সাতক্ষীরা প্রতিনিধি
জলদস্যুদের তাণ্ডবের মুখে সুন্দরবনের জীবিকার সন্ধানে যাওয়া জেলে বাওয়ালি ও মৌয়ালরা এখন অসহায় পড়েছে। গত দুই দিনে জলদস্যু আলিম ও ডন বাহিনীর অস্ত্রধারী সদস্যরা অন্তত ২৫ জন বনজীবীকে মুক্তিপনের দাবিতে জিম্মি করেছে। অপহৃত এসব বনজীবিরা মাছ ও কাঁকড়া ধরা এবং মধু সংগ্রহ করছিলেন। সোম থেকে মঙ্গলবার বিকাল পর্যন্ত সুন্দরবনের বিভিন্ন নদী ও খাল থেকে তাদেরকে অপহরণ করা হয়।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় গহীন সুন্দরবন থেকে লোকালয়ে ফিরে আসা অপহৃতদের সহযোগীরা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
জলদস্যুদের ডেরায় থাকা এর মধ্যে এখন পর্যন্ত ১৬ জনের নাম-পরিচয় শনাক্ত হয়েছে। অপহরণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বনজীবীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে চরম আতঙ্ক।
নাম পরিচয় গোপন রাখার স্বার্থে সুন্দরবন থেকে ফিরে আসার জেলেরা জানান, সোমবার সকাল থেকে মঙ্গলবার বিকাল পর্যন্ত জলদস্যুরা বনের চুনকুড়ি নদীর গোয়ালবুনিয়া দুনের মুখ, ধানোখালীর খাল, মামুন্দো নদীর মাইটভাঙা খাল এবং মালঞ্চ নদীর চালতেবাড়ি খালে মাছ ও কাঁকড়া ধরা অবস্থায় বনজীবীদের উপর আক্রমণ করে।
নিজেদের আলিম ওরফে আলিম বাহিনী ও ডন বাহিনী পরিচয় দিয়ে প্রতিটি নৌকা থেকে একজন করে জেলে-মৌয়ালকে জিম্মি করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায় তারা।
অপহৃতদের মধ্যে রয়েছেন সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার বিভিন্ন এলাকার হুমায়ুন (২৭), আব্দুল সালাম (৪৫), আবুল কালাম (৪৭), শাহাজান গাজী (৫০), সিরাজ গাজী (৪০), আবুল বাসার বাবু (৩৭), আল-আমিন (৩৫), আল-মামুন (১৬), মনিরুল মোল্লা (২৬), সঞ্জয় মণ্ডল (২৫), হৃদয় মণ্ডল (৪৭), রবিউল ইসলাম বাবু (৩৫), রবিউল ইসলাম (২৪), শুকুর আলী গাজী (৩২), ইব্রাহিম গাজী (৫৫) এবং মুরশিদ আলম (৩৫)। নিরাপত্তার কারণে অন্য জিম্মিদের পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।
অপহরণের পরপরই দস্যুরা কয়েকজন ভুক্তভোগীর পরিবারের কাছে মুক্তিপণ দাবি করে।
ইব্রাহিম গাজীর জন্য ৩০ হাজার টাকা, মুরশিদের জন্য ১ লাখ টাকা এবং আব্দুল সালামের জন্য ২৫ হাজার টাকা দাবি করা হয়েছে।
অন্যদের বিষয়ে এখনও কোনো দাবি জানানো হয়নি।
ভুক্তভোগীদের স্বজনরা জানান, একই বাহিনীর বিরুদ্ধে আগে থেকেই অপহরণ, মুক্তিপণ ও চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে।
বুধবার সকালে কয়েকজন অপহৃত পরিবারের সদস্যরা জানান, সুন্দরবনের জেলে বাওয়ালি ও মৌয়ালদের কোন নিরাপত্তা নেই। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না থাকায় দস্যুরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
স্থানীয় জেলে ও মৌয়ালরা বলছেন, আগের তুলনায় আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে সুন্দরবনের পরিস্থিতি।
বনজ সম্পদ লুটপাট ও বন্যপ্রাণী শিকারের মতো অপরাধেও জড়াচ্ছে দস্যুরা।
পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের বুড়িগোয়ালিনী স্টেশন কর্মকর্তা মোঃ ফজলুল হক জানিয়েছেন, কয়েকজন বনজীবী অপহরণের খবর পাওয়া গেছে। তিনি উল্লেখ করেন, অপহৃতদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় বিস্তারিত তথ্য দিতে অনীহা দেখাচ্ছেন পরিবার ও সহযোগীরা।
শ্যামনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোঃ খালেদুর রহমান জানিয়েছেন, অনেক ক্ষেত্রে সমঝোতার চেষ্টা করেন জেলেরা নিজেরাই। একারনে জিম্মিদের নিরাপত্তার কারণে প্রশাসনকে তথ্য দিতে চান না স্বজনরা। তবে এত বনজীবী অপহরণের বিষয়কে গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ইতিমধ্যে জলদস্যুদের একটি তালিকা পুলিশের হাতে এসেছে। এগুলো খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


