চা শ্রমিক। মলিন বসনে সকাল-দুপুর-বিকাল গড়ায় যাদের। যারা আজও চরিত্র হচ্ছেন বঞ্চনার গল্পে। দেশ স্বাধীনের ৫০ বছরেও মেলেনি ভিটেমাটির অধিকার। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ সব ক্ষেত্রেই বঞ্চিত। ১২০ টাকা মজুরিতে মাছ-মাংস তো দূরের কথা, পান্তা ভাত জোগাড়ও দুঃসাধ্য তাদের কাছে। যুগ যুগ ধরে বঞ্চনার শিকার চা শ্রমিকরা দুর্মূল্যের এই বাজারে দাবি করছেন ৩০০ টাকা মজুরি। ৮ আগস্ট থেকে চলছে আন্দোলন।
নানা সমস্যায় জর্জরিত এসব চা শ্রমিকের কথায়ই ফুটে ওঠে বঞ্চনার চিত্র।
মালনীছড়া বাগানের শ্রমিক রতন বাউরি আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমরা চা পাতা তুলি। কিন্তু পান করতে পারি না। প্রতি কাপ এখন ১০ টাকা। যে মজুরি পাই, চা পান আমাদের জন্য বিলাসিতা।’ সর্বশেষ কবে ঘরে মাংস রান্না হয়েছিল তা মনে করতে পারলেন না একই বাগানের শ্রমিক শিউলি কন্দ।
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তিনি বলেন, ‘বয়লার মুরগির কেজি ২০০ টাকা। মজুরি পাই ১২০ টাকা। মাংস খাওয়ার স্বপ্ন দেখি না। যে আয় তা দিয়ে ডাল-ভাতের ব্যবস্থাও হয় না। পান্তা খেয়েই জীবন চালাতে হয়।’
চা শ্রমিক অধিকার আন্দোলনের আহ্বায়ক হৃতেশ মোদী বলেন, বঙ্গবন্ধু চা শ্রমিকদের ভোটাধিকার দিয়েছিলেন। কিন্তু এখনো তারা ভিটার অধিকার পাননি। বংশপরম্পরায় শ্রমিকরা বাগানের জায়গায় থাকলেও ভূমির মালিকানা পান না। স্থায়ী ঠিকানা না থাকায় চা শ্রমিকদের সন্তানরা অনেক সময় সরকারি চাকরি পান না। পুলিশ ভেরিফিকেশন নেগেটিভ যায়। বাগান থেকে বাসস্থান হিসেবে ২০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১২ ফুট প্রস্থের দুই রুমের যে ঘর দেওয়া হয়, তাও যুৎসই নয়। একেক ঘরে পরিবারের ৮-১০ সদস্য নিয়েও থাকতে হয়। কোনো ঘর আবার দুই পরিবারকেও ভাগ করে দেওয়া হয়। হৃতেশ মোদী আরও বলেন, বেশির ভাগ বাগানে স্বাস্থ্যকেন্দ্র নেই, চিকিৎসক নেই। সিলেটের কোনো চা বাগানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই। প্রাথমিকেই ধাক্কা খাওয়ায় চা শ্রমিকদের সন্তানরা শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত। যে কারণে বড় হয়ে পিতা-মাতার পথ অনুসরণ করে চা বাগানেই শ্রম বিক্রি করতে হয় তাদের।’
শ্রমিকরা জানান, একজন শ্রমিক প্রতিদিন আধা কেজি হিসাবে সপ্তাহে সাড়ে ৩ কেজি চাল কিংবা আটা রেশন পেয়ে থাকেন। কারও দুজন অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তান থাকলে সপ্তাহে বাড়তি আরও ৩ কেজি রেশন পান। রেশনের চাল ও আটার মানও সবসময় ভালো থাকে না। একজন শ্রমিক দৈনিক ২৩ কেজির বেশি পাতা উত্তোলন করলে বাড়তি প্রতি কেজির জন্য বাগানভেদে আড়াই থেকে ৬ টাকা পর্যন্ত মজুরি পেয়ে থাকেন। অনেক সময় বাড়তি ১০ কেজি পাতা উত্তোলনও সম্ভব হয় না। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি চার মাস ‘ড্রাই সিজনে’ পাতা তোলা উত্তোলন বন্ধ থাকায় শ্রমিকদের বাড়তি আয়ই থাকে না। চরম কষ্টে দিনাতিপাত করতে হয়।
শ্রমিকদের এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে বাগান মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ চা-সংসদ সিলেট ভ্যালির চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ শিবলী গণমাধ্যমকে জানান, চা শ্রমিকরা দৈনিক মজুরি কেবল ১২০ টাকা পান তা সঠিক নয়। সুযোগ-সুবিধা মিলিয়ে শ্রমিকপ্রতি বাগান মালিকদের ৪৫০ টাকা ব্যয় হয়। দিন দিন শ্রমিক বাড়ছে, সেই অনুপাতে উৎপাদন বাড়ছে না। অনেক বাগান লোকসানে আছে। এদিকে ইন্টারনেট ঘেঁটে দেখা গেছে চা শ্রমিকদের মজুরি বাংলাদেশেই সবচেয়ে কম ১২০ টাকা। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ শ্রীলঙ্কায় চা শ্রমিকরা ২৬৪, নেপালে ৩২৪, ভিয়েতনাম ৩০৫, ভারতের কেরালায় ৫০৩ ও পশ্চিবঙ্গে ২৭৬ টাকা পাচ্ছেন।
পিএসএন/এমআই


