
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, জনগণের সমর্থনে বিএনপি একাধিকবার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেছে। দেশ পরিচালনা করতে গিয়ে সেই সময় কোনো কোনো ক্ষেত্রে হয়তো আমাদের অনিচ্ছাকৃত কিছু ভুল ত্রুটি হয়েছে। সেজন্য আমি দেশবাসীর কাছে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি। তিনি বলেন, অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে অর্জনগুলোকে অবলম্বন করে বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গঠনের জন্য আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনে আবারো আমি আপনাদের সমর্থন চাই।
জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষ্যে সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে এ কথা বলেন তিনি।
ভাষণটি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারের মাধ্যমে সম্প্রচার করা হয়।
তারেক রহমান বলেন, জনগণ রাষ্ট্রের মালিক। জনগণ রাষ্ট্রের মালিক হলে রাষ্ট্রের সুযোগ সুবিধাও ভোগ করা জনগণের অধিকার। কিন্তু ফ্যাসিবাদ আমলে সব সুযোগ সুবিধা সম্পদ জনগণের পরিবর্তে মাফিয়া সিন্ডিকেটের হাতে কুক্ষিগত ছিল। সুতরাং এবারের নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি শুধু রাষ্ট্রের মালিকানায় নয়, জনগণ যাতে ন্যায্যভাবে রাষ্ট্রীয় সুযোগ ও সুবিধাও ভোগ করতে পারেন, বিএনপি সেটিকেও ইনশাআল্লাহ নিশ্চিত করতে চায়।
তিনি বলেন, সমাজের প্রতিটি শ্রেণি-প্রেশার মানুষের প্রতি লক্ষ্য রেখেই আমরা আমাদের আগামীর বাংলাদেশ গড়ার পরিকল্পনা সাজিয়েছি। আমাদের এই পরিকল্পনা থেকে সমাজের কোনো অংশ বাদ যায়নি। দেশে প্রতিবন্ধী প্রায় ৪০ লাখ মানুষের কল্যাণ নিয়েও আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে। আমরা মনে করি প্রতিবন্ধী মানুষদের প্রতি শুধু পরিবার নয়, রাষ্ট্রেরও বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে। আমরা সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে চাই। বাংলাদেশে প্রায় ২ লাখ মসজিদ রয়েছে। এই মসজিদের কয়েক লাখ খতিব ইমাম মোয়াজ্জিন রয়েছেন। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত এই মানুষগুলোর সঙ্গে আমাদের রয়েছে ধর্মীয় সামাজিক আত্মিক এবং আধ্যাত্মিক সম্পর্ক। এদের অনেকেই আর্থিকভাবে পিছিয়ে রয়েছেন। জনগণের রায় বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেলে দেশের ইমাম, খতিব, মোয়াজ্জিন এবং একইভাবে অন্য সব ধর্মের ধর্মীয় গুরুদের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে আর্থিক সহযোগিতা ইনশাআল্লাহ আমরা নিশ্চিত করতে চাই। তিনি বলেন, পতিত পরাজিত ও বিতাড়িত ফ্যাসিবাদ অপশক্তি দেশের সব সাংবিধানিক এবং বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোকে অকার্যকর করে দিয়েছিল। প্রশাসনকে চূড়ান্ত রকমের দলীয়করণ করে ফেলেছিল। প্রশাসন পরিচালনায় বিএনপির নীতি হবে। প্রতিটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান চলবে সাংবিধানিক নিয়মে। শাসন প্রশাসনকে দলীয়করণ নয়। প্রশাসনে নিয়োগ কিংবা পদোন্নতি হবে মেধা এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে। জনপ্রশাসন সঠিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হতে না পারলে আমাদের কোনো উদ্যোগই সুফল মিলবে না। আমরা এরইমধ্যে জনগণের সামনে উপস্থাপিত। আমাদের দলীয় ইশতেহারে বলেছি, জনগণের রায় বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে সরকারি কর্মকর্তা এবং কর্মচারীদের জন্য যথাসময়ে জাতীয় পে স্কেল ঘোষণা এবং বাস্তবায়ন করা হবে।
বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রায় দেড় কোটি প্রবাসী বাংলাদেশির বসবাস। প্রবাসীরা অনেকেই বাংলাদেশে তাদের প্রিয় পরিবার পরিজন ছেড়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাস করেন। বৈদেশিক আয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে গার্মেন্ট সেক্টরের পরই প্রবাসী বাংলাদেশিদের অবদান। কিন্তু দেশে প্রবাসীদের সুযোগ সুবিধা সম্মান এবং মূল্যায়নের ক্ষেত্রে তাদের অভিযোগ দীর্ঘদিনের দেশে বিদেশে প্রবাসীদের সম্মান সুযোগ সুবিধা সুরক্ষা অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এবার আমরা প্রবাসী কার্ড প্রবর্তনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। এই কার্ডের মাধ্যমে দেশে প্রবাসীদের অর্থনৈতিক বিনিয়োগ সুরক্ষা এবং বিমানবন্দরে তাদের হয়রানী বন্ধসহ কয়েকটি সুবিধা বিদ্যমান থাকবে ইনশাআল্লাহ। দক্ষ বাংলাদেশি শ্রমিক বিশ্বের কোনো দেশে কাজের নিশ্চয়তা বা অফার পেলে বিদেশে কর্মস্থলে যোগদানের জন্য তাদেরকে যাতে দেশে তাদের জায়গা জমি বিক্রি করতে না হয়। এজন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদেরকে সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে।
তিনি বলেন প্রিয়, আমাদের এই ধর্মীয় বিশ্বাস এবং মূল্যবোধের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় সামাজিক রাজনৈতিক আগ্রাসন চালানোর অপচেষ্টা হয়েছিল। অপরদিকে দেশবরেণ্য অনেক আলেম ওলেমা সোচ্চার কণ্ঠে বলেছেন, কেউ কেউ স্রেফ দলীয় স্বার্থ হাসিলের জন্য ধর্মের অপব্যাখ্যা করে বিশ্বাসী মুসলমানদেরকে বিভ্রান্ত করারও অপচেষ্টা চালাচ্ছে। সুতরাং সব বিশ্বাসীদের প্রতি আহ্বান কেউ যেন মুসলমানদেরকে বিভ্রান্ত করতে না পারে সে ব্যাপারে আমাদের সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। বিএনপি এমন একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে চায় যেখানে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, বিশ্বাসী, অবিশ্বাসী কিংবা সংশয়বাদী; পাহাড়ে কিংবা সমতলে বসবাসকারী প্রতিটি নাগরিক নিরাপদ থাকবে। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় কে কোন ধর্মের? এটি কোনো জিজ্ঞাসা ছিল না। ২০২৪ সালের স্বাধীনতা রক্ষার যুদ্ধেও কে কোন ধর্মের? কার কি ধর্মীয় পরিচয়? এটি কোনো জিজ্ঞাসা ছিল না। আমরা মনে করি ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবার। প্রতিটি ধর্মের মানুষ নিজ নিজ ধর্মীয় বিশ্বাস এবং রীতি অনুযায়ী যার যার ধর্ম পালন করবেন। এটি একটি আধুনিক সভ্য সমাজের রীতি। দেশের গণতান্ত্রিককামী জনগণ তাদের স্বাধীনতা হরণকারী স্বৈরাচার ধর্মীয় চরমপন্থা কিংবা উগ্রবাদ কোনটিকেই পছন্দ করে না। নিজ নিজ ধর্মীয় বিশ্বাস এবং সংস্কৃতি বজায় রেখেই যাতে আমরা সবাই মিলেমিশে একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে পারি। এ লক্ষ্যেই স্বাধীনতার ঘোষকের যুগান্তকারী রাজনৈতিক দর্শন ছিল বাংলাদেশি জাতীয়তা। বাদ দল মত ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে এই বাংলাদেশ আমাদের সবার আমরা সবাই বাংলাদেশি।
তিনি বলেন, দেশের জনগণের সমর্থনে বিএনপি অতীতে বহুবার রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেয়েছে। স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমান রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়ে দেশকে স্বনির্ভর বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। বাংলাদেশের স্বার্থ এর পক্ষে থাকার কারণেই তাকে শাহাদাত বরণ করতে হয়েছে। আমার মা মনুমা বেগম খালেদা জিয়া যাকে বাংলাদেশের জনগণ অর্থাৎ আপনারাই দেশনেত্রী উপাধি দিয়েছিলেন। তিনি কখনোই আপনাদের সম্মানের অমর্যাদা করেননি। জীবনের শেষ বয়সে এসেও তিনি জেল জুলুম বরণ করেছেন। কিন্তু বাংলাদেশের স্বার্থের সঙ্গে আপস করেননি। সন্তান হিসেবে আমি জানি তার কাছে অনেক প্রস্তাব এসেছিল। তিনি চাইলেই সেই প্রস্তাব গ্রহণ করে জেল জুলুম এড়িয়ে বিদেশে চলে যেতে পারতেন। কিন্তু তার হৃদয়জুড়ে ছিল বাংলাদেশ। দেশের স্বাধীনতা প্রিয় গণতন্ত্রকামী জনগণের বিশ্বাস ছিল খালেদা জিয়া জালিমের কারাগারে থাকলেও তিনি তাবেদার অপশক্তির ভয়ের কারণ। খালেদা জিয়াও জনগণের শ্বাস এবং ভালোবাসার মর্যাদা দিয়েছিলেন। তিনি দেশেই থেকেছিলেন শেষ দিন পর্যন্ত।
তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে আপসীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া দেশে পুনরায় গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে চেয়েছিলেন। জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। দেশের স্বাধীনতাপ্রিয় গণতান্ত্রিক জনগণের সামনে খালেদা জিয়ার আকাঙ্ক্ষা পূরণের সেই সময় উপস্থিত। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্র ও সরকারের জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার দিন। দেশনেত্রী খালেদা জিয়া জনগণের চূড়ান্ত বিজয় দেখে যেতে পারেননি। সারাদেশের সব ছাত্র জনতা কৃষক, শ্রমিক, রিকশাচালক, গার্মেন্টস কর্মী, ফুটপাতের হকার থেকে শুরু করে শিক্ষক, সাংবাদিক, শিল্পী, বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী, শ্রমজীবী, সরকারি, বেসরকারি চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী কিংবা শিল্প উদ্যোক্তা এবং দেশের সব মায়েরা, বোনেরা সবার কাছে আমার বিনীত আবেদন আপনারা যারা শহীদ জিয়াকে ভালোবাসেন। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে ভালোবাসেন। স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রকে ভালোবাসেন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনে ধানের শীষকে বিজয় করুন। ধানের শীষের বিজয়ের অর্থ বাংলাদেশের বিজয়। ধানের শীষের বিজয়ের অর্থ স্বাধীন সার্বভৌম তাবেদারমুক্ত বাংলাদেশ।
প্রকাশক ও সম্পাদক- আলি আবরার । নিরালা, খুলনা থেকে প্রকাশিত