বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে খুলনা সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অগ্নিকান্ডের সূচনা হয়েছে বলে প্রথমিকভাবে ধারণা করছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও ফায়ার বিভাগ। দুপুর ১২টা পর্যন্ত অগ্নিকান্ডের রহস্য উন্মেচনে কোনো তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়নি। অগ্নিকান্ডের ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে একটি জিডি করা হয়েছে। উদ্ধার অভিযান পুরোপুরি শেষ হয়েছে ফজরের সময়। ওই হাসপাতালে থাকা ২৫০ জনেরও অধিক রোগীকে আশপাশের সরকারী ও বেসরকারী হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। অগ্নিকান্ডের ঘটনায় ৭ জন ফায়ার কর্মী আহত হয়েছেন। অগ্নিকান্ডের পর ওই হাসপাতালের সকল কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। ক্ষয়ক্ষতি নিরূপনের কাজ চলছে।
এর আগে গতকাল বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে খুলনা সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।
আজ শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে খুলনা সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায় উৎসুক মানুষের ভিড়। পোড়া ভবন দেখতে সকাল থেকেই সেখানে মানুষের ভিড় করেন। কেউ ভেতরে যাওয়ার চেষ্টা করছেন আবার কেউ দুর থেকে দেখে আগুন লাগার কারণ জিজ্ঞাসা করছেন।
আবার হাসপাতালে প্রবেশের মূল ফটকের পাশে অপর বিলিংয়ের সামনে দেখা যায় রোগীদের ফেলে যাওয়া মালামাল ও ট্রিটমেন্ট স্লিপ দিচ্ছেন হাসপাতালের কর্তৃপক্ষরা।
হাসপাতালে উপস্থিত ম্যানেজার (এডমিন) হামিদুল ইসলাম জানান, হাসপাতালের বেজমেন্ট থেকে রাতে অগ্নিকান্ডের সূচনা হয়। বেজমেন্টের ওপরে দ্বিতীয় তলায় রয়েছে জেনারেটরের কক্ষ আর বেজমেন্টে রয়েছে অক্সিজেন প্লান্ট।
তিনি জানান, অগ্নিকান্ডের কারণ উদঘাটন করতে এখনও পর্যন্ত কোনো তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়নি। আগুনে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে এখানকার দু’টি অক্সিজেন প্লান্ট, দু’টি জেনারেটর, কিছু মেডিসিন, আসবাবপত্র ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র। ক্ষয়ক্ষতির পরিমান তিনি নির্দিষ্ট করে বলতে পারেননি। তবে নিরূপনের কাজ চলছে বলে তিনি জানান।
হামিদুল ইসলাম বলেন হাসপাতালে ২৫০ জনের উপরে রোগী ভর্তি ছিলেন। তাদের মধ্যে অনেকেই আইসিইউ সাপোর্টে ছিলেন। হাসপাতালে ভর্তি সব রোগীদেরকে খুলনার আদদ্বীন, নারগিস মেমোরিয়াল ও গাজী মেডিকেল কলেজ, ইসলামী ব্যাংক হাসপাতাল ও খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। অগ্নিকান্ডে কোন রোগী ও কর্মকর্তা কর্মচারীদের ক্ষতি হয়নি বলে জানান এ কর্মকর্তা।
এই হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে নেওয়ার পর কোন রোগীর মৃত্যু হয়েছে কিনা জানতে চাইলে এই কর্মকর্তা বলেন, এ ধরণের কোন তথ্য আমাদের কাছে নেই।
আইনশৃংখলা বাহিনীর হাসপাতাল পরিদর্শন
রাতে এ হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা: আবু আশফাক, পরিচালক মোস্তফা কামাল ও রফিকুল ইসলাম বাবলুসহ অন্যান্য কর্মকর্তা রাতে ঘটনাস্থলে পরিদর্শন করেন। তারা সকালেও এসে সার্বিক খোঁজ খবর নিয়েছেন। এছাড়া পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, সিআইডি, পিআইবিসহ প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। ফজরের নামাজের আজান শেষে উদ্ধার কার্যক্রম পুরোপুরি শেষ হয়।
বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে অগ্নিকান্ড, আহত ৭
টুটপাড়া ফায়ার স্টেশনের সিনিয়র স্টেশন অফিসার মো: জাকির হোসেন বলেন, বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে হাসপাতালে অগ্নিকান্ডের ঘটনাটি ঘটে। জেনারেটর রুম থেকে আগুন লেগে পাইপের মাধ্যমে তা হাসপাতালের পুরো ভবনে ধোয়া ছড়িয়ে পড়ে। আগুন নেভাতে গিয়ে তাদের ৭ জন ফায়ার ফাইটার আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে দুজনের হাত কেটে গেছে। অন্যান্যরা শ^াস কষ্টে ভুগছেন।
হঠাৎ হাসপাতালগুলোতে আগুন লাগার বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি বলেন, তিন-ছয় মাস পরপর বৈদ্যুতিক সংযোগগুলো পরীক্ষা করা দরকার। কিন্তু কোনো ক্ষেত্রে তা মানা হয়না। তিনি বলেন, সারারাত আগুন নেভানোর কাজ করায় তদন্ত কমিটি গঠন করতে বিলম্ব হচ্ছে। তবে আজই ফায়ার বিভাগের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে।
অন্যদিকে সিটি মেডিকেলের ম্যানেজার (এডমিন) হামিদুল ইসলাম বলেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে আলাদাভাবে তদন্ত করা হবে।
জানতে চাইলে খুলনা ফায়ার সাভির্সের উপ-পরিচালক মাসুদ রানা বলেন, রাত সাড়ে ৯টায় আগান লাগে। খবর পেয়ে ৯টা ৩৫ মিনিটে ঘটনাস্থলে পৌছাই। প্রথমে ১১ টি ইউনিট এবং পরে আরো ৩টি ইউনিট, মোট ১৪টি ফায়ার ইউনিট কাজ করে রাত ১১টা ৫৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। তবে পুরোপুরি উদ্ধার অভিযান চলে ফজরের আজান পর্যন্ত।
তিনি বলেন, বেজমেন্ট থেকে আগুনের সূত্রপাত ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বেজমেন্টে বহু অক্সিজেন সিলিন্ডার মজুত ছিল। এছাড়া সেখানে ১ হাজার লিটার ডিজেল মজুত ছিল। যার কারণে এগুলো বিস্ফোরণ ঘটে আগুণ ও ধোয়া ১১তলা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।
ফায়ার সাভির্সের উপ-পরিচালক মাসুদ রানা বলেন, বেজমেন্টে অনেক মোটর সাইকেল ও গাড়ী ছিল। ফায়ার বিভাগ ৫ মিনিটের মধ্যে ঘটনাস্থালে পৌছে যাওয়ায় বড় ধরণের ক্ষতি হয়নি।
তদন্ত কমিটি সর্ম্পকে এ কর্মকর্তা বলেন, ঢাকা থেকে নির্দেশনা পাওয়ার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। এক-দুইদিরে মধ্যেই তদন্ত কমিটি গঠন করে অগ্নিকান্ডের কারণ উদঘাটন করা হবে।
এদিকে সকালে হাসপাতালের প্রবেশের মূল ফটকের পাশে অবস্থিত হাসপাতালের অপর ভবন থেকে ট্রিটমেন্ট স্লিপ ও রোগীদের রেখে যাওয়া মালামাল নিতে সেখানে আত্মীয়-স্বজনরা ভিড় করেছেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মাইকিং করে তাদের মাঝে তা বুঝিয়ে দিচ্ছেন।
পুলিশের জিডি
সোনাডাঙ্গা থানার এসআই নাদিম মাহমুদ জানান, অগ্নিকান্ডের ঘটনায় থানায় এখনও পর্যন্ত হাসপাতালের কেউ কোনো সাধারণ ডায়েরি করেনি। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে। ঘটনার পর পুলিশের পক্ষ থেকে জিডি করা হয়।
খুলনার অধিকাংশ নামী দামি বেসরকারী হাসপাতালে পার্কিংয়ের জায়গা নেই
খুলনার অধিকাংশ বেসরকারী অত্যাধুনিক বেসরকারী হাসপাতালে পার্কিং নেই। খুলনা সিটি মেডিকেল, গাজী মেডিকেল, গরীব নেওয়াজ ক্লিনিক, নার্গিস মেমোরিয়াল, সন্ধানী ক্লিনিক, ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে নেই কোন পার্কিং ব্যবস্থা।
এসব বেসরকারী হাসপাতাল গুলোতে নকশায় দেখানো পার্কিংয়ের জায়গা অন্য কাজে ব্যবহার করছে। ফলে এসব বেসরকারী হাসপাতালের সামনের রাস্তায় প্রতিদিন ১৪-১৫ ঘন্টা টানা যানজট লেগেই থাকে।
যানজটের কারণে সড়কে দুর্ঘটনায় একজন মারাও গেছেন। হাসপাতালগুলোতে নির্মাণ বিধিমালা ও নকশায় অনেক ত্রুটি রয়েছে। নেই অগ্নি নির্বাপক ও ফায়ার হাইডেন সুবিধা।
খুমেক হাসপাতালে আগুনে পুড়ে যাওয়া তিন ওটি এখনও বিকল
এদিকে গত ২০ মে সকাল ৬টার দিকে খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতাল ভবনের তৃতীয় তলায় লাগা আগুনে ইমার্জেন্সি অপারেশন থিয়েটার ভস্মীভূত হয়। এ সময় আইসিইউ থেকে সরানোর সময় নাসরিন নাহার নামের এক রোগীর মৃত্যু হয়।
হুড়োহুড়ি করে নামতে গিয়ে আহত হন অন্তত পাঁচজন। ওই দিন বিকেলে হাসপাতাল পরিদর্শনে গিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন করে রিপোর্ট পাঠানোর নির্দেশ দেন। পরদিন ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি খুলনা জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রতিবেদন পাঠায় মন্ত্রণালয়ে।
আগুনে পুড়ে যাওয়া তিনটি অপারেশন থিয়েটার সংস্কার কাজ গত সপ্তাহে শুরু হলেও পুরোপুরি অপারেশন উপযোগী করতে আরো ১২-১৩ দিন লাগবে বলে হাসপাতাল সূত্রে জানাগেছে।


