খুলনা অঞ্চলে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মাছ ও চিংড়ি রপ্তানিতে অভাবনীয় সাফল্য এসেছে। এই সময়ে মোট ৩৪,৮৭৬.৩৭ টন মাছ রপ্তানি করে বাংলাদেশ ৩,১০৯ কোটি টাকা আয় করেছে, যা আগের বছরের (২০২৩-২৪) তুলনায় ৯,৬৭৯.৬৩ টন বেশি। গত অর্থবছরে রপ্তানিকৃত মাছের পরিমাণ ছিল ২৫,১৯৬.৭৪ টন এবং আয় হয়েছিল ২,১৪৬ কোটি টাকা।
চিংড়ি রপ্তানিতে বড় সাফল্য
২০২৪-২৫ অর্থবছরে শুধু চিংড়ি রপ্তানি থেকেই আয় হয়েছে ২,৪৯৯ কোটি টাকা এবং রপ্তানি হয়েছে ১৯,৫১২.৭৯ টন চিংড়ি। অন্যদিকে, অন্যান্য মাছ রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৬১০ কোটি টাকা, রপ্তানি হয়েছে ১৫,৩৬৩.৫৮ টন। আগের বছর চিংড়ি রপ্তানি হয়েছিল ১৫,৪৫০.৯৭ টন এবং আয় হয়েছিল ১,৭৪৪ কোটি টাকা। অন্য মাছ রপ্তানিতে আয় হয়েছিল ৪০২ কোটি টাকা, পরিমাণ ছিল ৯,৭৪৫.৭৮ টন।
প্রজাতি অনুযায়ী রপ্তানির পরিসংখ্যান
চলতি অর্থবছরে:
- গলদা চিংড়ি রপ্তানি হয়েছে ৪,২৮২.১৪ টন, আয় ৭৩৪.৫০ কোটি টাকা
- বাগদা (টাইগার) চিংড়ি রপ্তানি হয়েছে ১৩,৯৬৩.১১ টন, আয় ১,৬৯১.৬৯ কোটি টাকা
- কাঁকড়া রপ্তানি হয়েছে ১,১৬৬.৮৯ টন, আয় ১৭৩.২৭ কোটি টাকা
অন্যদিকে, গত অর্থবছরে:
- গলদা চিংড়ি: ২,৮৮৩.৩০ টন, ৪২০.৪৩ কোটি টাকা
- বাগদা চিংড়ি: ১১,৩৩৬.৫৪ টন, ১,৩১১.২১ কোটি টাকা
- কাঁকড়া: ৬৪৪.৭৭ টন, ৯৭.৮৭ কোটি টাকা
চ্যালেঞ্জ ও প্রতিবন্ধকতা
FIQC (Fish Inspection and Quality Control) খুলনা অফিস জানায়, উৎপাদনে স্থবিরতা এসেছে বিভিন্ন কারণে। এর মধ্যে রয়েছে:
- খাড়ি বা লবণাক্ত পানির উৎস হ্রাস
- ভাইরাস আক্রমণ
- আধুনিক পদ্ধতি গ্রহণে কৃষকের অনীহা
- রোগমুক্ত চিংড়ির পোনা সহজলভ্য না হওয়া
- জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব
রপ্তানি হ্রাস পেয়ে প্রায় ৩,০০০ টন কমেছে, এতে দেশ প্রায় ৩০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
সরকারি পদক্ষেপ ও আশা
সরকার মাছ উৎপাদন বাড়াতে বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
- ক্লাস্টার পদ্ধতিতে চাষ
- ভেনামি চিংড়ি উৎপাদন
- গুণগতমানসম্পন্ন খাদ্য ও পোনা সরবরাহ
- পরিবেশবান্ধব মাছ চাষ
- ব্যাপক প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনা
প্রান্তিক চাষিদের অভিমত
কয়রা উপজেলার চাষি হারুন-উর-রশিদ বলেন, “এবার পর্যাপ্ত বৃষ্টির কারণে পানির অভাব হয়নি। ভাইরাসও নিয়ন্ত্রণে এসেছে। FIQC-এর পদক্ষেপে চাষে আগ্রহ বেড়েছে।”
ডুমুরিয়া উপজেলার শেখ মাহতাব উদ্দিন বলেন, “প্রশিক্ষণ, প্রণোদনা, মানসম্পন্ন পোনা ও খাবারের জন্য এবার ভালো উৎপাদন হয়েছে।”
তিনি আরও জানান, আগে প্রভাবশালী একটি রাজনৈতিক মহল চিংড়ি ঘের দখল করে লবণাক্ত পানি ঢুকিয়ে বাস্তব চাষিদের বাধা দিত। এখন রাজনৈতিক পরিবেশ বদলেছে, সরকার সহায়তা দিচ্ছে, ফলে চাষিরা উৎসাহ পাচ্ছেন।
প্রশাসনিক মতামত ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
FIQC এর পরিদর্শক লিপ্টন সরদার বলেন, “এই খাত দেশের অর্থনীতিতে বিশাল ভূমিকা রাখতে পারে, তবে গত কয়েক বছর ধরে এটি গতি হারাচ্ছিল। এখন ক্লাস্টার পদ্ধতি ও সরকারি পদক্ষেপে চিত্র পরিবর্তিত হয়েছে।”
অরিয়েন্টাল ফিশ প্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড-এর মালিক শেখ আব্দুল বাকী বলেন, “মানসম্পন্ন পোনা, খাবার, প্রাকৃতিক জলাধার এবং সরকারের উদ্যোগই এই উন্নতির কারণ।”
মৎস্য বিভাগের খুলনা বিভাগের উপপরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “সাদা মাছ, গলদা, বাগদা, কাঁকড়া—সবই এবার রপ্তানিতে বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেক দেশ এখন আমাদের মাছ ও মৎস্যপণ্যের প্রতি আগ্রহী, কারণ এর মান আগের তুলনায় অনেক উন্নত হয়েছে।”


