবর্তে কে কতটা লাইক পেল—তা নিয়েই চিন্তিত থাকি। বাস্তবিক যোগাযোগের চেয়ে ভার্চুয়াল যোগাযোগই আমাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
সোশ্যাল মিডিয়া মূলত যোগাযোগের একটি মাধ্যম, কিন্তু বর্তমানে এটি অনেকের জন্য একটি নেশায় পরিণত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি "ডোপামিন লুপ" তৈরি করে—যেখানে লাইক, কমেন্ট, শেয়ার পাওয়ার মাধ্যমে মস্তিষ্ক সাময়িক আনন্দ অনুভব করে, যা মানুষকে আরও বেশি সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয় থাকতে বাধ্য করে। ধীরে ধীরে এটি আসক্তির রূপ নেয়, এবং ব্যক্তি বাস্তব জীবনে মিথস্ক্রিয়া কমিয়ে দিয়ে কৃত্রিম এক আত্মতুষ্টিতে ডুবে যায়।
এর ফলে তৈরি হচ্ছে একধরনের মানসিক সমস্যা—সোশ্যাল মিডিয়া অ্যানজাইটি, যেখানে মানুষ সারাক্ষণ উদ্বিগ্ন থাকে তার পোস্টে কেমন প্রতিক্রিয়া আসছে, কেউ তাকে অনুসরণ করছে কি না, তার চেহারা, লাইফস্টাইল, ব্যক্তিত্ব সোশ্যাল মিডিয়ার "আদর্শ" মানদণ্ডে পৌঁছাতে পারছে কি না। এমনকি অনেকে নিজেদের মূল্যায়নও করেন অন্যদের ভার্চুয়াল প্রতিক্রিয়ার ওপর ভিত্তি করে, যা এক ভয়াবহ প্রবণতা।
আজকাল মানুষের জীবনে ঘটিত ঘটনাগুলোর গুরুত্ব নির্ধারিত হচ্ছে সেগুলো সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করা হয়েছে কি না তার ওপর। বাস্তবে কোনো মুহূর্ত উপভোগ করা বা কোনো অভিজ্ঞতা অর্জনের পরিবর্তে এখন মানুষ ভাবে, "এটা কি ভালোভাবে পোস্ট করা যাবে?"—যেন বাস্তবতা নয়, ভার্চুয়াল স্বীকৃতিই মুখ্য।
এই প্রবণতা কেবল ব্যক্তিগত জীবনের জন্য নয়, সামগ্রিক সামাজিক সংস্কৃতির জন্যও বিপজ্জনক। ব্যক্তির মূল্যায়ন এখন নির্ধারিত হচ্ছে তার অনলাইন উপস্থিতির ওপর। একটি মানুষ বাস্তবে কেমন, তার চারিত্রিক গুণাবলি কেমন—এগুলো পরিণত হয়েছে গৌণ বিষয়ে। এখন গুরুত্বপূর্ণ হলো সে সোশ্যাল মিডিয়ায় কতটা "পপুলার"।
আমাদের বর্তমান প্রজন্ম এই আসক্তিতে জড়িয়ে পড়লেও সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়বে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর। তারা যদি বাস্তবের চেয়ে ভার্চুয়াল দুনিয়াকে বেশি গুরুত্ব দেয়, তবে সমাজের গঠনমূলক সম্পর্কগুলো ভেঙে পড়বে। আসুন দেখে নিই, এটি কেমন ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে:
আমাদের জীবনের আসল মূল্য নিহিত রয়েছে বাস্তব অভিজ্ঞতা, প্রকৃত সম্পর্ক এবং প্রকৃত অর্জনের মধ্যে। সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কিন্তু এটি কখনোই বাস্তব জীবনের বিকল্প হতে পারে না।
সোশ্যাল মিডিয়া এমন এক প্ল্যাটফর্ম যেখানে বাস্তবতা বিকৃত হয়ে যায়। এখানে যা দেখা যায়, তার পেছনে থাকে সাজানো কনটেন্ট, এডিট করা ছবি, এবং অনেক সময় মিথ্যা তথ্য।
এই পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার জন্য সচেতনতা তৈরি করা জরুরি। প্রযুক্তির অপব্যবহার ঠেকাতে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ—সবাইকে উদ্যোগ নিতে হবে।
১. সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ রাখা
প্রতিদিন কতক্ষণ সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করা হবে, তা নির্দিষ্ট করে নেওয়া উচিত। প্রয়োজন ছাড়া অযথা স্ক্রল করা বা অন্যদের জীবনের সাথে নিজের তুলনা করা পরিহার করতে হবে।
সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের জীবনের একটি অংশ, কিন্তু এটি কখনোই আমাদের বাস্তব জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যদি আমরা রক্ষা করতে চাই, তাহলে এখনই এই আসক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। বাস্তব অভিজ্ঞতা, প্রকৃত সম্পর্ক এবং বাস্তব অর্জনের মূল্য বোঝাতে হবে।
আমাদের উচিত সোশ্যাল মিডিয়াকে একটি টুল হিসেবে ব্যবহার করা, কিন্তু এটিকে জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করা নয়। নতুবা আমরা শুধু নিজেদেরই ক্ষতি করব না, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও এক ভয়ংকর সমাজ তৈরি করব, যেখানে মানুষ বাস্তবতার পরিবর্তে ভার্চুয়াল দুনিয়াকে জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হিসেবে ধরে নেবে।
সুতরাং, আসুন আমরা সোশ্যাল মিডিয়ার ফাঁদ থেকে বেরিয়ে এসে বাস্তব জীবনের সৌন্দর্যকে উপলব্ধি করি, বাস্তব সম্পর্ককে গুরুত্ব দেই এবং সত্যিকারের সাফল্যের পথে হাঁটি।
আলি আবরার, সম্পাদক ও প্রকাশক প্রতিদিন সেবক
প্রকাশক ও সম্পাদক- আলি আবরার । নিরালা, খুলনা থেকে প্রকাশিত