
খুলনা (২৩ ফেব্রুয়ারি)
খুলনা ২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও খুলনা মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু খুলনায় প্রবীন ও স্বচ্ছ রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত। একজন গণমানুষের নেতা হিসেবে সকল রাজনৈতিক, সামাজিক, পেশাজীবী, সাংস্কৃতিক, ব্যবসায়িসহ সকল শ্রেণীর মানুষের কাছে একজন গ্রহণযোগ্য হিসেবে নিজের আস্থা ধরে রাখতে পেরেছেন। এই নেতাকে যথাযথ সম্মান দিয়েছেন দলীয় চেয়ারম্যান এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তাকে খুলনা সিটি করপোরেশনের কেসিসি) প্রশাসক নিয়োগ করেছে সরকার। আর তাকে বরণ করতে সবধরণের প্রস্তুতি নিয়েছে নগর ভবন।
বর্তমানে অসুস্থ নজরুল ইসলাম মঞ্জু ঢাকায় চিকিৎসা নিচ্ছেন। একটু সুস্থ হওয়ার পর খুলনায় ফিরে দায়িত্ব বুঝে নেবেন বলে আজ সোমবার দুপুরে ‘আজকের পত্রিকাকে’ জানান এই নেতা।
খোঁজ নিয়ে জানাগেছে গতকাল ২২ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে দেশের ৬টি সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ করা হয়। ওই চিঠিতে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত নজরুল ইসলাম মঞ্জুকে খুলনা সিটি করপোরেশনের পুর্ণকালীন প্রশাসকের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।
স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব মাহাবুবা আইরিন স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ‘স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৪’ এর ধারা ২৫ক এর উপধারা (১) এর অনুবৃত্তিক্রমে কর্পোরেশন গঠিত না হওয়া পর্যন্ত অথবা পরবর্তী আদেশ না দেওয়া পর্যন্ত তাকে সিটি কর্পোরেশনের পূর্ণকালীন প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ প্রদান করা হলো। নিয়োগকৃত প্রশাসকরা ‘স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০১৪’ এর ধারা ২৫ক এর উপ-ধারা (৩) অনুযায়ী সিটি কর্পোরেশনের মেয়র এর ক্ষমতা প্রয়োগ ও দায়িত্ব পালন করবেন। তারা বিপি মোতাবেক ভাতা প্রাপ্য হবেন।
জানতে চাইলে কেসিসি’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রাজিব আহমেদ বলেন, প্রজ্ঞাপন সঠিক। এখন বিদায়ী ও বর্তমান প্রশাসক আলোচনা করে দায়িত্ব হস্তান্তরের দিন নির্ধারণ করা হবে। দায়িত্ব হস্তান্তরে সকল প্রস্তুতি আমাদের রয়েছে।
খুলনা বিএনপির নেতাকর্মীরা (একাংশ) বলেন, নজরুল ইসলাম মঞ্জু বেগম খালেদা জিয়ার একজন বিশ্বস্ত কর্মী হিসেবে পরিচিত। দক্ষিণাঞ্চলের বিএনপির ভ্যানগার্ড হিসেবে মঞ্জু দলের জন্য ও সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করেছেন। ১৯৭৯ সালে ছাত্রদল কর্মী হিসেবে রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন নজরুল ইসলাম মঞ্জু। ১৯৮৭ সালে তিনি খুলনা মহানগর বিএনপির যুগ্ম-আহ্বায়ক মনোনীত হন। ১৯৯২ সালের দ্বি-বার্ষিক সম্মেলনে সাধারণ সম্পাদক হয়ে দায়িত্ব পালন করেন একটানা ১৭ বছর। ২০০৯ সালের ২৫ নভেম্বর সম্মেলনে সভাপতি নির্বাচিত হন। ২০২১ সালের ৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত এক যুগেরও বেশী সময় ধরে মহানগর বিএনপির সভাপতি ছিলেন। তিনি দায়িত্ব পালনকালে বিএনপির তৃণমুলে ছিল সু-সংগঠিত, যেটি বর্তমানে নেই।
দলীয় সূত্র জানায়, ২০২১ সালের ডিসেম্বরে নজরুল ইসলাম মঞ্জুর রাজনৈতিক জীবনে ছন্দপতন ঘটে। ওই বছরের ৯ ডিসেম্বর মহানগর বিএনপির তিন সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। কমিটি থেকে বাদ পড়েন মঞ্জু ও তার অনুসারীরা। ১২ ডিসেম্বর দলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন তিনি। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৪ ডিসেম্বর শোকজ করা হয় তাকে। পরে ২৫ ডিসেম্বর বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকের পদ থেকেও অব্যাহতি দেওয়া হয় তাকে।
গূত্র জানায়, নজরুল ইসলাম মঞ্জুর প্রায় ৪৩ বছরের রাজনৈতিক জীবনের এমন পরিণতি মানতে পারেননি দলটির নেতাকর্মীদের অনেকেই। এক দিন পরই শুরু হয় গণপদত্যাগ। ওই সময় খুলনা মহানগর বিএনপি, পাঁচ থানা ও ওয়ার্ড কমিটি থেকে প্রায় ছয় শতাধিক নেতা পদত্যাগ করেন। এরপর থেকে বিএনপির সব ধরনের পদ-পদবির বাইরে নজরুল ইসলাম মঞ্জু ও তার অনুসারীরা। কিন্তু বিএনপির কেন্দ্র ঘোষিত প্রতিটি কর্মসূচি ও বড় সমাবেশে তিনি কর্মীদের নিয়ে নিয়মিত অংশ নেন। জুলাই অভ্যুত্থানেও তিনি রাজপথে সরব ছিলেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নজরুল ইসলাম মঞ্জু বিএনপির দলীয় মনোনয়ন নিয়ে খুলনা-২ আসন থেকে নির্বাচন করেন। মাত্র পাঁচ হাজার ভোটের ব্যবধানে জামায়াত প্রার্থী জাহাঙ্গীর হোসেন হেলালের কাছে পরাজিত হন তিনি। দলীয় কোন্দলের কারণে হারলেও নজরুল ইসলাম মঞ্জু কোনো অভিযোগ করেননি।
সারাদেশে বিএনপির যে কয়টি রিজার্ভ আসন আছে তার মধ্যে খুলনা-২ আসনটিও অন্যতম। এ আসনে ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে তৎকালীন বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে এ অঞ্চলের একমাত্র প্রার্থী হিসেবে জয়লাভ করে নজরুল ইসলাম মঞ্জু সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করেছেন।
তবে এবার এ আসনে বিএনপির পরাজয় কল্পনাতীত ছিল। তাকে বিএনপির একাংশ সু-কৌশলে হারিয়ে দিয়েছে বলে মনে করেন ত্যাগী নেতা-কর্মীরা।
জানতে চাইলে খুলনা মহানগর বিএনপির সাবেক প্রচার সম্পাদক ও সাবেক ছাত্রদল নেতা আসাদুজ্জামান মুরাদ বলেন, নজরুল ইসলাম মঞ্জুর দলীয় পদ ছিল না, কিন্তু তিনি রাজপথেই ছিলেন। এমনকি দলের কর্মসূচিতে গিয়ে তার গাড়িতে হামলা হয়েছে, ভাঙচুর হয়েছে। তারপরও তিনি মাঠ ছাড়েননি। আবারও প্রমাণ হলো রাজপথ কখনও বেঈমানি করে না। এ কারণেই চেয়ারপাসর্ন তাকে মূল্যায়ণ করেছেন।
নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, এটি তাঁর জন্য সম্মানের পাশাপাশি বড় দায়িত্ব। নগরবাসীর প্রত্যাশা পূরণে তিনি সততা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ভিত্তিতে কাজ করবেন বলে অঙ্গীকার করেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে মঞ্জু বলেন, খুলনাকে একটি আধুনিক, পরিচ্ছন্ন ও নাগরিকবান্ধব নগরীতে পরিণত করাই তাঁর মূল লক্ষ্য।
তিনি বলেন, অসুস্থতার কারণে তিনি ঢাকায় অবস্থান করে চিকিৎসা নিচ্ছেন। একটু সুস্থ হওয়ার পর খুলনায় এসে দায়িত্ব নেওয়ার কথাও জানান।
মঞ্জু বলেন, খুলনা সিটি করপোরেশন অবকাঠামো উন্নয়ন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জলাবদ্ধতা নিরসন, সড়ক উন্নয়ন ও নাগরিক সেবা নিশ্চিত করাই প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। নগরবাসাসিকে সাথে নিয়েই উন্নয়ন কর্মকান্ড পরিচালনা করতে চাই।
খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব আ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, নগরবাসীর প্রত্যাশা, নতুন প্রশাসকের নেতৃত্বে খুলনায় উন্নয়নের গতি আরও ত্বরান্বিত হবে এবং দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোর কার্যকর সমাধান মিলবে। অবশ্যই নাগরিক সেবার মান বাড়াতে হবে বলে তিনি মনে করেন।
প্রকাশক ও সম্পাদক- আলি আবরার । নিরালা, খুলনা থেকে প্রকাশিত