নিজস্ব প্রতিবেদক:
লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা আর বৈরী প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই—এই ত্রিমুখী চ্যালেঞ্জে উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষকদের বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছিল নিত্যদিনের চিত্র। তবে সেই চেনা ছবিটা এবার বদলাতে শুরু করেছে খুলনার বটিয়াঘাটার বয়ারভাঙ্গা প্রযুক্তি গ্রামে। বিজ্ঞান আর আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় লবণাক্ত মাটিতেই এখন সোনালি ধানের সুবাস ছড়াচ্ছে, যা উপকূলের মানুষের মনে জাগিয়েছে ‘সবুজ সোনার’ নতুন স্বপ্ন।
গত ৭ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) ‘নতুন ০৬টি আঞ্চলিক কার্যালয় স্থাপনের মাধ্যমে স্থানভিত্তিক ধানের জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং বিদ্যমান গবেষণাগার উন্নয়ন (এলএসটিডি)’ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ড. মো. আনোয়ার হোসেন এই প্রযুক্তি গ্রাম সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন ব্রি স্যাটেলাইট স্টেশন খুলনার প্রধান ড. মো. সাজ্জাদুর রহমান, বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা বিল্লাল হোসাইন ও খালিদ হাসান সৌরভ এবং বটিয়াঘাটা উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন।
মাঠপর্যায়ে নতুন আশার আলো
পরিদর্শনকালে প্রকল্প পরিচালক ধানের জাত ও প্রযুক্তির প্রায়োগিক পরীক্ষণ, লবণসহিষ্ণু নতুন জাত উদ্ভাবনের লাইন ট্রায়াল, সার ব্যবস্থাপনা এবং কৃষি যান্ত্রিকীকরণের মাঠভিত্তিক কার্যক্রম ঘুরে দেখেন। তিনি জানান, উপকূলীয় অঞ্চলের বহুমুখী সংকট মোকাবিলায় স্থানভিত্তিক গবেষণার কোনো বিকল্প নেই।
চলতি রোপা আমন মৌসুমে বয়ারভাঙ্গা প্রযুক্তি গ্রামে বেশ কিছু যুগান্তকারী গবেষণা ও প্রায়োগিক পরীক্ষণ চলমান রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে স্থানীয় জার্মপ্লাজম সংগ্রহ, বৈশিষ্ট্যায়ন ও মূল্যায়ন, উপকূলীয় টেকসই সার ব্যবস্থাপনা, বায়ো-কোটেড ইউরিয়ার ব্যবহার, ব্রি ধান১১২-এর উপযোগী রোপণ দূরত্ব নির্ধারণ, শস্য বিন্যাস ও শস্যের নিবিড়তা বৃদ্ধির সম্ভাবনা যাচাই এবং কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর উদ্যোগ। পাশাপাশি, ব্রি উদ্ভাবিত ৫২টি আধুনিক ধানের জাত নিয়ে একটি দৃষ্টিনন্দন ‘রাইস গার্ডেন’ স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে স্থানীয় পরিবেশে জাতগুলোর অভিযোজনক্ষমতা মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
কৃষকের মুখে সাফল্যের হাসি
পরিদর্শনের অংশ হিসেবে আয়োজিত শতাধিক কৃষক-কৃষাণির এক প্রাণবন্ত মতবিনিময় সভায় উঠে আসে অভাবনীয় সাফল্যের গল্প। স্থানীয় কৃষক গুরুচাঁদ বৈরাগী নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন,
“আগে ৩৩ শতাংশ জমিতে সনাতন পদ্ধতিতে ধানের চারা রোপণ করতেই খরচ হতো ৪,৫০০ থেকে ৫,০০০ টাকা। আর এবার রাইস ট্রান্সপ্লান্টারের মাধ্যমে একই জমিতে রোপণ করতে খরচ হয়েছে মাত্র ১,৫০০ টাকার মতো। এতে সময়, শ্রম ও অর্থ—তিনটিই সাশ্রয় হয়েছে।”
কৃষকদের ভাষ্যমতে, রানিসেলুট, বেনাপোল ও মরিচশাইলের মতো পুরোনো স্থানীয় জাতের ধানে ৩৩ শতাংশ জমিতে যেখানে মাত্র ৭ থেকে ৯ মণ ফলন পাওয়া যেত, সেখানে বর্তমানে ব্রি ধান১০৩, ১০৯, ১১০, ১১১ ও ১১২-এর মতো আধুনিক জাত এবং উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারে একই জমিতে মিলছে ১৮ থেকে ২৪ মণ পর্যন্ত ফলন! দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ এই ফলন বৃদ্ধিতে কৃষকদের আয় ও উৎপাদনশীলতা বহুগুণ বেড়ে গেছে। সরাসরি মাঠে প্রযুক্তির এই সুফল দেখতে পাওয়ায় নতুন জাত ও আধুনিক পদ্ধতি গ্রহণে এলাকার কৃষকদের আগ্রহ এখন আকাশচুম্বী।
যান্ত্রিকীকরণে কমছে খরচ ও কষ্ট
শ্রমিক সংকট ও ক্রমবর্ধমান শ্রমমূল্যের প্রেক্ষাপটে ধান উৎপাদনের প্রতিটি পর্যায়ে কৃষি যান্ত্রিকীকরণের ওপর বিশেষ জোর দেন প্রকল্প পরিচালক ড. মো. আনোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, সময়মতো কৃষিকাজ সম্পন্ন করা এবং উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর জন্য আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার বাড়াতেই হবে।
ব্রি স্যাটেলাইট স্টেশন খুলনার প্রধান ড. মো. সাজ্জাদুর রহমান জানান, বয়লারভাঙ্গা প্রযুক্তি গ্রাম গবেষণা, প্রদর্শন এবং কৃষকের সক্রিয় অংশগ্রহণকে একসূত্রে গেঁথে দিয়েছে।
কৃষকদের মাঠের বাস্তব সমস্যা চিহ্নিত করে সে অনুযায়ী গবেষণা পরিচালনা এবং তার সফল প্রয়োগ নিশ্চিত করার মাধ্যমেই উপকূলীয় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষিকে আরও উৎপাদনশীল, লাভজনক ও জলবায়ু-সহনশীল করে তোলা সম্ভব—বয়ারভাঙ্গা প্রযুক্তি গ্রামের এই সাফল্য তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।


