খুলনার জনগণ পেতে যাচ্ছে নতুন বাস ও নতুন রুট
নয়ন ইসলাম : আগামী ২৫ই জুনের পর থেকে আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফেরীর জন্য অপেক্ষা করতে হবে না দক্ষিণাঞ্চলের কোটি মানুষের। ঘাটে অপেক্ষারত যাত্রী ও পণ্যবাহী ট্রাকচালকদের দুর্ভোগের শেষ থাকে না। নদী পার হতে অপেক্ষা করতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা, অনেক সময় দিনও পার হয়ে যায়। ঈদ এবং উৎসবে ঘরমুখো মানুষের দুর্ভোগ বেড়ে যায় কয়েকগুণ। ৩৫ বছর ধরে দুর্ভোগ মাথায় নিয়ে যাতায়াত করতে হয়েছে জেলার লাখ লাখ মানুষকে।
অবশেষে ফেরিঘাটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার দিন শেষ হচ্ছে। পদ্মা সেতু চালুর মধ্য দিয়ে বদলে যাচ্ছে ৩৫ বছরের পুরনো ঘাটের দৃশ্য। আশায় বুক বেঁধেছেন দক্ষিণাঞ্চলের কোটি মানুষ। তিন থেকে চার ঘণ্টা নয় এখন থেকে পদ্মা নদী পার হতে সময় লাগবে মাত্র ৬/১০ মিনিট।
আগামী ২৫ জুন উদ্বোধন হতে যাচ্ছে কোটি মানুষের স্বপ্নের পদ্মা সেতুর। এর একদিন পর (২৬ জুন) থেকেই সেতু দিয়ে চলাচল করবে যানবাহন। এতে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার মানুষের যাতায়াত ভোগান্তি ও খরচ কমবে। দ্বার উন্মোচন হবে ব্যবসা-বাণিজ্যের।
তবে সেতু উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে গুরুত্ব কমবে নৌঘাটগুলোর। বদলে যাবে ঘাটের চিরচেনা দৃশ্য। ঘাটগুলোতে যাত্রী ও যানবাহনের উপচে পড়া ভিড় কমবে। তবে লঞ্চ, স্পিডবোট ও ফেরিগুলো আগের মতো চালু থাকবে।
খুলনা জেলা বাস মিনিবাস কোচ মালিক সমিতির যুগ্ন-সম্পাদক মোঃ আনোয়ার হোসেন সোনা প্রতিদিন সেবককে বলেন, পদ্মা সেতু আমাদের জন্য স্বপ্ন । সেতু চালু হবার পর এই অঞ্চলের পরিবহন খাতে ব্যাপক উন্নয়ন এবং পরিবর্তন হবে । যা ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গিয়েছে। খুলনার বেশিরভাগ জনগন ঢাকা যাওয়ার জন্য কাঁঠালবাড়ি-মাওয়া রুটের ফেরি/লঞ্চে ভ্রমন করে থাকে। এতে করে এতদিন অসহনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হত যাত্রিদের। বিশেষ করে আমাদের এই অঞ্চল থেকে যখন কোন রোগী পরিবহন করা হত অনেক রোগীই ফেরিঘাটে আম্বুলেন্সে বসে মারা গেছেন।শুধুমাত্র সমইয়মত ঢাকার হাসপাতালে পৌছাতে না পারার কারনে।এবং এই রুটে অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় কোন বিলাশবহুল বাসও ছিল না ।
তিনি আরও জানান দেশের সনামধন্ন্য বিলাশবহুল পরিবহন কোম্পানিগুলো শুধুমাত্র এই রুটের ফেরীর ব্যাবস্থাপনার কারণে তাদের বাস গুলো এই রুটে চালু করেনি। কিন্তু পদ্মা সেতুর কাজ সম্পূর্ণ শেষ হবার পর থেকেই এই রুটে সংজোযন হওয়া শুরু করেছে দেশের বিভিন্ন বিলাশবহুল পরিবহন । আগামী ২৫ই জুন পদ্মা সেতু উদ্ভোধন হবার পর থেকে খুলনা – ঢাকা (কাঁঠালবাড়ি-মাওয়া) রুটে নতুন ১২/১৩ টি বিলাশবহুল বাস চালু হবে।এতে করে খুলনাবাসীর (খুলনা–ঢাকা) যাত্রায় নতুন মাত্রায় যুক্ত হবে।
গ্রীন লাইন পরিবহন খুলনার সেলস ম্যানেজার আরেফিন প্রতিদিন সেবককে বলেন, বর্তমানে ইকোনোমি শ্রেণির ৪ টি গাড়ি এ রুটে চলাচল করে এবং যশোর-ঢাকা রুটে ২ টি গাড়ি চলাচল করে। ভাড়া হিসেবে প্রতি যাত্রীর কাছ থেকে ১০০০/১৫০০ টাকা নেওয়া হয়।
তবে পদ্মা সেতু চালু হলে এই রুটের ভাড়া কমে যাবে।সরকার গাড়ির টোল নির্ধারণ করেছেন ২০০০ থেকে ২২০০ টাকা। সেক্ষেত্রে তাদের বাসের দুইটি শ্রেণিতে সম্ভাব্য ভাড়া ৭৫০/১২০০ টাকা নির্ধারণ করেছেন। তিনি আরও বলেন, সেতু চালু হলে ডাবল ডেকার ও বিজনেস ক্লাসের মতো গাড়ি খুলনায় চলাচল এ গাড়িগুলো আগামী ২৩ জুনের মধ্যে খুলনা নগরীতে প্রবেশ করবে।
বিআইডব্লিউটিএ সূত্রে জানা গেছে, শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ি-মাঝিকান্দি নৌপথে ৮৭টি লঞ্চ, ১০টি ফেরি ও ১২৫টি স্পিডবোট চলাচল করছে। এর মধ্যে জাজিরা-শিমুলিয়া নৌপথে ২০টি লঞ্চ, ৩০টি স্পিডবোট ও ১০টি ফেরি চলাচল করছে। এসব নৌযানে প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী নদী পার হন। ঘাট ও যাত্রীদের ঘিরে গড়ে উঠেছে ব্যবসা-বাণিজ্য কেন্দ্র। ৩০টির বেশি হোটেলসহ বিভিন্ন ধরনের প্রায় দেড় শতাধিক দোকান রয়েছে। দোকান ছাড়াও পান, সিগারেট, ঝালমুড়ি, বাদাম, ছোলা, আচার, শিঙাড়া, চানাচুর নারিকেল চিড়া, শসা ও দইসহ নানা খাবারের ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতা রয়েছেন তিন শতাধিক।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) মাঝিকান্দি ঘাটের সহকারী ব্যবস্থাপক ভোজন সাহা বলেন, ‘সেতু চালু হলে ফেরি চলাচল বন্ধ হবে কিনা এখনও কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে লঞ্চ, ফেরি এবং স্পিডবোট চালু রয়েছে। সেতু চালু হলে ঘাটে তেমন একটা প্রভাব পড়বে না। কারণ বিভিন্ন উপজেলার যাত্রীরা লঞ্চেই যাতায়াত করবেন। তবে যাত্রী কিছুটা কমতে পারে। এক্ষেত্রে তেমন প্রভাব পড়বে না।
৬০ পরিবহণ কোম্পানি প্রায় দেড় হাজার বাস সায়েদাবাদ টার্মিনাল থেকে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন রুটে চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।গাবতলী থেকে ছেড়ে ১৯৮৬ সালে মুন্সীগঞ্জের মাওয়া পয়েন্টে মাওয়া-কাঁঠালবাড়ি রুটে ফেরি চলাচল শুরু হলে নতুন পথের খোঁজ পান ২১ জেলার মানুষ। এ রুটে চলাচলের ক্ষেত্রে দূরত্ব কমে যায় ১০০ কিলোমিটারের বেশি। পদ্মা সেতু চালু হওয়া মানে রাজধানী ঢাকা থেকে দক্ষিণের ২১ জেলার দূরত্ব ১০০ কিলোমিটারের বেশি কমে যাওয়া।ফলে এটিই যে হবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে সড়ক পথে যাতায়াতের প্রধান রুট তা আর অনুধাবনে বাকি নেই পরিবহণ মালিকদের। এজন্য রুট পারমিট গ্রহণসহ নানা প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা।
এমন উদ্বোধনের হিসেব নিকেশ যখন চলছে তখন এই রুট ব্যবহারকারী ২১ জেলার মানুষের জন্য নতুন গণপরিবহন, বিশেষ সার্ভিস নামানোর কথা ভাবছেন পরিবহন সংশ্লিষ্টরা।বিশেষ করে কুয়াকাটা ঘুরতে যাবে বিপুল সংখ্যক পর্যটক। ইতোমধ্যেই সেতু ঘিরে উঁকি দিচ্ছে পর্যটনের বিপুল সম্ভাবনা। ভ্রমণপ্রেমীদের জন্য হোটেল, রেস্টুরেন্ট, রিসোর্ট গড়ে উঠছে পদ্মার দুই পাড়েই।
ইতোমধ্যেই পদ্মা সেতুর নিরাপত্তায় সেতুর দুই প্রান্তে পদ্মা সেতু উত্তর থানা ও পদ্মা সেতু দক্ষিণ থানা নামে দুটি থানা স্থাপন করা হয়েছে
প্রস্তুতিতে পিছিয়ে নেই বিআরটিসিও
বিআরটিসি সুত্রে জানা যায়, পদ্মা সেতু পাড়ি দিয়ে ঢাকা থেকে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় নতুন ২১টি রুট তৈরি করে ৪৫টি বাস চালাতে যাচ্ছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি)।
টোলের হিসাব
মন্ত্রণালয় সুত্রে জানা যায় মাসে টোল আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৩৩ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। যা বছরে প্রায় এক হাজার ছয়শত চার কোটি টাকা টোল আদায় হবে। এ টাকা দিয়ে সেতুর রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়াও নির্মাণ খরচের ঋণ পরিশোধ করবে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ। বাংলাদেশ সরকারকে ৩৫ বছরে সুদসহ ৩৬ হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করবে সেতু কর্তৃপক্ষ।
পি এস/এন আই


