গত ৯ থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত টানা চার দিনের ভারি বর্ষণে খুলনা জেলায় মাছ চাষ ও সবজি আবাদে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। জেলা মৎস্য অধিদপ্তর এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, এই দুর্যোগে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১১ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। আকস্মিক জলাবদ্ধতায় তলিয়ে গেছে শত শত মাছের ঘের ও ফসলি জমি, যা স্থানীয় চাষিদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।
মৎস্য খাতে ১০ কোটি ৭৫ লক্ষ টাকার ক্ষতি খুলনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. বদরুজ্জামান জানিয়েছেন, জেলার ৯টি উপজেলার মধ্যে ৮টি ইউনিয়নে বৃষ্টিজনিত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দিঘলিয়া উপজেলা (৪টি ইউনিয়ন)। জেলায় মোট ১,৪৬২টি পুকুর, দিঘি ও মাছের ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তিনি আরও জানান, এই চার দিনে মৎস্য খাতে প্রায় ১০ কোটি ৭৫ লক্ষ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, যার ৬০ শতাংশই চিংড়ি চাষিদের। ক্ষয়ক্ষতির বড় একটি অংশ হয়েছে ডুমুরিয়া উপজেলায়। সেখানে প্রায় ৬৫০টি ঘের তলিয়ে ৮ কোটি ৬০ লক্ষ টাকার ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে সাদা মাছের ক্ষতি ৪ কোটি ১০ লক্ষ টাকা এবং চিংড়ি চাষিদের ক্ষতি ৪ কোটি ৫০ লক্ষ টাকা। এছাড়া, প্রতিকূল আবহাওয়া ও নদীর পানির উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৬ লক্ষ টাকার।
ডুমুরিয়ার সফল চিংড়ি চাষি মাহতাব হোসেন জানান, হঠাৎ এমন দুর্যোগের পূর্বাভাস ছিল না। বর্তমানে পোনা চাষের মৌসুম চলায় এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে বেশ সময় লাগবে। এছাড়া পুনরায় বৃষ্টিপাত হলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
কৃষিতে ১ কোটি টাকার ক্ষতি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খুলনা অঞ্চলের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা ফয়েজ আহম্মেদ মিনা জানান, বর্তমানে জেলায় আউশ ও রোপা আমন ধানের পাশাপাশি তরমুজ, মরিচ, পান ও ধইঞ্চার চাষ চলছে। চার দিনের অতিবৃষ্টিতে ৯টি উপজেলায় প্রায় ১ কোটি টাকার কৃষিপণ্য নষ্ট হয়েছে।
ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত তথ্য নিচে দেওয়া হলো:
- তরমুজ চাষি: ৬৫ লক্ষ টাকা।
- ধান ও সবজি: ৩১ লক্ষ টাকা।
- মোট ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক: ১,৩৪০ জন।
- মোট ক্ষতিগ্রস্ত জমি: ৩৩ হেক্টর।
পাশাপাশি খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও নড়াইল—এই চার জেলা মিলে মোট ক্ষতির পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকা। এসব এলাকায় আউশ চাষিরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন (প্রায় ১ কোটি ৪০ লক্ষ টাকা), এরপরই রয়েছে সবজি চাষিরা। এই চার জেলায় মোট ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা ৭,৭৩৬ জন এবং আক্রান্ত জমির পরিমাণ ১৮০ হেক্টর। জলাবদ্ধতার কারণে অনেক কৃষক বীজতলা তৈরি করতে পারছেন না, ফলে সবজি চাষ ব্যাহত হচ্ছে।
আবহাওয়া পরিস্থিতি খুলনা আবহাওয়া অফিসের কর্মকর্তা মিজানুর রহমান জানান, এ বছরের ১৪ জুলাই পর্যন্ত জেলায় ৪২৪ মিমি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যেখানে গত বছরের একই সময় পর্যন্ত বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ছিল ৩৬০ মিমি। ৯ থেকে ১২ জুলাইয়ের বৃষ্টিপাত একটি নিম্নচাপের প্রভাবে হয়েছে। তিনি আরও জানান, ১৬-১৭ জুলাই থেকে বৃষ্টির প্রবণতা বাড়তে পারে এবং সাগরে একটি লঘুচাপ সৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ৮-১২ জুলাইয়ের মতো প্রবল বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা কম।
কৃষি ও মৎস্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, যথাযথ আগাম প্রস্তুতি না নিলে সামনে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।


