ভারতের কাশ্মীরে সংঘর্ষে নিহত হিসেবে দাবি করা পাকিস্তানের সাবেক সেনাসদস্য হাবিলদার মুহাম্মদ আসিফকে জীবিত অবস্থায় গণমাধ্যমের সামনে হাজির করেছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) দেশটির আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) মহাপরিচালক (ডিজি) লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী এক সংবাদ সম্মেলনে তাকে হাজির করেন।
জিও নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইএসপিআর ডিজি দাবি করেন, ভারত আরেকটি ‘ফলস-ফ্ল্যাগ অপারেশন’-এর মাধ্যমে এমন একটি ঘটনা তৈরি করেছে। ভারতের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, জম্মু ও কাশ্মীরের (আইআইওজেকে) একটি সংঘর্ষে সাবেক পাকিস্তানি সেনাসদস্য মুহাম্মদ আসিফ নিহত হয়েছেন।
তিনি বলেন, ঘটনাটি শুরু হয় ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে। ওই রাতে ভারতীয় কর্পস সামাজিক মাধ্যমে জানায়, কোরাগ, ইউসমার্গ এলাকায় একটি যৌথ তল্লাশি অভিযান চালানো হয়েছে এবং সেখানে একজন ‘সন্ত্রাসী’কে নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে।
তুরস্কে সিরিয়া-হিজবুল্লাহর গোপন বৈঠকের দাবি, অস্বীকার আঙ্কারা-দামেস্কের
এর প্রায় সাত ঘণ্টা পর ভারতীয় সেনাবাহিনী আরেকটি আপডেট দিয়ে দাবি করে, পালমাইদান এলাকায় যুদ্ধের সরঞ্জামসহ লস্কর-ই-তইবার সদস্য হিসেবে পরিচিত মোহাম্মদ আসিফ ওরফে হাশিম মুসার লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।
এর কিছুক্ষণ পর ভারতীয় সংবাদ সংস্থা এএনআই একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে দাবি করা হয়, মোহাম্মদ আসিফ ১৯৮০ সালের ৭ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ২০০০ সালে পিএ-৩১০৬৯৪৭ সার্ভিস নম্বরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং হাবিলদার পদ থেকে অবসর নেন। ২০০৫ সালে তিনি স্পেশাল সার্ভিসেস গ্রুপে (এসএসজি) যুক্ত হন এবং ৪ কমান্ডো ইয়ালগার ব্যাটালিয়নে দায়িত্ব পালন করেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৬ সাল থেকে বেলুচিস্তানে তার পোস্টিং ছিল এবং বেলুচ বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে প্রায় ১০টি অভিযানে অংশ নেন। তাকে ১৩টি হত্যার কৃতিত্বও দেওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়। ২০০৬ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত তিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফের ভিভিআইপি নিরাপত্তা দলে দায়িত্ব পালন করেছিলেন বলেও জানায় এএনআই।
আইএসপিআর ডিজি বলেন, ‘আপনারা হয়তো উরি, পেহেলগাম ও পুলওয়ামার কথা মনে করছেন- একটি খুবই মজার গল্প তৈরি করা হচ্ছে, আর এখন সেই গল্প পূর্ণতা পেয়েছে।’ এরপর তিনি জীবিত মুহাম্মদ আসিফকে গণমাধ্যমের সামনে হাজির করেন। তিনি বলেন, ‘এর মাধ্যমে ভারতের ওই বর্ণনা পুরোপুরি খণ্ডন হয়েছে এবং আইআইওজেকে-তে পাকিস্তানকে সন্ত্রাসের সঙ্গে যুক্ত করার মতো আরেকটি সাজানো ঘটনার বিষয় সামনে এসেছে।’
সংবাদ সম্মেলনে আইএসপিআর মহাপরিচালকের পাশে দাঁড়িয়ে মুহাম্মদ আসিফ বলেন, তিনি অ্যাটক জেলার তেহসিল পিন্ডিঘেবের বাসিন্দা। তিনি বলেন, ‘গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় বন্ধুরা আমাকে ফোন করে জানায়, ভারতীয় গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে খবর ছড়িয়েছে যে, ভারতীয় সেনাবাহিনী কাশ্মীরে এক সংঘর্ষে আমাকে হত্যা করেছে। তারা জানতে চেয়েছিল আমি কোথায় আছি। আমি বলেছিলাম, আমি জীবিত ও সুস্থ আছি এবং আলহামদুলিল্লাহ বাড়িতে বসে আছি।’
আসিফ বলেন, ‘এর পরপরই তিনি অচেনা ভারতীয় নম্বর থেকে একাধিক ফোন পেতে শুরু করেন। ফোনকারীরা তার ব্যক্তিগত তথ্য জানতে এবং খবরে উল্লেখ করা ব্যক্তির সঙ্গে তিনি সম্পর্কিত কিনা, তা জানতে চাইছিলেন।’
তিনি বলেন, ‘আমি বারবার ওই নম্বরগুলো ব্লক করি। এর কিছুক্ষণ পর আমি টেলিভিশনে খবর দেখতে পাই, যেখানে আমার ছবি ও ব্যক্তিগত সামরিক রেকর্ড দেখানো হচ্ছিল এবং দাবি করা হচ্ছিল যে কাশ্মীরে আমাকে শহিদ করা হয়েছে। আমি পুরোপুরি হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। আমি বাড়িতে বসে আছি, অথচ তারা দাবি করছে আমাকে কাশ্মীরে হত্যা করা হয়েছে।’
আসিফ জানান, তিনি সঙ্গে সঙ্গে তার সাবেক ইউনিটের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানান যে তিনি নিরাপদে বাড়িতে আছেন, যাতে তার বিষয়ে কোনো ভুল ধারণা বা অভিযোগ তৈরি না হয়।
তিনি বলেন, ‘তারা আমাকে নম্বরগুলো ব্লক করতে বলেন এবং জানান, সত্য তুলে ধরার জন্য আইএসপিআর আমার সঙ্গে যোগাযোগ করবে।’
এরপর আইএসপিআর তার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি জীবিত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেন এবং তাকে প্রকাশ্যে বিষয়টি জানাতে বলা হয় বলে জানান আসিফ। তিনি ২০০০ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আর্টিলারি কোরে যোগ দেন। ২০০৫ সালে তিনি এসএসজিতে যোগ দেন।
আসিফ বলেন, ‘আমি ১৮ বছর সম্মান ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছি এবং ২০২৩ সালে অবসর নিয়েছি। অবসরের পর তিন বছর একটি বেসরকারি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছি। গত কয়েক মাস ধরে পুরোপুরি অবসর নিয়ে বাড়িতে নিজের ছোট ব্যবসা পরিচালনা করছি।’
তিনি বলেন, ‘আমি ও আমার দেশের বিরুদ্ধে ভারত যে অভিযোগ করেছে-সীমান্তপারের সন্ত্রাসে জড়িত থাকার যে দাবি করা হয়েছে- তা সম্পূর্ণ মিথ্যা, সাজানো এবং ভিত্তিহীন। ভারতীয় গণমাধ্যমের ছড়ানো এই মিথ্যার আমি তীব্র নিন্দা জানাই।’ তিনি আরও বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ, আমি জীবিত এবং আজ আপনাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। আমার পরিচয় নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আমার কাছে সরকারি সিএনআইসি ও সামরিক পরিচয়পত্র রয়েছে।’
আইএসপিআর ডিজি আরও দাবি করেন, পাকিস্তানে সন্ত্রাস চালানোর জন্য ভারত বিভিন্ন সন্ত্রাসী সংগঠনকে সমর্থন করে। ভারতের কথিত ‘ফলস-ফ্ল্যাগ’ নাটকের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে এবং ভারত বিশ্বের সন্ত্রাস ছড়ানো সবচেয়ে বড় দেশ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানকে (টিটিপি) ভারতের সমর্থন ও অর্থায়নের বিষয়টি সুপরিচিত বলেও দাবি করেন তিনি। আইএসপিআর ডিজি আরও বলেন, ভারত ক্রমে তথাকথিত ‘যুদ্ধের থিয়েটার’-এর দিকে বেশি মনোযোগী হয়ে উঠছে। উরি, পাঠানকোট ও রাজৌরির ঘটনাগুলোও বারবার সংঘর্ষভিত্তিক বর্ণনায় উপস্থাপন করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।


