৭২ বছরে পা দিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ১৯৫০ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর (ভাডনগর) গুজরাটে জন্মগ্রহণ করেন নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদি। বিশাল আয়োজনে মোদির জন্মদিন পালন করছে দেশটির ক্ষমতাসীন দল বিজেপি।

১৯৫০ সালের এই দিনে বম্বে প্রেসিডেন্সির (বর্তমান গুজরাট রাজ্যের) মহেসানা জেলার বড়নগর নামক স্থানে ঘাঞ্চী তেলী সম্প্রদায়ের এক নিম্নবর্গের পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন মোদি। তিনি তার পিতামাতার চার সন্তানের মধ্যে তৃতীয় ছিলেন। তার পিতার নাম দামোদারদাস মূলচাঁদ মোদি ও মায়ের নাম হীরাবেন মোদি।

বড়নগর রেলস্টেশনে তিনি তার পিতাকে চা বিক্রি করতে সহায়তা করতেন এবং কৈশোরে বাস স্ট্যান্ডের কাছে ভাইয়ের সাথে চা বিক্রি করুতেন। পুরো পরিবার একটি ছোট ৪০ ফুট বাই ১২ ফুট মাপের একতলা বাড়িতে বসবাস করতেন। তিনি এই শহরেই একজন সাধারণ মানের ছাত্র হিসেবে তার বিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করেন।

ছোট বেলায় স্বামী বিবেকানন্দের জীবন তাকে বিশেষ ভাবে অনুপ্রাণিত করে। আট বছর বয়সে মোদী রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের স্থানীয় শাখায় তার রাজনৈতিক গুরু লক্ষ্মণরাও ইনামদার নামক এক সাংগঠনিক কর্মীর সংস্পর্শে আসেন। ইনামদার তাকে সঙ্ঘের বালস্বয়ংসেবক হিসেবে দলে নেন।

ঘাঞ্চী সম্প্রদায়ের রীতি অনুসারে মোদির পিতা মাতা কৈশোর অবস্থায় তার বিবাহ স্থির হয়। তেরো বছর বয়সে যশোদাবেন চিমনলাল নামক এক মেয়ের সঙ্গে তার বিবাহ স্থির হয় এবং আঠারো বছর বয়সে তাদের মধ্য বিবাহ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। খুব কম সময় তারা একসঙ্গে সময় অতিবাহিত করেন কারণ এরপর মোদি পরিব্রাজকের জীবন অনুসরণ করার সিদ্ধান্ত নিলে তারা বিচ্ছিন্ন হন।

মোদীর জীবনীকার নীলাঞ্জন মুখোপাধ্যায়ের মতে এই বিবাহ কখনোই বিচ্ছেদ হিসেবে শেষ হয়ে যায়নি।চারটি নির্বাচনী প্রচারে মোদি নিজের বিবাহিত জীবন নিয়ে নীরবতা অবলম্বন করলেও ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত ষোড়শ সাধারণ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় তিনি যশোদাবেনকে নিজের আইনতঃ বৈধ পত্নী রূপে স্বীকার করে নেন।

২০১৪ সালে প্রকাশিত কিশোর মাকওয়ানা রচিত কমন ম্যান নরেন্দ্র মোদি গ্রন্থ থেকে জানা যায় যে সতেরো বছর বয়সে ঘর ছেড়ে চলে যাওয়ার পর তিনি রাজকোট শহরে অবস্থিত রামকৃষ্ণ মিশন ও তারপর বেলুড় মঠ যাত্রা করেন। এরপর তিনি আলমোড়া শহরে স্বামী বিবেকানন্দ প্রতিষ্ঠিত আশ্রমে যোগ দেন।

দুই বছর পর তিনি বাড়ি ফিরে এসে আমেদাবাদ শহরে নিজের কাকার চায়ের দোকানে যোগ দেন। এই সময় তিনি পুনরায় লক্ষ্মণরাও ইনামদারের সংস্পর্শে আসেন। এরপর তিনি গুজরাট রাজ্য মার্গ বাহন ব্যবহার নিগমের ক্যান্টিনের কর্মচারী হিসেবে যোগ দেন। ১৯৭০ সালে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের একজন পূর্ণসময়ের প্রচারক হিসেবে যোগ দেন তিনি। এই সময় তিনি দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দূরশিক্ষার মাধ্যমে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক এবং গুজরাট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করেন।

১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের বাংলাদেশ পাকিস্তান যুদ্ধ শেষ হলে মোদি আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘে যোগ দেন। নাগপুর শহরে প্রশিক্ষণের পর তাকে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের ছাত্র সংগঠন অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

১৯৭৫ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী কর্তৃক ঘোষিত জরুরীকালীন অবস্থায় বিরোধীদের গ্রেপ্তার করা হলে এবং রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলে মোদি গ্রেফতারি এড়ানোর জন্য কখনো শিখ, কখনো বয়স্ক ব্যক্তির ছদ্মবেশে গোপণে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে প্রচারপুস্তিকা বিতরণ ও বিক্ষোভ সমাবেশ সংগঠিত করতেন।

২০০১ খ্রিষ্টাব্দের ৭ই অক্টোবর মোদী গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তিনি রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের সরকারীকরণ ও বিশ্বায়নবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে গিয়ে বেসরকারীকরণের নীতি গ্রহণ করেন।

মোদি রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ নামক হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের একজন সদস্য এবং সংবাদমাধ্যম ও বিদগ্ধজনের মতো তিনি নিজেকে একজন হিন্দু জাতীয়তাবাদী হিসেবে দাবি করেন।

গুজরাটের দাঙ্গা, হিন্দুত্ববাদ
২০০২ সালের ২৭শে ফেব্রুয়ারি গোধরা স্টেশনে হিন্দু তীর্থযাত্রীদের বহনকারী একটি ট্রেনে আগুন দেয়া হলে ৫৯ জনের মৃত্যু হয়। ওই ঘটনার জন্য মুসলমানদের দায়ী করে গুজরাটে ব্যাপক হামলা, অগ্নসংযোগ চালায় হিন্দুত্ববাদীরা। টানা কয়েক দিনের দাঙ্গায় এক হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়।

মোদির বিরুদ্ধে অভিযোগ, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হয়েও তিনি দাঙ্গায় উসকানি দেন। তিনি নিজে কখনো ওই অভিযোগ স্বীকার করেননি। আদালতও তাকে অভিযোগ থেকে রেহাই দিয়েছে। তবে পরবর্তী সময়ে রাজ্যসভা নির্বাচনে মোদি কার্যত দাঙ্গার পক্ষে সাফাই গেয়েছেন এবং হিন্দুত্ববাদের ধুঁয়া তুলে ছিনিয়ে নিয়েছেন জয়।

ওই দাঙ্গার পর ভারত ও ভারতের বাইরে মোদির ভাবমূর্তি দারুণভাবে ক্ষুণ্ণ হয়। যুক্তরাষ্ট্র তাকে ভিসা দিতে অস্বীকার করে এবং যুক্তরাজ্যের সঙ্গেও তিক্ততা তৈরি হয়। এই প্রেক্ষাপটে একজন বিতর্কিত নেতার বদলে উন্নয়নের কাণ্ডারি হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে কৌশলী প্রচার শুরু করেন তিনি।

২০০৭ সালের পর তিনি নিজেকে তুলে ধরতে শুরু করেন একজন সর্বভারতীয় নেতা হিসাবে, প্রতিষ্ঠা করেন ‘ব্র্যান্ড মোদী’। আর এই চেষ্টায় তিনি যে পুরোপুরি সফল, তার প্রমাণ ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচন।

২০১১ সালের শেষের দিকে মোদি গুজরাটের মুসলিম সম্প্রদায়ের নিকটে পৌছাতে সদ্ভাবনা মিশনের অংশ হিসেবে বেশ কয়েকবার উপবাস অনশন করেন। তবুও এই কর্মসূচী মুসলিম সম্প্রদায় ভালোভাবে নিতে পারেননি। সৈয়দ ইমাম শাহী সায়েদ নামক এক মুসলিম ধর্মীয় প্রচারক এক সভায় মোদিকে মুসলিমদের টুপি দিতে গেলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন।

২০১৩ সালে মোদিকে বিজেপির প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী করা হয়। নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জিতে ২৬শে মে ২০১৪ সালে নরেন্দ্র ভারতের পঞ্চদশ প্রধানমন্ত্রীর পদে শপথ নেন তিনি। ২০১৯ সালেও বিপুল জয়ে ক্ষমতায় আসে বিজেপি। ফের প্রধানমন্ত্রী হন মোদি।

সূত্র: এনডিটিভি, ডয়চে ভেলে ও উইকিপিডিয়া