খুলনা (৩১ অক্টোবর)
সুন্দরবনে সুন্দরী গাছের আগামরা (টপডাইং) রোগের প্রকোপ কমে আসছে। বেড়েছে কার্বন ধারণের পরিমাণ। গত চার দশকে সুন্দরবনে সুন্দরী গাছের কার্বন ধারণের মোট পরিমাণ ২১ শতাংশ বেড়েছে বলে গবেষণায় প্রকাশ পেয়েছে । এ সময়ে রোগাক্রান্ত সুন্দরী গাছের সংখ্যা কমেছে ৬ শতাংশ। বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, সুন্দরবনে সুন্দরী গাছের আগামরা (টপডাইং) রোগ একটি শতাব্দীপ্রাচীন পরিবেশগত সমস্যা। এ রোগে সুন্দরী গাছের মাথার দিকের ডালপালা ও পাতা ধীরে ধীরে শুকিয়ে মারা যায় এবং কান্ড খাঁটো হয়ে যায়।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯২১ সালে ব্রিটিশ বন বিশেষজ্ঞ আর. এস. ট্রুপ প্রথম সুন্দরী গাছ রোগে মারা যাওয়ার কথা উল্লেখ করেন। ব্রিটিশ আমলের বন জরিপের প্রতিবেদনে ১৯২০-এর দশকে সুন্দরবনের প্রায় ১৩-১৭ শতাংশ সুন্দরী গাছকে অসুস্থ বা আগামরা-আক্রান্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। পরবর্তীতে ১৯৩১ সালে এস. আই. কার্টিস সুন্দরবনের ওয়ার্কিং প্ল্যানে বা বন ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনায় অজানা কারণে কিছু সুন্দরি গাছ মরে যাওয়ার কথা লিপিবদ্ধ করেন। ১৯৭০-এর দশকের পর এই রোগের প্রকোপ মারাত্মক আকার ধারণ করে। ১৯৭৫ সালের দিকে ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মাণের ফলে সুন্দরবন অঞ্চলে মিষ্টি পানির প্রবাহ হ্রাস পায়। এর ফলে মাটির লবণাক্ততা বেড়ে সুন্দরবনে সুন্দরী গাছে টপডাইং রোগ ছড়িয়ে পড়ে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুন্দরবন বিশেষজ্ঞ এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সের অধ্যাপক ড. স্বপন কুমার সরকার বলেন, সুন্দরবনে সুন্দরী গাছের টপ ডাইং বা আগামরা রোগ আগের যে কোন সময়ের তুলনায় কমে আসছে। গবেষণা করে দেখা গেছে, গত ৪০ বছরে সুন্দরবনে সুন্দরী গাছের কার্বন ধারণের মোট পরিমাণ বেড়েছে ২১ শতাংশ বা ১৪ লক্ষ টন। এ সময়ে রোগাক্রান্ত সুন্দরী গাছের সংখ্যা কমেছে ৬ শতাংশ আর সমগ্র সুন্দরবনে সুন্দরী গাছের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ১ কোটি ৫০ লক্ষ বা ৫ শতাংশ বলে তিনি জানিয়েছেন। লবণাক্ততার বৃদ্ধি, ছত্রাক ও রোগজীবাণু, পানির নিষ্কাশন ও মাটির বায়ু চলাচল ব্যাঘাত, জলবায়ু পরিবর্তন ও ঘূর্ণিঝড় – এরকম অনেকগুলো বিষয়কেই আগামরা রোগের কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও ঠিক কি কারণে আগামরা রোগ হয় তা এখনো সুনির্দিষ্টভাবে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সুন্দরবনের সুন্দরী গাছের আগামরা রোগ নিয়ন্ত্রণ করতে হলে শুধু আক্রান্ত গাছ শনাক্ত করলেই হবে না; রোগটির প্রকৃত কারণ নির্ণয়, দীর্ঘমেয়াদি মনিটরিং, বন ব্যবস্থাপনা এবং সুন্দরী গাছের প্রাকৃতিক পুনর্জন্ম নিশ্চিত করতে হবে।বিষয়টিকে বাংলাদেশের বন ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা কর্মসূচি হিসেবে নেওয়া উচিত। কারণ, সুন্দরী গাছ শুধু সুন্দরবনের একটি প্রধান বৃক্ষপ্রজাতি নয়, এটি বনের গঠন, জীববৈচিত্র্য ও কার্বন ধারণের সঙ্গেও সম্পর্কিত বলে অধ্যাপক ড. স্বপন কুমার সরকার জানালেন।
সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগ খুলনার বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মোঃ হাছানুর রহমান বলেন, সুন্দরবনে সুন্দরী গাছের টপডাইং রোগের প্রকোপ কমেছে। সুন্দরবনে হেটে টহলের সময় বনের মধ্যে সুন্দরী গাছের বীজ ও চারা এখন অহরহ চোখে পড়ছে। যা থেকে নতুন করে সুন্দরী গাছের বাগান সৃষ্টি হচ্ছে বলে এই বিভাগীয় বন কর্মকর্তা জানান।
সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগ বাগেরহাটের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মোঃ রেজাউল করীম চৌধুরী বলেন, সুন্দরবন আগের যে কোন সময়ের তুলনায় ভালো আছে। নুতন করে সুন্দরী গাছের বাগান সৃষ্টি হচ্ছে। বনের সবুজায়ন বেড়েছে। পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের অল্প কিছু অংশে প্রাকৃতিক কারণে সুন্দরী গাছের আগা মরা রোগ পরিলক্ষিত হয়।
খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক (সিএফ) ইমরান আহমেদ বলেন, সুন্দরবনে সুন্দরী গাছের কার্বন ধারণ ক্ষমতা বেড়েছে ও আগামরা রোগের প্রকোপ আগের তুলনায় অনেক কমেছে। বন অধিদপ্তরের ‘সুন্দরবন সুরক্ষা’ প্রকল্পের অধীনে বিভিন্ন গবেষণা কর্ম ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে ও কিছু চলমান আছে। সুন্দরবনের প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষায় ধারাবাহিক গবেষণা ও গবেষণা-নির্ভর বন ব্যবস্থাপনার কোনো বিকল্প নেই বলে সিএফ জানান।
