দৈনিক জন্মভূমি
খুলনার রূপসা শিপইয়ার্ড সড়ক সংস্কার ও সম্প্রসারণ প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল ২০১৩ সালের ৩০ জুলাই। প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৫ সালের ৩০ জুন। কিন্তু দীর্ঘ ১৩ বছর পেরিয়ে গেলেও মাত্র সাড়ে তিন কিলোমিটার সড়কের সংস্কার ও সম্প্রসারণ কাজ আজও সম্পন্ন হয়নি।
খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কেডিএ) এই প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ৯৭ কোটি টাকা থেকে বেড়ে বর্তমানে ২৮০ কোটিতে পৌঁছেছে। কেডিএর সদস্য (উন্নয়ন) রুহুল আমিন কুতুবুদ্দিন এই প্রকল্পকে “গিনেস বুকে স্থান পাওয়ার মতো” বলে মন্তব্য করেছেন। অন্যদিকে সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত খুলনা সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু এটিকে “খুলনাবাসীর কান্না” হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি ও দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত শুরু করেছে। এদিকে সিটি প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জুর হস্তক্ষেপে ১৩ বছরের স্থবিরতা কাটবে বলে আশাবাদী এলাকাবাসী।
বর্তমানে সড়কজুড়ে কাদা ও খানাখন্দে যান চলাচল চরম দুর্ভোগে পড়েছে। ছোট যানবাহন প্রায় চলতেই পারে না। প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে, বিকল হচ্ছে যানবাহন। খুলনার অন্যতম প্রবেশপথ রূপসা ব্রিজ থেকে শিপইয়ার্ড পর্যন্ত সাড়ে তিন কিলোমিটার সড়কের এমন বেহাল অবস্থা দীর্ঘদিনের।
এ পরিস্থিতির প্রতিবাদে নাগরিক কমিটি কাদায় ধানের চারা রোপণ, মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছে। কিন্তু প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বাড়লেও কাজের অগ্রগতি হয়নি।
এই সড়কের পাশে খুলনা শিপইয়ার্ড, নৌবাহিনীর স্থাপনা, স্কুল-কলেজসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল রূপসা ব্রিজ থেকে খুলনা শহরে দ্রুত প্রবেশের সুযোগ সৃষ্টি, যানজট হ্রাস, নতুন শিল্পকারখানা স্থাপন, কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য বিমোচন। কিন্তু বাস্তবে জনদুর্ভোগই বেড়েছে।
এলাকার গ্যারেজ মালিক জলিল হাওলাদার বলেন, “এই সড়কে গর্ভবতী নারী চলাচল করলে সড়কেই সন্তান প্রসবের অবস্থা হয়। শিক্ষার্থীরা প্রায়ই দুর্ঘটনায় পড়ে। এমনকি লাশবাহী গাড়ি গেলেও মরদেহের কবরের আজাব শুরু হয়ে যায়।”
সড়ক পরিদর্শন ও আশ্বাস দেওয়ার পর এলাকাবাসীর মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। তারা আশা করছেন, বর্তমান সরকার দ্রুত কাজ শেষ করবে।
নাগরিক কমিটির নেতা অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার সংবাদ সম্মেলন করে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তিনি কেডিএর সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধেও তদন্তের আহ্বান জানান।
এর আগে এনটিভিতে প্রতিবেদন প্রচারের পর কেডিএ বহুল আলোচিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাহবুব ব্রাদার্স লিমিটেডের কাজ বাতিল করে নতুন ঠিকাদার নিয়োগের উদ্যোগ নেয়। পুনরায় টেন্ডার আহ্বান করা হলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি আদালতে মামলা করে ক্ষতিপূরণ দাবি করলে কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যায়।
পরবর্তীতে নতুন সরকার গঠনের পর কেডিএ মাহবুব ব্রাদার্সের জামানত বাজেয়াপ্ত করে এবং প্রতিষ্ঠানটিকে আর্থিক জরিমানা করে।
খুলনা সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু শিপইয়ার্ড সড়ক পরিদর্শন করে দ্রুত কাজ শেষ করার জন্য মন্ত্রণালয়ে ডিও লেটার পাঠান।
কেডিএ সদস্য (উন্নয়ন) রুহুল আমিন কুতুবুদ্দিন জানান, সিটি প্রশাসকের ডিও লেটারের পর প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধির জন্য নতুন প্রস্তাব একনেকে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। তবে অনুমোদনের আগেই বিধি অনুযায়ী নতুন টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। আগামী ১৫ মে টেন্ডার জমা দেওয়ার শেষ দিন এবং চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, “খুলনা শিপইয়ার্ড সড়কের এই প্রকল্প গিনেস বুকে স্থান পাওয়ার মতো।” তার দাবি, ঠিকাদার মাহবুব ব্রাদার্স স্বীকার করেছিল যে কাজ শুরুর আগেই আওয়ামী লীগ সরকারের নেতারা টাকা নিয়ে নিয়েছিলেন। যদিও সর্বনিম্ন দরদাতা না হওয়া সত্ত্বেও রাজনৈতিক সুপারিশে প্রতিষ্ঠানটিকে কাজ দেওয়া হয়েছিল। একইভাবে নিউমার্কেট এলাকার আরেকটি প্রকল্পের কাজও তাদের দেওয়া হয়েছিল, যা পরে বাতিল করা হয়।
প্রকল্প পরিচালক ও কেডিএর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরমান হোসেন জানান, আগের ঠিকাদারের কাজ বাতিল করে জামানত বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে এবং নতুন টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। তবে মাহবুব ব্রাদার্সের সঙ্গে নিজের অংশীদারিত্বের অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন। কেন এতদিন ঠিকাদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি— এমন প্রশ্নের জবাব তিনি দেননি।
তিনি জানান, মাহবুব ব্রাদার্স ৭১ কোটি টাকার কাজ করেছে এবং সেই অর্থ পরিশোধও করা হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, প্রকল্পের ব্যয় ৯৭ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২৮০ কোটিতে পৌঁছেছে।
সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, “খুলনা শিপইয়ার্ড সড়ক খুলনাবাসীর কান্না হয়ে দাঁড়িয়েছে।” তিনি দ্রুত কাজ শেষ করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তার উদ্যোগের ফলে সড়ক মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সড়ক পরিদর্শন করেছেন।
তিনি আরও বলেন, প্রয়োজন হলে ১০ মে-পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকেও বিষয়টি উপস্থাপন করবেন।
এদিকে সড়কের অনিয়ম, দুর্নীতি, ব্যয় বৃদ্ধি ও ঠিকাদারি প্রক্রিয়া নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন তদন্ত শুরু করেছে বলে নিশ্চিত করেছেন দুদকের খুলনা কার্যালয়ের উপপরিচালক।


