বাতাসে শীতের হিম হিম স্পর্শ। টলটলে মুক্ত বিন্দুর মতো শিশির জমতে শুরু করেছে ঘাসের ডগায়। কুয়াশার আঁচল সরিয়ে শিশিরবিন্দু দ্যুতি ছড়াতে শুরু করেছে ভোরের নরম রোদে। প্রকৃতি বলছে আসছে শীত। শীতকালে ভ্রমণের জন্য সবার প্রথম পছন্দ ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। খুলনা, সাতক্ষীরা আর বাগেরহাট জেলার কিছু অংশজুড়ে রয়েছে পৃথিবীর অপার বিস্ময়ের এই বন।

অরণ্যপ্রেমী এবং ওয়াইল্ড লাইফ যাদের পছন্দ তাদের জন্য সুন্দরবন একটি আদর্শ জায়গা। সবুজ বনে পাতা পড়ার শব্দ, পানির শব্দ, বাতাসে গাছের শব্দ ও ছোট বড় খালগুলো পর্যটকে নিয়ে যাবে এক নৈসর্গিক জায়গায়। তাই শীতকালে সুন্দরবন হতে পারে আপনার ভ্রমণের জন্য উপযুক্ত জায়গা।

নভেম্বরের শুরুতেই সুন্দরবনের দ্বার খুলেছে পর্যটকদের জন্য। ফলে দীর্ঘদিন পর প্রাণ চাঞ্চল্য ফিরে পেয়েছে সুন্দরবন কেন্দ্রিক পর্যটন শিল্পে।

বৈচিত্র্যময় সুন্দরবন:

সুন্দরবনের অপার সৌন্দর্য হাতছানি দেয় দেশি-বিদেশি নানা রংয়ের মানুষকে। বিশ্বের অন্যতম সমুদ্রতীরবর্তী ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। বৈচিত্র্যময় প্রাণিকুল নিয়ে এ বন। সুন্দরবন বিশ্বখ্যাতি অর্জন করেছে রয়েল বেঙ্গল টাইগার ও চিত্রা হরিণের জন্য। তবে এখানে বানর, কুমির, হাঙ্গর, ডলফিন, অজগর ও বনমোরগ ছাড়াও রয়েছে ৩৩০ প্রজাতির গাছ।

২৭০ প্রজাতির পাখি, ১৪ প্রজাতির সরীসৃপ, ৪২ প্রজাতির বন্যপ্রাণী ও ৩২ প্রজাতির চিংড়িসহ ২১০ প্রজাতির মাছ। এসব বন্যপ্রাণী ও সুন্দরবনের নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখতে দেশ-বিদেশের পর্যটকরা প্রতিনিয়ত সেখানে ছুটে যাচ্ছেন। জালের মতো অসংখ্য নদী আর খাল ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে সুন্দরবন জুড়ে।

দেশের আনাচ-কানাচ থেকে পর্যটক আসেন সুন্দরবনের সৌন্দর্য উপভোগ করতে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পর্যটকদের উপস্থিতি এখানে কম নয়। নৌযান ছাড়া সুন্দরবনে যাওয়া সম্ভব নয়। আবার নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সুন্দরবন ভ্রমণ অনেক ব্যয়বহুল।

তাই বিভিন্ন ট্যুর অপারেটর প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থা করেছে সুন্দরবন ভ্রমণের। খরচও কম হয়, অনেকের সঙ্গে নতুন পরিচয় হয় ভ্রমণের সময়। সুন্দরবন যাত্রার অন্তত এক সপ্তাহ আগে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়ে বন বিভাগ থেকে যাত্রার অনুমতি নিতে হয়। তাই সবচেয়ে ভালো হয় আপনি কোনো ট্যুর অপারেটরের সঙ্গে যোগাযোগ করে অন্তত ১৫ দিন আগে আপনার যাত্রা নিশ্চিত করতে পারেন।

শীতের সুন্দরবন:

শীতকাল সুন্দরবন ভ্রমণের উপযুক্ত সময়। এ সময় বনের অভ্যন্তরের নদী ও সমুদ্র শান্ত থাকে। তাই সুন্দরবন ঘুরে আসার সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হলো নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস।

এ সময় নদী ও সমুদ্র শান্ত থাকে, তাই সুন্দরবনের সব দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখা যায়। তবে মার্চ ও এপ্রিল মাস পর্যন্ত এখন সুন্দরবন ভ্রমণ করা যাবে। তবে বেশ কিছু এসি লঞ্চ এখন সুন্দরবনে যাতায়াত করছে।

তিনি বলেন, সুন্দরবনের পর্যটকদের যাতায়াতের জন্য খুলনায় ছোট-বড় ৬০টি লঞ্চ রয়েছে। ইতোমধ্যে অনেক পর্যটকরা সুন্দরবনের সৌন্দর্য অবলোকনের জন্য ছুটে আসছেন।

সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের করমজলে পর্যটন ও বন্যপ্রাণী প্রজননকেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আজাদ কবির বলেন, পর্যটকদের বরণের জন্য প্রস্তুত আমরা সব সময়। সাধারণত নভেম্বরের শুরু থেকে সুন্দরবনে পর্যটকদের আনাগোনা বাড়ে। তবে এবার তুলনামূলক কম পর্যটক আসছে।

সুন্দরবনে দেখার মতো স্পটগুলো:

বাংলাদেশের বণ্যপ্রাণীর বৃহত্তম আবাসস্থল সুন্দরবনজুড়েই পর্যটকদের জন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখার অপার সুযোগ রয়েছে। তবে সুন্দরবনে ঘুরে দেখার মতো স্পটগুলো হলো শরণখোলার টাইগার পয়েন্ট হিসেবে পরিচিত কটকা, কচিখালীর অভয়ারণ্যকেন্দ্র, করমজল বন্যপ্রাণী ও কুমির প্রজননকেন্দ্র, কলাগাছিয়ায় ইকোট্যুরিজম সেন্টার, হিরণপয়েন্ট খ্যাত নীলকমল অভয়ারণ্য, দুবলারচর, মানিকখালী, আন্দারমানিক ও দোবেকী এলাকায় পর্যাটকদের আনাগোনা বেশি থাকে।

থাকুন ইকো কটেজে:

বাগেরহাটের মোংলার দক্ষিণ চিলায় বাদাবন ইকো কটেজসহ সুন্দরবনের আশপাশের এলাকায় বেশ কিছু কমিউনিটি ট্যুরিজম গড়ে উঠেছে। কর্পোরেট, কাস্টমাইজড, ফ্যামিলি, স্টুডেন্ট, বাইকার সব ধরনের ট্যুরিস্টরা এখানে আসতে পারেন।

সুন্দরবনের কোল ঘেঁষে সম্পূর্ণ ইকো সিষ্টেমে তৈরি কটেজ থেকে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে হারিয়ে যাওয়া, ভয় ভয় অনুভূতি নিয়ে বনের ছোট খালে নৌকা ট্রিপ, ফিরে এসে কটেজের ফলগাছ থেকে বিভিন্ন জাতের দেশীয় ফল, পুকুরে অবাধ সাঁতার ।

বড়শি/জাল দিয়ে পুকুর অথবা ঘেরে মাছ ধরা, গ্রাম্য হাট, জেলে পল্লী ঘুরে সন্ধ্যায় কটেজের বিচ চেয়ারে বসে সূর্যাস্তের মনোরম দৃশ্য উপভোগ করা যায় বাদাবন ইকো কটেজে থেকে। রাতে খোলা আকাশের নিচে তাবুতে থেকে চাঁদ-তারার লুকোচুরির সঙ্গে বার-বি-কিউ পার্টি জমানো যায়।

কিভাবে যাবেন সুন্দরবন:

একদিনেই সুন্দরবন ভ্রমণ করতে চাইলে করমজল পর্যটন কেন্দ্রে যেতে পারেন। ঢাকার মতিঝিল, আরামবাগ, শ্যামলী, কল্যাণপুর, গাবতলী থেকে গ্রিনলাইন, সোহাগ, হানিফ, ঈগল, এ কে ট্রাভেলসসহ বিভিন্ন এসি/ননএসি বাস খুলনার উদ্দেশে ছেড়ে যায় সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত।

এছাড়া সায়দাবাদ থেকে টুঙ্গিপাড়া এক্সপ্রেস, ফাল্গুনী পরিবহন, সুন্দরবন, পর্যটক, বনফুলসহ বিভিন্ন বাস খুলনা, বাগেরহাট ও মোংলার উদ্দেশে ছেড়ে যায় সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত। এসব বাসে পদ্মা সেতু পাড় হয়ে আগের তুলনায় খুব কম সময় খুলনায় যেতে পারেন।

খুলনায় ট্রেনে এবং যশোর পর্যন্ত বিমানে যাওয়া যাবে। পাশাপাশি নৌপথেও যেতে পারেন। খুলনায় নেমে লোকাল বাসে বাগেরহাট, মোংলা যাওয়া যাবে। এছাড়া ঢাকা থেকে সরাসরি মোংলায় অনেক বিলাসবহুল বাসে যেতে পারেন।

মোংলা থেকে করমজল লঞ্চ বা ট্রলারে মাত্র ৪৫ মিনিটের পথ হওয়ায় দিনে গিয়ে দিনেই ফিরে আসার সুবিধা রয়েছে। এছাড়া ভ্রমণে তুলনামূলক খরচও কম। খুলনার বিআইডব্লিউটিএ লঞ্চ ঘাট থেকেও সুন্দরবন যাওয়া যায়।

এখানে বনের ভেতরে ঘুরতে আপনার অবশ্যই ফরেস্ট অফিসারের অনুমতি প্রয়োজন হবে। আপনার আলাদা করে এ ঝামেলা সামলাতে হবে না যদি আপনি ভ্রমণের জন্য ট্যুর অপারেটরকে বেছে নেন। ট্যুর অপারেটররা বন বিভাগের কাছ থেকে ভ্রমণের অনুমতিসহ সবকিছুর দায়িত্ব নেন।

খুলনা ও মোংলায় রয়েছে এমন শতাধিক ট্যুর অপারেটর। ঢাকাতেও রয়েছে। সুযোগ আছে খুলনার কয়রা এবং সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও মুন্সিগঞ্জ থেকে সুন্দরবন দেখার।