বর্ষার ভরা মৌসুমে চারদিকে পানি থই-থই করার কথা থাকলেও বাস্তবচিত্র একেবারেই ভিন্ন। শ্রাবণ শেষ সপ্তাহে গড়িয়েছে, কিন্তু দেশের অধিকাংশ অঞ্চলে পর্যাপ্ত বৃষ্টির দেখা নেই। খাল-বিল, ডোবা, নালা ও ফসলি জমির মাঠ এখনো প্রায় শুষ্ক। এতে করে দেশের কৃষকরা পড়েছেন বিপদে। বিশেষ করে পাটচাষিরা পড়েছেন মহাবিপদে। পাট জাগ দেওয়ার মতো পানি মিলছে না জলাশয়ে। প্রয়োজনীয় পানির অভাবে নলকূপ দিয়ে ভূগর্ভের পানি তুলে পাট জাগ দিচ্ছেন তারা। অনেকে আবার বৃষ্টির আশায় মাঠেই পাট রেখে দিয়েছেন।
দেশে সবচেয়ে বেশি পাট উৎপাদন হয় ফরিদপুর জেলায়। এবার ফরিদপুরে ৮৭ হাজার হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্য প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার টন। কিন্তু পাট জাগ না দিতে পারায় হতাশ স্থানীয় কৃষকরা। তাদের দাবি, নির্দিষ্ট সময়ে বৃষ্টি না হওয়ায় সঠিক উপায়ে পাট জাগ দেওয়া সম্ভব হয়নি। এতে করে পাটের গুণগত মান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে বলে জানান পাটচাষিরা।
জেলার নগরকান্দা উপজেলার উত্তর গোপীনাথপুরের খোকন শেখ দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ সময় কখনো এমন পানির সংকট দেখেননি তিনি। জাগ দেওয়ার পানি নেই। প্রতি বছর উৎপাদন কমবেশি হলেও পাটের রং ঠিক থেকেছে সময়মতো পানি পাওয়ায়। কিন্তু এবার আবাদ ভালো হলেও পাট জাগ দেওয়ার পানি পাচ্ছি না। বৃষ্টির দেখা নেই। ক্ষেতে পাট রেখে দেওয়ায় নষ্ট হচ্ছে। অনেকটা বাধ্য হয়ে গ্রামের খালের দুই মুখ বেঁধে পাঁচ-ছয়টি শ্যালো মেশিন দিয়ে পানি তুলে জাগ দেওয়ার ব্যবস্থা করছেন। কিন্তু এতে দুশ্চিন্তা যাচ্ছে না। খরচ বেশি হচ্ছে। পাটের রং খারাপ হতে পারে।
একই অবস্থা মানিকগঞ্জের পাটচাষিদের। জেলার সাটুরিয়া উপজেলার খলিলাবদ গ্রামের পাটচাষি মাহানী বলেন, গত বছর এ সময় খেতেই বর্ষার পানি ছিল। ফলে পাট কেটে খেতেই পচিয়েছেন। এ বছর পানির অভাবে ক্ষেতেই পাট রেখে দিয়েছেন। পাট কাটার পর আমন চারা লাগান তারা। কিন্তু এবার তা সম্ভব হচ্ছে না। পাট না কাটার ফলে আমন চাষ করা যাচ্ছে না। এতে তারা দুদিকেই লোকসানে আছি।
একই উপজেলার কান্দা পাড়া গ্রামের পাটচাষি সোবহান বলেন, ‘পানি না থাকায়, পাট থেকে আঁশ খুলে পানিতে পচাতে বলছে কৃষি অফিস থেকে। আমরা এ পদ্ধতি আগে কখনো দেখি নাই। তাই তা করতেও পারছি না। এতে আমার পাট কাটার উপযুক্ত সময় হলেও তা কাটতে পারছি না।’
শুধু ফরিদপুর বা মানিকগঞ্জ নয় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাটচাষিদের একই অবস্থা। চলতি মৌসুমে (২০২২-২০২৩) দেশে ৭ লাখ ৪৫ হাজার হেক্টরে পাট ও পাটসদৃশ তন্তু চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। আর পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৮৫ লাখ ৫৫ হাজার ৩৫৬ বেল। তবে অনাবৃষ্টির কারণে এবার পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত হতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা কৃষিবিদ ড. এস এম মনিরুজ্জামান বলেন, দেশে এবার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি পাট চাষ হয়েছে। কিন্তু অনাবৃষ্টির কারণে কৃষকরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বেন। কারণ দেশের অনেক স্থানেই পর্যাপ্ত বৃষ্টি হয়নি। জলায়শয়গুলোতেও পানি নেই। আবার বদ্ধ জায়গায় পাট জাগ দেওয়া হলে পাটের মান নষ্ট হয়। পাট জাগ দিতে না পেড়ে অনেকই মাঠেই পাট রেখে দিয়েছেন। আবার কোনো কোনো অঞ্চলের কৃষক ভূগর্ভস্থ থেকে পানি তুলে পাট জাগ দিচ্ছে। এতে একদিকে যেমন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে পাটের গুণগত মান নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, দেশে কয়েক বছর ধরে অনাবৃষ্টি দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে যাতে কৃষক সঠিক সময়ে পাটের ছাল আলাদা করতে পারে তাই ‘রিবন রেটিং পদ্ধতি’ চালু করা হয়েছে। এ পদ্ধতিতে কাটার পর পাটের ছাল আলাদা করে পানিতে রাখা হয়। এতে পানি কম লাগে। কিন্তু অনেক কৃষক এতে অভ্যস্ত না।
এই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা হতাশার কিছু দেখছি না। আশা করি কয়েক দিনের মধ্যে বৃষ্টিপাত শুরু হবে। মাঠে এখন যেসব পাট রয়েছে বৃষ্টিপাত শুরু হলে কৃষকরা তা সঠিক উপায়ে প্রক্রিয়াজাত করতে পারবেন।’
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায়, জুলাই মাসে দেশে গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ৫০০ মিলিমিটার। কিন্তু এ বছর জুলাইয়ে গড় বৃষ্টিপাত ছিল ২১১ মিলিমিটার (মিমি)। ২০২০ সালে গড় বৃষ্টিপাত হয়েছিল ৫৫৩ মিমি। ২০২১ সালে গড় বৃষ্টিপাত হয়েছিল ৪৭১ মিমি, যা অন্যান্য বছরের তুলনায় ৫ দশমিক এক শতাংশ কম। শুধু তাই নয়, এ সময় অন্যান্য বছরের তুলনায় জুলাইয়ে গড় তাপমাত্রা বেড়েছে। জুলাইয়ে গড় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৩ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যেখানে গত ৩০ বছরের গড় তাপমাত্রা ৩১ দশমিক এক ডিগ্রি সেলসিয়াস।
আবহাওয়ার অস্বাভাবিক পরিস্থিতির কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতিরিক্ত গরমে মেঘ পুঞ্জীভূত হতে পারছে না। গরম বাতাসের ধাক্কায় মেঘে যে পানি থাকে তা বৃষ্টি হয়ে নামার আগেই বাষ্প হয়ে যাচ্ছে। তীব্র গরমের কারণে বাতাসের স্বাভাবিক গতি প্রবাহে পরিবর্তন এসেছে। এর প্রভাবে ফসলের আবাদ কমে যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তায় বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ ড. আবুল কালাম মল্লিক বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী চরম আবহাওয়া পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। যার প্রভাব আমাদের দেশেও পড়েছে। জুলাই মাসে দেশে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম বৃষ্টি হয়েছে। আবার একই সময় স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা ছিল। এমন বাড়তি তাপমাত্রা ও কম বৃষ্টিপাত কৃষি ও পরিবেশের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে।’ তিনি বলেন, সপ্তাহ জুড়ে বৃষ্টিপাত হবে তবে এর তীব্রতা অনেক কম থাকবে।
অনাবৃষ্টির কারণে কৃষকরা ভূগর্ভস্থ থেকে পানি তুলে চাষাবাদ করার ফলে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পরবে বলে মনে করেন ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নাজমুন নাহার। তিনি বলেন, এ বছরই যে বৃষ্টিপাত কম হয়েছে বিষয়টা কিন্তু এমন না। তবে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে কম বৃষ্টিপাত হয়েছে গত জুলাই মাসে। তিনি বলেন, ‘আমরা একটা গবেষণা করেছিলাম তাতে দেখা গেছে গত ৪০-৪৫ বছরে বর্ষায় বৃষ্টিপাতের যে প্রবণতা ছিল তার ধরনটা পরিবর্তন হয়েছে। যদি আমরা চার-পাঁচ বছর আগের বর্ষার চিত্র দেখি তাহলে দেখা যাবে যে সময়টা বৃষ্টিপাত হওয়ার কথা সেটা পরিবর্তন হয়ে সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরে দিকে হচ্ছে। এতে দেখা যায় গড় বৃষ্টিপাত কোনো বছর বেড়ে যাচ্ছে আবার কোনো বছর কমে যাচ্ছে। তার মানে বৃষ্টিপাতের সময়ের পরিবর্তন ঘটেছে। এর ফলে কৃষকরা তার ফসলের সময় অনুযায়ী বৃষ্টিপাত পাচ্ছে না।’
এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘আবহাওয়ার এই পরিবর্তনের জন্য কৃষকরা ভূগর্ভস্থ থেকে পানি উত্তোলন করে চাহিদা মেটাচ্ছেন। এটা কিন্তু এটা উদ্বেগের বিষয়। দেখা যাবে এভাবে চলতে থাকলে আগামী কয়েক বছর পর পানির স্তর অস্বাভাবিকভাবে কমে যাবে। তখন দেখা যাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল বরেন্দ্রভূমির মতো অবস্থা হবে। এভাবে অপরিকল্পিতভাবে ভূগর্ভের পানি তুলতে তুলতে এর ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রতি বছর যদি একটু একটু করে নিচে নেমে যেতে থাকে তাহলে একটা সময় আর পানি উঠবে না। তাই ভূগর্ভের পানির ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে হবে। বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে।’
পিএসএন/এমআই


