
খুলনায় অনুষ্ঠিত তিন দিনব্যাপী দুর্নীতিবিরোধী ইয়েস ক্যাম্পে দুর্নীতি, অনিয়ম, দারিদ্র্য ও বৈষম্য প্রতিরোধ করে একটি সমৃদ্ধ, সুশাসিত সোনার বাংলাদেশ গড়ে তোলার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন প্রায় তিনশত তরুণ। ‘দুর্নীতি, দারিদ্র্য, অবিচার: তরুণদের ভাবনা’ শ্লোগান নিয়ে খুলনা সিএসএস আভা সেন্টারে অনুষ্ঠিত দুর্নীতিবিরোধী ইয়েস ক্যাম্প আজ (৪ মার্চ ২০২৪, সোমবার) শেষ হয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এর অনুপ্রেরণায় গঠিত খুলনা, বরিশাল ও ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন জেলা পর্যায়ে সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) এর তত্ত¡াবধানে পরিচালিত ১৪টি ইয়ুথ এনগেজমেন্ট অ্যান্ড সাপোর্ট (ইয়েস) গ্রæপের সদস্যগণ এতে অংশগ্রহণ করে। ইয়েস ক্যাম্পে মুখ্য আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন টিআইবি’র সিভিক এনগেজমেন্ট বিভাগের পরিচালক ফারহানা ফেরদৌস।
‘দুর্নীতি, দারিদ্র্য, অবিচার ও দুর্নীতিবিরোধী সামাজিক আন্দোলন: তরুণদের করণীয়’ শীর্ষক আলোচনায় টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, শুধুমাত্র আর্থিক লেনদেনই নয় বরং যেকোনো ক্ষেত্রেই ক্ষমতার অপব্যবহারই দুর্নীতি, এর প্রভাব নেতিবাচক ও সূদুরপ্রসারী যা নিয়ন্ত্রণ করা আমাদের সকলের অবশ্য দায়িত্ব। তিনি বলেন, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি কাঠামোগুলোকে সক্রিয় করতে হবে, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে এবং দৃঢ় সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। জাতির জনকের ১৯৭৫ সালের স্বাধীনতা দিবসের ভাষণের সূত্র ধরে তিনি বলেন, জাতির পিতা দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার জন্য ঘরে ঘরে দূর্গ তৈরি করে সামাজিক আন্দোলনের আহবান জানিয়েছিলেন। আর এ ক্ষেত্রে উনি সবচেয়ে বেশি যোগ্য মনে করেছিলেন এদেশের ছাত্র ও তরুণ সমাজকে। বাংলাদেশের উন্নয়নে তরুণদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহŸান জানিয়ে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দুর্নীতি উন্নয়নের অন্যতম প্রধান বাধা, দুর্নীতি বৈষম্য তৈরি করে, নারী অধিকার হরণ করে, দারিদ্র্য ও অবিচার বাড়ায়। দুর্নীতির ফলস্বরূপ প্রতি বছর দেশ থেকে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হচ্ছে তা রুখতে পারলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমপক্ষে আরো ৩ শতাংশ বেশি হতে পারতো, ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতি সচল রাখার জন্য হয়তো অর্থ ঋণদানকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের উপর নির্ভর করতে হতো না। অর্থ পাচারের কারণে বিশে^ বাংলাদেশ নেতিবাচকভাবে পরিচিতি পাচ্ছে এবং কিছু মানুষকে অবারিত সম্পদ স য়ের সুযোগ করে দিচ্ছে, যার কারণে দেশে দারিদ্র্য ও অবিচার বৃদ্ধি পাচ্ছে। ড. ইফতেখারুজ্জামান টিআইবি খানা জরিপের তথ্য অনুসারে বাংলাদেশে সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে ৭১ শতাংশ মানুষকে ঘুষ প্রদান করতে হয় উল্লেখ করে এ অবস্থা পরিবর্তনের প্রধান অনুঘটকের ভুমিকা পালন করতে তরুণদের আহবান জানান। ক্যাম্পে অংশগ্রহণকারী তরুণদেরকে দুর্নীতিবিরোধী শপথ পাঠ করানোর পর তিনি দেশে দুর্নীতির ভয়াবহতা, দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনে তরুণদের ভূমিকা, করণীয় ও বাস্তবতা বিষয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন।
ক্যাম্পে ‘জেন্ডার সংবেদনশীলতা ও নারীর প্রতি সহিংসতা: তরুণদের করণীয়’ শীর্ষক আলোচনার শুরুতে “আর নয় চুপ থাকা” নাটিকা প্রদর্শন করে নাট্য সংগঠন “বটতলা”। এ সময় বিষয়ভিত্তিক আলোচনায় অংশ নেন বটতলার অভিনেত্রী ও ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক সামিনা লুৎফা নিত্রা, নব আনন্দ’র প্রতিষ্ঠাতা শামীমা শওকত লাভলী ও ফারজানা আফরোজ ফারিহা প্রমুখ। টিআইবি’র সিভিক এনগেজমেন্ট বিভাগের কো-অর্ডিনেটর মো: আতিকুর রহমানের স ালনায় “দুর্জয় তারুণ্য: স্বেচ্ছাসেবা, নৈতিকতা ও নেতৃত্ব” শীর্ষক প্যানেল আলোচনায় বক্তব্য রাখেন ইয়ুথ অপরচুনিটিস এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ওসামা বিন নূর, সাইবার টিনস্ এর ফাউন্ডার প্রেসিডেন্ট সাদাত রহমান এবং টিআইবি’র সিভিক এনগেজমেন্ট বিভাগের পরিচালক ফারহানা ফেরদৌস। আলোচনায় বক্তাগণ তাদের নিজেদের জীবনের সংগ্রাম ও সফলতার গল্প উপস্থাপনের মাধ্যমে তরুণদের স্বেচ্ছাব্রতী জাগরণ, ঐক্য, পারস্পরিক সহযোগিতা, হার-না-মানা মনোবল, ইচ্ছাশক্তি, চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা ও কঠোর পরিশ্রম করা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধে নিজেদের অবস্থান থেকে কাজ করার আহŸান জানান।
তিন দিনব্যাপী ইয়েস ক্যাম্পে সনাক খুলনা, যশোর, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, বরিশাল, ঝালকাঠি, বরগুনা, পিরোজপুর, পটুয়াখালী. ফরিদপুর, মাদারীপুর এবং রাজবাড়ী এর ইয়েস গ্রæপের ইয়েস সদস্যগণ বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন এবং টিআইবি’র চলমান কার্যক্রমের অভিজ্ঞতা, চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা বিষয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরে দুর্নীতিবিরোধী সামাজিক আন্দোলন সফল করতে অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।


