কঠোর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যদিয়ে খুলনা সিটি কর্পোরেশনের (কেসিসি) ভোট আজ সোমবার। মেয়র পদে নির্বাচন নিয়ে অনাগ্রহ থাকলেও কাউন্সিলর নির্বাচন নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে ভোটারদের। এ নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ করতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রায় সাড়ে ৮ হাজার সদস্য মোতায়েন থাকছে। দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি সিটি নির্বাচন বয়কট করলেও ভোটকে উৎসব মুখর করতে কোনো প্রচেষ্টার কমতি রাখেনি নির্বাচন কমিশন। সাধারণ ভোটারদের কেন্দ্রে নিতে সর্বাত্মক চেষ্টা থাকবে আ’লীগের। অন্যদিকে দলীয় নেতাকর্মী-সমর্থকদের ভোট কেন্দ্রে না যেতে নির্দেশ দিয়েছে বিএনপি।
সূত্রে জানা গেছে, ভোট কেন্দ্র ও নগরীর নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করছে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, আনসারসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রায় ৮ হাজার ৩০০ জন সদস্য। নির্বাচনী মাঠে রয়েছেন ৪৪ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং ১০ জন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট। গুরুতর অপরাধ সংঘটিত হলে ঘটনাস্থলেই বিচারিক কার্যক্রম সম্পন্ন করার জন্য প্রস্তুত থাকবেন জুডিশিয়াল টীম।
এদিকে, ভোট কেন্দ্রগুলোতে স্থাপন রয়েছে ২ হাজার ৩০০টি ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা। প্রায় তিন হাজার ইভিএম মেশিনে ভোট গ্রহণ করা হচ্ছে। পর্যবেক্ষণ করছেন বেসরকারি দু’টি সংস্থার ২০ জন ও নির্বাচন কমিশনের ১০ জন কমিশনার।
প্রসঙ্গত, খুলনা সিটি নির্বাচনে এবার ৫ লাখ ৩৫ হাজার ৫২৮ জন ভোটার রয়েছেন। নগরীর ৩১টি ওয়ার্ডের ২৮৯টি ভোটকেন্দ্র এবং ১ হাজার ৭৩২টি বুথ স্থাপন করা হয়েছে। ভোট গ্রহণ কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে ৫ হাজার ৭৬০ জন কর্মকর্তা দায়িত্বে থাকবেন।
এবারের সিটি নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করছেন আ’লীগ মনোনীত প্রার্থী তালুকদার আবদুল খালেক (নৌকা), জাতীয় পার্টি মনোনীত মোঃ শফিকুল ইসলাম মধু (লাঙ্গল), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনোনীত মাওলানা মোঃ আব্দুল আউয়াল (হাতপাখা) ও জাকের পার্টি মনোনীত এস এম সাব্বির হোসেন (গোলাপফুল) এবং টেবিল ঘড়ি প্রতীক নিয়ে একমাত্র স্বতন্ত্র প্রার্থী এস এম শফিকুর রহমান (মুশফিক)। এছাড়া সাধারণ ৩১টি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে ১৩৬ জন এবং ১০টি সংরক্ষিত ওয়ার্ডে ৩৯ জন কাউন্সিলর প্রার্থী প্রতিদ্ব›িদ্বতা করছেন। এরমধ্যে নগরীর ১৩নং ওয়ার্ডে এস এম খুরশিদ আহমেদ টোনা এবং ২৪নং ওয়ার্ডে জেড এ মাহমুদ ডন বিনাপ্রতিদ্ব›িদ্বতায় নির্বাচিত হয়েছেন।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ (কেএমপি) কমিশনার মোঃ মাসুদুর রহমান ভূঁঞা বলেন, জনগণকে একটি সুষ্ঠু নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন উপহার দিতে কৌশল, সহনশীলতা ও বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ ঘটিয়ে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের সাথে নিজেদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করবে। ভোটকেন্দ্রে নিয়োজিত অফিসার ও ফোর্সগণের সর্বোচ্চ সতর্কতার সাথে দায়িত্ব পালন করতে নির্দেশ দিয়েছি। একই সাথে সকলকে নির্বাচনী আচরণবিধি মেনে চলতে হবে।
কেসিসি নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা মোঃ আলাউদ্দিন বলেন, খুলনা বিভাগীয় ক্রীড়া কমপ্লেক্স থেকে কেন্দ্রে কেন্দ্রে সরঞ্জাম পাঠানো হয়েছে। সোমবার (১২ জুন) সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বিরতীহীন ভোটগ্রহণ করা হবে। জেলা শিল্পকলা একাডেমি অডিটোরিয়ামে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করা হবে। সকল প্রার্থী, তাদের কর্মী-সমর্থক ও সাধারণ জনগনকে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের স্বার্থে নির্বাচনী আচরণবিধি নেমে সহনশীলতার পরিচয় দিতে আহবান জানিয়েছেন তিনি।
১৬টি পেট্রোল টীম র্যাবের : নির্বাচন চলাকালীন সার্বক্ষনিক নিরাপত্তা নিশ্চয়তায় মোবাইল পেট্রোলিং এবং স্ট্যাটিক পজিশনিং এর মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে র্যাব-৬। গতকাল রবিবার প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেছেন অধিনায়ক র্যাব-৬।
তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী পর্যাপ্ত সংখ্যক র্যাব সদস্য স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। এছাড়াও শহরের প্রবেশ ও বাহিরের পথসহ বিভিন্ন স্থানে র্যাবের চেকপোস্ট স্থাপন করা হয়েছে। সাদা পোশাকে আমাদের গোয়েন্দারা বিভিন্ন স্থানে তথ্য সংগ্রহে নিয়োজিত রয়েছে। ভোটকেন্দ্র ও আশে পাশে যাতায়ত পথের নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে ইতিমধ্যে র্যাবের বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের সদস্যরা কাজ করছে। নির্বাচন সংক্রান্তে যে কোন ধরনের গুজব/অপপ্রচার প্রতিরোধে আমাদের মনিটরিং সেল গঠন করা রয়েছে। এছাড়া আমাদের ১৬টি পেট্রোল নির্বাচন চলাকালীন সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চয়তায় মোবাইল পেট্রোলিং এবং স্ট্যাটিক পজিশনিং এর মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। যেকোন বিপর্যয় মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় সংখক রিজার্ভ ফোর্স প্রস্তুত রাখা হয়েছে। নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখার লক্ষ্যে যেকোন অপ্রীতিকর ঘটনা কঠোর হাতে দমন করা হবে। আইন-শৃঙ্খলা পরিপন্থী কোন কার্যক্রম ঘটলে যথাযথ সময় আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা বাস্তবায়ন ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে র্যাব ফোর্সেস বদ্ধ পরিকর।
অন্যদিকে, কেসিসি নির্বাচনে ভোট দিলে নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক কঠোর ব্যবস্থা নেবার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে খুলনা মহানগর বিএনপি। গোপন মনিটরিং সেল গঠনের পাশাপাশি বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্বের সাথে মনিটরিং করছেন খুলনা বিএনপি’র শীর্ষ নেতৃবৃন্দ। ইতোমধ্যে দলীয় নির্দেশনা অমান্য করে নির্বাচনে অংশ নেয়ায় ৯ জনকে আজীবন বহিষ্কার করেছে দলটি।
কেসিসি’র ইতিহাস বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১৯৯০ সালের ৬ আগস্ট মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন থেকে সিটি কর্পোরেশনে রূপান্তর হয় খুলনা মহানগরী। এরপর ৩৩ বছরের মধ্যে ২২ বছরই নগর পিতার চেয়ারে ছিলেন স্থানীয় বিএনপি’র শীর্ষস্থানীয় নেতারা। কেসিসি’র বিগত পাঁচটি নির্বাচনের তিনটিতেই জয়ী হয় জাতীয়তাবাদীরা। অন্য দু’টিতে ছিল তীব্র প্রতিদ্ব›িদ্বতা। কিন্তু দলের সিদ্ধান্তে এবারই বিএনপি’র কেউ প্রার্থী হননি। সিটি কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠার পর প্রথম নির্বাচন হয় ১৯৯৪ সালের ৩০ জানুয়ারি। ওই নির্বাচনে আ’লীগের মাহাবুবুল আলম হিরণকে হারিয়ে মেয়র হন বিএনপি’র প্রয়াত নেতা শেখ তৈয়েবুর রহমান। ২০০২ সালের নির্বাচনে পুনরায় নির্বাচিত হন তিনি। ২০০৮ সালের নির্বাচন বর্জন করেছিল বিএনপি। দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে প্রার্থী হয়েছিলেন নগর বিএনপি’র তৎকালীন সাংগঠনিক সম্পাদক মনিরুজ্জামান মনি। নির্বাচনে মহানগর আ’লীগের সভাপতি তালুকদার আবদুল খালেক বিজয়ী হন। ২০১৩ সালের নির্বাচনে খালেককে পরাজিত করে মেয়র নির্বাচিত হন মহানগর বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান মনি। ২০১৮ সালে বিএনপি থেকে প্রার্থী হন মহানগর সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু। তাঁকে পরাজিত করে দ্বিতীয়বারের মতো মেয়র হন তালুকদার আবদুল খালেক।


