দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে চলা খুলনা শিপইয়ার্ড সড়ক সম্প্রসারণ প্রকল্পের বেহাল দশা ও সীমাহীন দীর্ঘসূত্রতায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি। শনিবার (৪ জুলাই) প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে তিনি প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উপর বিরক্ত প্রকাশ করেন।
পরিদর্শনকালে সড়কের একপাশে স্লুইসগেটের মুখে বাঁধ দিয়ে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা বন্ধ রাখা হয়েছে দেখে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বিরক্ত হন। প্রকল্প পরিচালকের (পিডি) ভুল ব্যাখ্যার জবাবে তিনি বলেন, ‘আমাকে দেখে কি বেকুব মনে হয়? পানি নিষ্কাশনের রাস্তা রেখে আবার তার সামনে বাঁধ দিয়ে পানি আটকে রাখার মানে কী?’ এসময় তিনি সড়কের বিভিন্ন ত্রুটিপূর্ণ স্থান ও বাঁক পর্যবেক্ষণ করে দ্রুত সংশোধনের কঠোর নির্দেশনা দেন।
খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কেডিএ) তথ্যমতে, ২০১৩ সালের ৭ মে ৯৮ কোটি টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়। এরপর ধীরগতির কারণে ২০২০ সালে প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে ২৫৯ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়। সম্প্রতি প্রকল্পের তৃতীয় সংশোধনীতে ব্যয় বাড়িয়ে ২৮০ কোটি টাকার প্রস্তাব করা হলে তা একনেক সভায় নাকচ হয়ে যায়।
গত ৯ জুন অনুষ্ঠিত একনেক সভায় দীর্ঘ ১৩ বছরেও সড়কটির কাজ শেষ না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি প্রকল্পের কাজের গাফিলতি খুঁজে বের করতে এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনিকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নজরুল ইসলাম এবং আইএমইডি সচিব সিরাজুন নূর চৌধুরী।
পরিদর্শন শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, প্রকল্পের বর্তমান কাজের মান, কেন কাজটি শেষ হতে এত সময় লাগল এবং এর বর্তমান অবস্থা যাচাই করে দ্রুত কাজ সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। পরিদর্শনের পর খুলনা সার্কিট হাউজে এ বিষয়ে একটি বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে খুলনা সিটি করপোরেশন, কেডিএ এবং জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রায় ৪ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের শিপইয়ার্ড সড়কটির দুই পাশে ১০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। ছিল ২৭টি চালকল এবং ২৫০টি কাঠের গোলা। সড়কের বান্দাবাজার এলাকায় ছিল ৪৫০টির বেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। নাজুক সড়কের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এসব প্রতিষ্ঠানসংশ্লিষ্টরা। ব্যবসায়ীদের ক্ষতির পরিমাণ বছরে প্রায় ২০০ কোটি টাকা।
এর আগে গত বছর খুলনা শিপইয়ার্ড সড়ক নির্মাণ প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর অভিযান চালায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সে সময় দুদকের প্রকৌশল দলের সদস্যরা ওই সড়কের মাটি খুঁড়ে নানা উপকরণ পরীক্ষা করেন। তারা জানিয়েছেন, ওই সড়ক নির্মাণের বিভিন্ন স্তরে যেসব উপকরণ থাকার কথা, তা পাওয়া যায়নি। তারপরও সেগুলো পরীক্ষায় পাঠানো হয়েছে। অনিয়মের প্রমাণ মিললে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাহাবুব ব্রাদার্স ও প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সকলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে জানায় খুলনাস্থ দুদক অফিস।
খুলনাস্থ দুদক অফিসের তদন্তে উদঘাটিটত হয় যে, প্রকল্পের অনেক ধরনের কাজ না করা সত্ত্বেও বিপুল পরিমাণ বিল পরিশোধ করা হয়েছে। যেমন সম্পূর্ণ সড়কের কোথাও কার্পেটিং কাজ করা হয়নি। কিন্তু তাসত্ত্বেও কার্পেটিং এর বিল পরিশোধ করা হয়েছে। এইরূপ আরো কিছু আইটেমের কাজ না হওয়া সত্ত্বেও চুক্তি বাতিলকৃত ঠিকাদার মাহাবুব ব্রাদার্সকে সে সকল আইটেমের উপর বিল পরিশোধ করা হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে চলা এই অবহেলার কারণে স্থানীয় বাসিন্দাদের সীমাহীন দুর্ভোগের চিত্রটি এখন তদন্ত কমিটির নজরে এসেছে, যা প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
