
প্রতিনিয়তই অর্ডার কমছে পোশাক খাতে। উৎপাদন কমছে কারখানাগুলোয়। সংকটের মুখে পড়তে হচ্ছে গার্মেন্ট শ্রমিকদের। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে এতদিন বেতন ও ওভারটামে কোনোভাবে দিন পার করা গেলেও এবার বিপাকে পড়তে হচ্ছে তাদের। অর্ডার কম থাকায় বেশিরভাগ কারখানাই বন্ধ করে দিয়েছে ওভারটাইম সুবিধা। এতে মূল বেতনই এখন একমাত্র ভরসা। অন্যদিকে পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে যেন কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে এসব শ্রমিকের।
এদিকে অনেক পোশাক কারখানার মালিকপক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এবার আসন্ন ঈদুল ফিতর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে চলতি মাসের ২১ অথবা ২২ তারিখে। ফলে এই মাসের বেতন পাবেন না শ্রমিকরা। তবে বোনাস দেওয়া হবে।
কিন্তু মাসের শেষ সপ্তাহ যেহেতু পড়ে যাচ্ছে তাই পুরো মাসেরই বেতন চান শ্রমিকরা। এখানেই তৈরি হতে পারে অন্যতম সংকট। তবে এখন পর্যন্ত সংকটের কথা প্রকটভাবে সামনে আসেনি গার্মেন্টস মালিক বা শ্রমিকদের পক্ষ থেকে।
অন্যদিকে ডিসেম্বরে বকেয়া বেতনের দাবিতে রাজধানীর কমলাপুরে মূল সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করছিলেন ইথিক্যাল টেক্সটাইল ফ্যাশনের ৩ শতাধিক শ্রমিক। এছাড়া গত তিন মাসে বেতনের দাবিতে কোনো ফ্যাক্টরিতে আন্দোলনের কথা শোনা যায়নি। ফলে শ্রমিকের আয় কমে গেলেও খুব বেশি বেতন সংকট নেই।
তাসলিমা আখতার, বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতির সভা প্রধান। জার্মানভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলেকে তিনি বলেন, খুব বেশি বেতন সংকট নেই সত্যি। কিন্তু শ্রমিকের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। দ্রব্যমূল্য নিয়ে ভালো বেতনে চাকরি করা মানুষেরই নাভিশ্বাস উঠেছে। সেখানে ৮ হাজার টাকা বেতন পাওয়া শ্রমিক জীবন চালাবেন কীভাবে?
এখন আর ওভারটাইম নেই। মূল বেতন দিয়ে মাছ-মাংস তো দূরের কথা শাক-সবজি কেনাই কঠিন হয়ে গেছে। এখন মাসের শেষ সপ্তাহে ঈদ হলে শুধু বোনাস দিয়ে শ্রমিকরা ঈদ করবেন কীভাবে? অবশ্যই তাদের বেতন দিতে হবে। আমরা আগামী সপ্তাহ থেকে বিষয়টি নিয়ে মালিকদের সঙ্গে কথা বলব।
তাসলিমা আখতার
তবে আসন্ন ঈদুল ফিতরে বেতন দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই বলে মনে করেছেন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সিনিয়র সহ-সভাপতি শহিদউল্লাহ আজিম। তিনি বলেছেন, মাস শেষ না হলে তো আপনি বেতন চাইতে পারেন না। আমরা মার্চের বেতন পরিশোধ করে দেবো। বোনাসও দেবো। কিন্তু এপ্রিলের বেতন দিতে পারব না। দেখেন এখন একটা ফ্যাক্টরির যে উৎপাদন ক্ষমতা তার ৬০ থেকে ৭০ ভাগ কাজ হচ্ছে। গত তিন মাস ওভারটাইম বন্ধ। ভয়াবহভাবে অর্ডার কমে যাচ্ছে। মালিকদের টিকে থাকাই মুশকিল। সেখানে অযৌক্তিক দাবি করা হলে আমাদের পক্ষে সেটা মেটানো সম্ভব নয়।
এদিকে গার্মেন্টে মজুরি বোর্ডের মেয়াদও শেষ হয়ে গেছে। নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের প্রস্তুতি চলছে। সরকারের তরফ থেকে মজুরি বোর্ড গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গার্মেন্টস খাতে নিয়োজিত শ্রমিকদের মাসিক মজুরি বাড়িয়ে ন্যূনতম ২৫ হাজার টাকাকরার দাবি জানিয়েছে শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন।
কল্পনা আখতার, বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কার সলিডারিটির প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক। তিনি বলেন, বর্তমানে একজন শ্রমিকের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য ও বাসা ভাড়া মিলিয়ে ১৪ হাজার টাকার বেশি প্রয়োজন হয়। বাজারে শুধু চালের পেছনেই প্রতিটি পরিবারের খরচ বেড়েছে ২ হাজার ১০০ টাকা। এই পরিস্থিতিতে বর্তমান মজুরি দিয়ে বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। ২০১৮ সালে গার্মেন্টস শ্রমিকদের মাসিক ন্যূনতম বেসিক বেতন নির্ধারণ করা হয় ৪ হাজার ১০০ টাকা, বাসা ভাড়া ২ হাজার ৫০ টাকা, খাদ্য ভাতা ৯০০ টাকা, চিকিৎসা ভাতা ৬০০ টাকা ও যাতায়াত ভাতা ৩৫০ টাকা মিলিয়ে সর্বনিম্ন মোট মজুরি ধরা হয় ৮ হাজার টাকা। বর্তমানে এই টাকায় বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। তাই আমরা দ্রুত বেতন বাড়ানোর দাবি জানিয়েছি।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন বলেন, উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় কারখানা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। একটা ফ্যাক্টরির আগে গ্যাস বিল দিতে হতো ৩ কোটি টাকা। এখন সেই ফ্যাক্টরির গ্যাস বিল আসছে ১০ থেকে ১২ কোটি টাকা। এর বাইরে বিদ্যুতের বিলও একইভাবে বেড়েছে। তাহলে ফ্যাক্টরি চলবে কীভাবে? এতকিছুর পরও আমরা শ্রমিকদের নিয়মিত বেতন ভাতা পরিশোধ করে আসছি। সামনে ঈদ, এখন বেতন-ভাতা দেওয়াটাই আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। সবার সহযোগিতা না থাকলে আগামীতে টেক্সটাইল খাত টিকে থাকতে পারবে না।
এদিকে গার্মেন্টস মালিকরা বলছেন, ইউরোপের বাজারে রফতানি কমেছে তাদের। তবে ইউরোপীয় পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের সর্বশেষ প্রতিবেদন বলছে ভিন্ন কথা। চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রকাশিত সংস্থাটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত (৯ মাসে) ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) সারাবিশ্ব থেকে ৮৬ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের পোশাক আমদানি করেছে। ২০২১ সালের ওই সময়ের তুলনায় যা ২৪ দশমিক ৪১ শতাংশ বেশি। এই সময়ে বাংলাদেশ থেকে ১৯ দশমিক ৪০ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৯৪০ কোটি ৭০ লাখ ২০ হাজার মার্কিন ডলার মূল্যের পোশাক আমদানি করেছে ইইউ। যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১৩ দশমিক ৬৯ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৩৬৯ কোটি ৫ লাখ ১০ হাজার ডলার। দেখা গেছে, বাংলাদেশ থেকে ইউরোপ পোশাক আমদানি বাড়িয়েছে ৪১ দশমিক ৭৬ শতাংশ।
মহিউদ্দিন রুবেল, বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) পরিচালক। তিনি বলেন, ইউরোস্ট্যাটের দেওয়া তথ্য গত বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত। ওই সময় ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশ ভালো করছে। এই সময়ের পর ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের রফতানি কমেছে। যা তাদের পরবর্তী রিপোর্টে পাওয়া যাবে। আমরা যেটা বলছি, গত ডিসেম্বর থেকেই মূলত রফতানি কমতে শুরু করেছে। যার প্রভাব এখনও রয়েছে।


