খুলনা (০৮ নভেম্বর)
চাঁদার দাবিতে হুমকি দেওয়ার পর ১২ দিন ধরে বন্ধ রয়েছে নগরীর টুটপাড়া সেন্ট্রাল রোডের ‘চয়নিকা’ ফার্মেসি। ভয়ে প্রতিষ্ঠান মালিক তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলার সাহস করছের না। এমনকি তিনি মামলাও করেন নি। মামলা করেননি ভাংচুর হওয়া ‘সন্ধানী ক্লিনিক’, ‘নিউ অ্যাপোলো ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড কনসালটেশন সেন্টার’, আব্দুল্লাহ প্যাথলজিসহ বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো। এ পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতীয় সংসদের হুইপ ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক রকিবুল ইসলাম বকুল। তিনি বলেন, এখানে যারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যে কর্মকর্তারা আছেন- হয়- তারা এ সমস্যার সমাধান করবে, না হয়- তারা আত্মসমর্পন করে চলে যাবেন। এর কোনো বিকল্প নেই।
আজ রবিবার দুপুরে খুলনা প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি একথা বলেন।
দু’ সপ্তাহে একাধিক প্রতিষ্ঠানে চাঁদা দাবিতে ভাংচুর
সন্ত্রাসীদের টার্গেটে পড়েছে খুলনা নগরের ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো। গত গত দুই সপ্তাহে চাঁদার দাবিতে তিনটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার ভাঙচুর করেছে দুর্বৃত্তরা। এ সময়ের মধ্যে প্রকাশ্য একটি’র চিকিৎসককে প্রকাশ্য অস্ত্র দিয়ে হুমকিও প্রদর্শন করে তারা। এছাড়া বন্ধ রয়েছে একটি ওষুধ বিক্রয় প্রতিষ্ঠান।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২৪ অক্টোবর রাতে দশ কোটি টাকা চাঁদার দাবিতে বাবু খান রোডের সন্ধানী ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিকে দুর্বৃত্তরা হামলা চালায়। তারা দু’জন চিকিৎসকের রুম, কাউন্টার এবং একটি টিভি ভেঙে ফেলে। জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টির জন্য তারা সেখানে গুলি করে। এ ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতে পরদিন দুপুরে একই মালিকের অন্য একটি প্রতিষ্ঠানে দুর্বত্তরা সশস্ত্র মহড়া দেয়। ওই দিন তারা সেখানে উপস্থিত চিকিৎসকের ঘাড়ে পিস্তল ঠেকিয়ে হুমকি দিয়ে চলে যায়। এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে থানায় কোনো অভিযোগ করা হয়নি। মালিকপক্ষের সাথে যোগাযোগ করেও তাদের কাছ থেকে কোনো তথ্যও পাওয়া যায়নি।
একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, খুলনার একটি শীর্ষ বাহিনীর প্রধানকে ১ কোটি টাকা চাঁদা দিয়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালু রাখা হয়েছে।
গত ৩ নভেম্বর সন্ধ্যায় নগরীর সমসুর রহমান রোডের আব্দুল্লাহ প্যাথলজি ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। ক্যান্সরের স্যাম্পল সংগ্রহের বিষয়টি নিয়ে এ হামলার কথা প্রাথমিকভাবে জানা গেলেও পরবর্তীতে চাঁদার বিষয়টি স্পষ্ট উঠে এসেছে। ভাঙচুর করে যাওয়ার সময় সন্ত্রাসীরা কর্তৃপক্ষের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে বলে জানা গেছে। এঘটনাও কোন মামলা হয়নি।
এ ঘটনার ৪ দিন পর সন্ত্রসীরা শনিবার (৭ নভেম্বর) দুপুরে খানজাহান আলী রোডের এ্যাপোলো ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড কনসালটেশন সেন্টারে হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। প্রতিষ্টনটিতে ব্যপক ভাংচুর চালানো হয়। সম্প্রতি কারাগার থেকে বেরিয়ে একটি সন্ত্রাসী বাহিনীর এক সদস্য প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপককে হুমকি দেয়। সেখানে বলা হয়, তাদের বাহিনী প্রধানের নাম শুনেছেন কি? উত্তরে তিনি বলেন, আমি তাকে চিনি না। তাকে চিনিয়ে দেওয়ার জন্য কয়েকদিন পরে এ হামলা বলে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। এ ঘটনায় ভয়ে তারা থানায় কোনো অভিযোগ করেনি। এছাড়া নগরীতে এমন আরও অনেক ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও বেসরকারী হাসপাতাল রয়েছে, যাদের অনেকেই মানসম্মান ও প্রাণ ভয়ে নীরবে সন্ত্রাসীদের চাঁদা দিচ্ছেন। চাঁদা দিতে হচ্ছে অভিজাত হোটেলগুলোকে।
এছাড়া নগরীর টুটপাড়া সেন্ট্রাল রোডের চয়নিকা ফার্মেসির ব্যবস্থাপককে মোবাইল ফোন করে হুমকি দেয় সন্ত্রাসীরা। ভয়ে ফার্মেসির ব্যবস্থাপক পালিয়ে গেছেন। এ ঘটনার পর থেকে মালিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখেছে।
খুলনা সদর থানার অফিসার ইনচার্জ মো: লোকমান হোসেন বলেন, ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে হামলার ঘটনায় কেউ কোনো অভিযোগ করেনি। সন্ধানীর ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করে। ওই মামলায় দু’জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
তিনি আরও জানায়, শনিবার খানজাহান আলী রোডে এ্যাপোলো ডায়াগনস্টিক সেন্টারে হামলার ঘটনায়ও কর্তৃপক্ষ থানায় কোনো অভিযোগ করেনি। এ হামলার ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করা হয়েছে। তারা সম্প্রতি কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে নগরীতে অপরাধমূলক কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়ছে।
খুলনার নাগরিক সমাজের নেতা আইনজীবী বাবুল হাওলাদার বলেন, খুলনার প্রাইভেট ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে চাঁদাবাজি, একের পর হামলা, ভাঙচুর করে আতঙ্ক সৃষ্টির বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। গত কয়েক মাস ধরে খুলনার যে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে, এটা তারই বহিঃপ্রকাশ। সন্ত্রাস ও অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়া, দ্রুত জামিন পেয়ে পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে এই সন্ত্রাসী চক্র আরও বেপরোয়া উঠেছে। একের পর এক প্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর হচ্ছে। কিন্তু স্থানীয় যারা জনপ্রতিনিধি আছেন, তাদের এ ব্যাপারে আসলে কোনো রকমের কোনো তৎপরতা আমরা দেখি না। পুরোপুরি উদাসীন, প্রশাসন উদাসীন, সরকার উদাসীন। ফলে চাঁদাবাজ- সন্ত্রাসীরা তাদের কার্যক্রম বেপরোয়া গতিতে চালাতে পারছে।
খুলনা মহানগর পুলিশের (কেএমপি) উপকমিশনার রেজাউর রহমান বলেন, ভুক্তভোগীরা মামলা ও পুলিশকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করছেন না। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে দ্রুত জামিন হয়ে যাওয়ার প্রবণতা। এই দুই কারণে খুলনার অপরাধ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
হুইপ বকুলের উদ্বেগ
এদিকে আজ রবিবার জাতীয় সংসদের হুইপ রকিবুল ইসলাম বকুল বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে আমরা খুব উদ্বিগ্ন। এ ব্যাপারে কঠিন পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রী স্বরাষ্ট্রমান্ত্রীকে বলেছেন। তিনি অত্যান্ত কড়া ভাষায় এবং দ্রুততার সাথে এ পরিস্থিতির সমাধান দেখতে চান বলে জানিয়েছেন। সাধারণ জনমনে আতঙ্ক দুর করে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চান তিনি। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী কোনো ধরনের অজুহাত তিনি শুনতে চান না।
তিনি বলেন, আমরা আশাবাদী এখানে যারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যে কর্মকর্তারা আছেন হয় তারা এ সমস্যার সমাধান করবে না হয় তার আত্মসমর্পন করে চলে যাবেন। এর কোনো বিকল্প নেই। না হলে জনগণ একত্রিত হয়ে এ ব্যাপারে মাঠে নামাবে বলে হুশিয়ারি দেন তিনি।
হুইপ আরও বলেন, আমরা সরকারি দল এবং বিরোধী দল বুঝি না। আমরা জনগণ। জনগণের প্রতিনিধি। জনগণের পক্ষে আছি। আমরা চাই কোনোভাবে সন্ত্রাসীর দৌরাত্ম থাকবে না। সাধারণ মানুষের শান্তি থাকবে। কিভাবে হবে এটা প্রশাসনে যারা আছেন তারা ব্যবস্থা নিবেন। সে ব্যক্তি যেই হোক না কেনো যত বড় সন্ত্রাসী হোক না কেনো যত বড় নেতা হোক না কেনো কিংবা যার ছত্র ছায়ায় থাকুক না কেনো এ ব্যাপারে প্রশাসন কঠিন ব্যবস্থা না গ্রহণ করে জনপ্রতিনিধি হিসেবে বলতে চাই আমরা কিন্তু মাঠে নামব।
তিনি আরও বলেন, সন্ত্রাস দমনে আমরা আইনশৃঙ্খলা মিটিংয়ে বসেছিলাম। আমি আইনমন্ত্রীকে নিয়ে এ ব্যপারে কথা বলেছিলাম। এ ব্যাপারে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। সন্ত্রাস দমনে আমরা খুব আন্তরিক।


