
বিলুপ্ত কমিটির বাদ পড়া নেতাদের পদায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কওমি মাদরাসাভিত্তিক আলোচিত সংগঠন হেফাজতে ইসলাম। তাদের জন্য যথাযথ পদ বিন্যাস করতে একটি উপকমিটি করে দিয়েছে সংগঠনটি।
শনিবার (৫ আগস্ট) হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় কমিটির এক সভায় এই সিদ্ধান্ত হয়। ঢাকার খিলগাঁওয়ে মাখজানুল উলুম মাদরাসায় আয়োজিত এই সভায় সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের আমির আল্লামা শাহ্ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী।
হেফাজতের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সভায় ১৫ নভেম্বর ২০২০ সালে হাটহাজারী মাদরাসায় কাউন্সিলের মাধ্যমে গঠিত কমিটি, যা পরবর্তী সময়ে বিলুপ্ত করা হয়, ওই কমিটির সব সদস্যকে বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির অন্তর্ভুক্ত করার সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। পাশাপাশি যথাযথ পদ বিন্যাসের জন্য সংগঠনের মহাসচিবকে আহ্বায়ক করে ১২ সদস্য বিশিষ্ট একটি সাবকমিটিও গঠন করা হয়।
এছাড়া হাটহাজারী মাদরাসার মহাপরিচালক আল্লামা শাহ্ মুহাম্মদ ইয়াহইয়ার ইন্তেকালে তার পদ শূন্য হওয়ায় হাটহাজারী মাদরাসার বর্তমান মহাপরিচালক আল্লামা মুফতি খলিল আহমদ কাসেমী এবং আল্লামা আতাউল্লাহ হাফেজ্জী উভয়কে সিনিয়র নায়েবে আমিরের পদে মনোনীত করার প্রস্তাব গৃহীত হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আজকের সভা বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেইটে আওয়ামী লীগের শান্তি সমাবেশে দুই গ্রুপের সংঘর্ষে হাফেজ রেজাউল করীম নামে একজন কওমি শিক্ষার্থী নৃশংসভাবে হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে। নেতারা ওই হত্যাকাণ্ডে জড়িত আসামিদের আজও বিচারের আওতায় না আনায় সরকার চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে বলে অভিমত ব্যক্ত করেন। অনতিবিলম্বে এই হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের চিহ্নিত করে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য হেফাজত নেতারা জোর দাবি জানান।
মাওলানা মামুনুল হকসহ কারাবন্দি সব উলামায়ে কেরামের দ্রুত মুক্তি এবং ২০১৩ সালে থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত হেফাজত নেতাকর্মীদের নামে হওয়া মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের বারবার আশ্বাস দেওয়া সত্ত্বেও সকলের মুক্তি ও মামলা প্রত্যাহার না হওয়ায় আজকের সভায় নেতারা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।
প্রসঙ্গত, ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠিত কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম প্রথমবারের মতো ব্যাপক আলোচনায় আসে ২০১৩ সালে। শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ থেকে ইসলাম সম্পর্কে কটূক্তি হচ্ছে এমন অভিযোগ তুলে ওই বছরের ৬ এপ্রিল সংগঠনটি ঢাকা অভিমুখে লংমার্চ করে। তাদের এই শোডাউন ব্যাপক নজর কাড়ে বিভিন্ন মহলের। তবে এর ঠিক এক মাস পর ৫ মে ঢাকা ঘেরাও কর্মসূচিতে শাপলা চত্বরে অবস্থানকালে মধ্যরাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযানে পালাতে বাধ্য হন হেফাজতের নেতাকর্মীরা। এরপর সংগঠনটি অনেকটা চুপসে যায়।
হেফাজতের প্রতিষ্ঠাতা আমির ছিলেন আল্লামা শাহ আহমদ শফী। পরবর্তী সময়ে দেশের শীর্ষ এই আলেমের সরকারের সঙ্গেও সুসম্পর্ক গড়ে উঠে। তার নেতৃত্বেই কওমি মাদরাসা দাওরায়ে হাদিসের সনদের সরকারি স্বীকৃতি পায়। এমনকি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শোকরিয়া মাহফিলে প্রধানমন্ত্রীকে ‘কওমি জননী’ উপাধিও দেন আলেম-উলামারা।
আল্লামা শফী ইন্তেকাল করেন ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে। তার ইন্তেকালের পর কাউন্সিলের মাধ্যমে হেফাজতের আমির নির্বাচিত হন মাওলানা জুনায়েদ বাবুনগরী, আর মহাসচিব হন মাওলানা নূর হোসাইন কাসেমী।
হেফাজত পুনরায় আলোচনায় আসে ২০২১ সালের মার্চে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের বিরোধিতা করে ডাকা আন্দোলনের মাধ্যমে। ওই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সারাদেশে ব্যাপক সহিংস ঘটনা ঘটে। প্রাণ হারায় বেশ কয়েকজন। এরপর সরকার হার্ডলাইনে গেলে দলের অর্ধশতাধিক নেতা গ্রেফতার হন। মাওলানা মামুনুল হকসহ অনেকেই এখনো কারাগারে আছেন।
ওই ঘটনার পরপর হেফাজতের কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করে পাঁচ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি করা হয়। এর মাসখানেক পরে পূর্ণাঙ্গ কমিটি করা হলেও সেই কমিটিতে কারাগারে যাওয়া কিংবা বিতর্কিত কাউকে রাখা হয়নি। তবে দুই বছরেরও বেশি সময় পর বাদ পড়া নেতাদের আবার কমিটিতে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল হেফাজত।


