চলতি বছরের ৪ মার্চ রাতে নগরের ব্যস্ততম ডাকবাংলা মোড়ে বাটার শোরুমের ভেতরে শ’ শ’ মানুষের সামনে রূপসা মটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি মাসুম বিল্লাহকে গুলি ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। মৃত্যুর কয়েকদিন আগে জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে থানায় জিডি করেছিলেন শ্রমিক নেতা ও উপজেলা শ্রমিক দলের সাবেক আহ্বায়ক মাসুম বিল্লাহ। থানায় জিডি করেও প্রাণে রক্ষা পাননি তিনি।
অথচ হত্যাকাণ্ডের তিন মাসের অধিক সময় অতিবাহিত হলেও কিলিং মিশনে অংশগ্রহনকারী কিলার ও শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘বি কোম্পানীর’ প্রধান গ্রেনেড বাবু এখনও গ্রেপ্তার হয়নি। আলোচিত এই হত্যা মামলায় দুজন গ্রেপ্তার হলেও মূল রহস্যও উদঘাটিত হয়নি। পুলিশের তদন্ত কার্যক্রমে খুশি নন পরিবারের সদস্যরা। মাসুম হত্যার পর থেকে পরিবারের সদস্যরা চরম নিরাপত্তাহীনতা ভুগছেন।
এদিকে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের শুরুতে মাসুম বিল্লাহকে একাধিকবার ফোন দিয়ে বিভিন্ন রকমের ভয়ভীতি দিতে থাকে একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠি। সর্বশেষ ১২ জানুয়ারি রাত সাড়ে ১১টার দিকে ফোন করে হত্যার হুমকি প্রদান করা হয়। এতে তিনি ভীত হয়ে রূপসা থানায় জিডি করেন।
জানতে চাইলে নিহতের বড় ছেলে আবিদ হোসাইন বলেন, ‘মামলার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে আমরা অবগত নই। তিনি ক্ষোভের সাথে বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের সাথে গ্রেনেড বাবুর সম্পৃক্ততা রয়েছে এমন চাউর হলেও তাদের সাথে আমাদের কোনো শত্রুতা নেই।
তাছাড়া গ্রেনেড বাবুর বড় ভাই জনিকে সম্প্রতি এ মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের সাথে তার সম্পৃক্ততা আছে কী না তা ও আমার এবং পরিবারের কারও জানা নেই। মামলার প্রধান আসামি অশোক ঘোষ আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে। সেখানে সে কী বলেছে তা বের করতে পারলে কিছু জানা যেত।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাবা হত্যার পর কোনো রাজনৈতিক নেতা আমাদের কোনো খোঁজ খবর নেয়নি। আমরা এখন অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছি। আমরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। মামলার তদন্ত কার্যক্রম নিয়ে খুশি নই। তিন মাসের অধিক সময় পার হয়ে গেলেও এ হত্যাকাণ্ডের অর্থদাতাকে পুলিশ শনাক্ত বা আইনের আওতায় আনতে পারেনি।’
পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগের একাধিক সূত্র জানায়, ৪ মার্চ বিকেলে কিলার অশোক ঘোষকে ফোন দেয় সন্ত্রাসী আকরাম। ফোন পেয়ে গল্লামারী থেকে ময়লাপোতায় আসে অশোক। আকরাম তাকে জানায় একটি কাজ আছে। কাজের বিনিময়ে তাকে ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হবে।
এতে রাজি হয়ে যায় সে। সন্ধ্যার আগে থেকে কয়েকজন সন্ত্রাসী ডাকবাংলো মোড়ে অবস্থান করতে থাকে। এরমধ্যে মোটরসাইকেল যোগে আকরাম ও অশোক ঘোষ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। এরপর অশোক, আকরাম ও সজীব হত্যা মিশন সম্পন্ন করার পরিকল্পনা করে।
তখন কোমর থেকে পিস্তল বের করে দেয় আকরাম। রাত সাড়ে ৮টার দিকে শ্রমিক নেতা মাসুমকে দেখিয়ে দেওয়া হয়। আর তাকে ধাওয়া দেয় সন্ত্রাসীরা। আত্মরক্ষার জন্য ডাকবাংলা মোড়ে বাটার শোরুমের ভেতরে যান মাসুম। কিন্তু সেখানে গিয়েও রক্ষা পাননি তিনি।
প্রথমে হৃদয় ধারালো চা-পাতি দিয়ে কুপিয়ে আহত করে। এরপর সৌরভ শর্টগান দিয়ে গুলি করলে ক্যাশ কাউন্টার সামনে পড়ে যান মাসুম। তখন অশোক ঘোষ পিস্তল দিয়ে গুলি করে। পালিয়ে যাওয়ার সময় অশোক অস্ত্রসহ জনতার হাতে আটক হয়।
এদিকে ধারালো অস্ত্রাঘাত ও গুলিবিদ্ধ মাসুম বিল্লাহকে তার পারিবারসহ উপস্থিত লোকজন উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
হত্যাকান্ডের এক দিন পর ৬ মার্চ নিহতের স্ত্রী ফতেমাতুজ জোহারা খুলনা থানায় গ্রেনেড বাবুসহ ৮ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ৮-৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন, যার নং ৫।
পুলিশ জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে কাজের বিনিময়ে অশোক ঘোষ কোনো টাকা পায়নি। এছাড়া হত্যাকাণ্ডের আগে খুনিরা খুলনার একটি বিশেষ বাহিনীর প্রধানের সাথে কথা বলে নেয়। তার নির্দেশে মূলত এ হত্যাকাণ্ড সম্পন্ন হয়। তবে কত টাকা চুক্তির বিনিময়ে সন্ত্রাসীরা এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে তা জানাতে পারেনি পুলিশ।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও খুলনা থানার এসআই জামাল বলেন, ‘সন্ত্রাসী আকরাম ও সজীবকে গ্রেপ্তারে আমরা সাতক্ষীরা ও পটুয়াখালী অভিযান চালিয়েছি। তবে এখনো তাদের গ্রেপ্তার করতে পারিনি।
তিনি বলেন, ‘এটি একটি আলোচিত হত্যাকাণ্ড। সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। আকরাম ও সজীবকে গ্রেপ্তার করতে পারলে অনেক তথ্য পাওয়া যাবে।’ তিনি আশাবাদী খুব শিগগিরই তাদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, এ মামলায় দুজনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। এরমধ্যে মামলার প্রধান আসামি অশোক ঘোষ আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে। এছাড়া সম্প্রতি গ্রেনেড বাবুর বড় ভাই জনিকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।


