খুলনায় ভাষা আন্দোলন শুরু হয়েছিল ৪৮ সাল থেকে। ভাষা আন্দোলনের সূচনাপর্বে খুলনায় ছাত্র ফডারেশনের ভূমিকাই ছিল মুখ্য। সে সময় খুলনার ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন ছাত্র ফেডারেশনের সম্পাদক স্বদেশ বসু, সন্তোষ দাশগুপ্ত, এম এ গফুর, আনোয়ার হোসেন, ধনঞ্জয় দাশ প্রমুখ। আনোয়ার হোসেন পরবর্তীকালে রাজশাহী জেলার খাপরা ওয়ার্ডে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন। এ ছাত্রনেতাদের সঙ্গে ভাষা আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলের মুসলিম ছাত্রলীগের জিল্লুর রহমান, মতিয়ার রহমান, তাহমিদ উদ্দীন আহম্মেদ প্রমুখ টগবগে তরুণ।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি নিখিল পাকিস্তান মুসলিম লীগের প্রকাশ্য অধিবেশনে রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে জিন্নার উক্তি পুনর্ব্যক্ত করেন, নিলর্জ্জের মতো বলে ফেলেন ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু’। নাজিমুদ্দিনের ওই উক্তির প্রতিবাদে ভাষা আন্দোলন আরও গতিলাভ করে। খুলনাও তার ঢেউ আঁচড়ে পড়ে।
রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে একুশে ফেব্রুয়ারি ঢাকাসহ সারাদেশে হরতাল আহ্বান করা হয়। এ খবর খুলনায় পৌঁছাতে দেরি হয় না। খুলনার কয়রা উপজেলার হরিনগর (হড্ডে) গ্রামের এম এ গফুর বিএল কলেজের ছাত্র ফেডারেশনের নেতা খুলনা শহরের যশোর রোড ও সারদা বাবু রোডের সংযোগ স্থলে একটা একতলা বাড়িতে থাকেন। ওই বাড়ির অন্য একটা কামরায় এ কে সামসুদ্দিন (সুনু মিয়া) ‘আজাদ লাইব্রেরি’ নামের একটা গ্রন্থাগার পরিচালনা করেন। উৎসাহী অনেকে সেখানে পড়তে আসেন।
ঢাকার আন্দোলনের খবর শুনে ১৮ ফেব্রুয়ারি তারা একত্রে বসলেন, তাদের সঙ্গে যোগ দিলেন বিএল কলেজের ছাত্র তোফাজ্জেল হোসেন। তিনজনে মিলে সিদ্ধান্ত নিলেন একুশ ফেব্রুয়ারি ভাষার দাবিতে হরতাল পালন করবেন। শিশি ভর্তি আলতা কেনা হলো, দাতন জোগাড় করা হলো, কাগজও কেনা হলো। রাতে শ’খানেক পোস্টার লেখা হয়ে গেল। পোস্টারগুলো আঠা দিয়ে স্কুলের দেয়ালে গোপনে লাগিয়ে দেয়া হলো।
পরদিন তিনজন একত্রে স্কুলগুলোতে গেলেন, ছাত্রদের বুঝিয়ে হরতাল পালন করতে বললেন। এ খবর শুনে এগিয়ে এলেন মিজানুর রহিম, নূরুল ইসলাম নান্নু, মালিক আতাহার, জাহিদুল হক প্রমুখ ছাত্রনেতা। এদের নেতৃত্বে খুলনা শহরের সব স্কুলে হরতাল পালিত হলো।
একুশে ফেব্রুয়ারি ঢাকার রাজপথে মিছিলে পুলিশ গুলি চালায়। গুলিতে শহীদ হন বরকত, সালাম, জব্বার ও রফিক, আহত হলেন অনেকে। খবর ছড়িয়ে পড়তেই খুলনা শহরে বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয়। এবার ছাত্র ফেডারেশনের আন্দোলনের সঙ্গে মুসলিম ছাত্রলীগের নেতা আবু মোহাম্মদ ফেরদৌস, এম এ জলিল, নূরুল ইসলাম দাদু প্রমুখ যোগ দেন।
২২ ফেব্রুয়ারি পুরো খুলনা শহরে হরতাল পালিত হলো। চোঙা ফুঁকিয়ে ২৩ তারিখে গান্ধীপার্কে (হাদিস পার্ক) নূরুল আমিন সরকারের গণবিরোধী কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সভার আহ্বান জানানো হলো। রাস্তার মোড়ে মোড়ে কৌটা রেখে আন্দোলনের সমর্থনে চাঁদা তোলা হলো।
বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্যে ২৩ ফেব্রুয়ারি মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে খুলনায় প্রথম সফল জনসভা হলো গান্ধী পার্কে। ওই সভায় বক্তৃতা করলেন আবু মো. ফেরদৌস, এম এ গফুর, মিজানুর রহিম, জাহিদুল হক প্রমুখ। সবার বক্তৃতা ছিল অগ্নিঝরা। ওই প্রতিবাদ সভায় রাষ্ট্রভাষা বাংলা প্রতিষ্ঠার দাবির পাশাপাশি নূরুল আমিন সরকারের পদত্যাগ দাবি করা হয়। ওই রাতেই ঢাকা থেকে নির্দেশ এলো ভাষা সংগ্রাম কমিটি গঠন করতে হবে এবং ২৫ ফেব্রুয়ারি সারাদেশে পূর্ণ দিবস হরতাল পালন করতে হবে। নির্দেশমতো, ১১ সদস্যের ভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হলো। সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হলেন এম এ গফুর, সদস্য আবু মোহাম্মদ ফেরদৌস, এম এ জলিল, নূরুল ইসলাম, এম এ বারী, এ কে সামসুদ্দীন সুনু মিয়া, আলতাফ হোসেন খান, কে এ হাফিজ, জাহিদুল হক, মিজানুর রহিম ও মডেল স্কুলের কেরানি খন্দকার এনামুর রহিম।
সংগ্রাম পরিষদের কেন্দ্রীয় নেতা কাজী নূরুল ইসলাম ঢাকা থেকে দৌলতপুর এসে ঢাকার হত্যাকান্ডের বর্ণনা দিলেন। উপস্থিত সবাই বর্ণনা শুনলেন- শিউরে উঠলেন। খুলনার আন্দোলন নতুন মাত্রা পেল। ২৫ ফেব্রুয়ারি খুলনায় সফল হরতাল পালিত হলো। হরতালের পর ২৮ ফেব্রুয়ারি খুলনার গান্ধী পার্কে জনসভা আহ্বান করা হলো। কে এ হাফিজের সভাপতিত্বে ওই বিশাল সভায় বক্তৃতা করলেন এম এ গফুর, আলতাফ হোসেন খান, এ এফ এম আবদুল জলিল, আবদুল জব্বার, এ এইচ দেলদার আহম্মদ, গোলাম শহীদ প্রমুখ।
ওই সময় খুলনায় ভাষা সংগ্রামের আরেক নেতা সমীর আহম্মেদের সম্পাদনায় ‘সবুজ পত্র’ নামের একটা মাসিক পত্রিকা খুলনা থেকে বের হতো। ওই পত্রিকায় থাকত ভাষার দাবির সমর্থনে নিবন্ধ, থাকত আন্দোলনের সব খবর।
একদিন পুলিশ হানা দিল সুনু মিয়ার লাইব্রেরিতে। সেখান থেকে তারা উদ্ধার করল ভাষার দাবি সংবলিত পোস্টার। ওরা বলল, ওগুলো নাকি রাষ্ট্রবিরোধী পোস্টার। ওগুলো সিজ করে দেশদ্রোহিতার অভিযোগে মামলা করা হলো। গ্রেপ্তার হলেন আবু মোহাম্মদ ফেরদৌস, এম এ বারী, নূরুল ইসলাম ও সুনু মিয়া। পুলিশের সঙ্গে যোগ দিল সবুর সাহেবের ঠ্যাঙ্গাড়ে বাহিনী। তারা ভাষা সংগ্রামী সমীর আহম্মেদকে ধরে নিয়ে মারধর করল। একইভাবে তাদের আক্রমণে মারাত্মক আহত হলেন এম এ গফুর ও আবু মোহাম্মদ ফেরদৌস। এভাবে এগিয়ে চলে খুলনায় ভাষা আন্দোলন।
পিএসএন/এমঅাই


