মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ থেকে কর্মী পাঠানোর শেষ দিন ছিল শুক্রবার। এদিন রাত ১১ টায় সর্বশেষ ফ্লাইট ছেড়ে যায়। সব মিলে ১২টি ফ্লাইটে প্রায় দুই হাজার কর্মী কলিং ভিসায় মালয়েশিয়া গেছেন। তবে মধ্যরাত পর্যন্ত হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরের বাইরে অপেক্ষা করছেন শত শত মানুষ। যাদের মালয়েশিয়া যাওয়ার কথা ছিল।
মধ্যরাতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুক্রবার দুপুরের পর থেকে ভিড় বাড়তে থাকে কলিং ভিসায় মালয়েশিয়া যাওয়ার প্রত্যাশীদের। তারা কেউ দালাল ধরে কেউ এজেন্সি ধরে মালয়েশিয়া যাচ্ছেন বলে বিকেল থেকে জানাচ্ছিলেন বিভিন্ন গণমাধ্যমকে। তবে রাত যত গভীর হতে থাকে ততোই তাদের শঙ্কা বাড়তে থাকে। সবশেষ রাত ১১টায় একটি ফ্লাইট রওনা হয়। সেটিই ছিল বাংলাদেশ থেকে কলিং ভিসায় মালয়েশিয়া যাওয়ার শেষ ফ্লাইট।
রাত ২ টার সময়ও শত শত কর্মী যাওয়ার অপেক্ষা করছিলেন। তাদের মতে, যদি আরেকটি ফ্লাইট দেয়। তাহলে তারা যেতে পারবেন। এসব ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা অধিকাংশই দালাল ধরে এজেন্সির কাছে এসেছিলেন। এজেন্সির লোকজন তাদের শুক্রবার বিকেল থেকে আশা দিয়ে রেখেছে ফ্লাইট হবে। কিন্তু রাত ১২টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে তাদের কপালে চিন্তায় ভাঁজ পড়েছে। তারা জানেও আর যেতে পারবেন না, তবুও অপেক্ষায় আছেন যদি আর একটি ফ্লাইট যায়।
তবে এসব অপেক্ষমান ব্যক্তিদের বেশির ভাগই টিকেট পাননি। তাদের শুধু ভিসা ধরিয়ে দিয়েছে দালাল ও এজেন্সির মালিকরা। সব শেষ রাত দেড়টার দিকেও তাদের মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে বসিয়ে রাখা হয়েছে। তাদের কাউকে বলা হয়েছে, মালেয়শিয়া থেকে টিকেট করে তাদের বাংলাদশ থেকে পাঠানো হবে। আবার কাউকে বলা হয়েছে, তারা ফ্লাইটের ব্যবস্থা করছেন। এসব বলে দালালা ও এজেন্সির মালিকরা হাওয়া হয়ে গেছেন।
ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, তারা কেউ জমি বিক্রি করে, কেউ গরু, কেউ জমি বন্ধক রেখে আবার কেউ চড়া সুদে টাকা নিয়ে দালাল ও এজেন্সিকে দিয়েছেন। যদিও মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য সরকার ৭৮ হাজার টাকা নির্ধারণ করেছে। কিন্তু এজেন্সি ও দালালরা তাদের কাছে আদায় করেছে সাড়ে ৪ লাখ থেকে সাড়ে ৫ লাখ টাকা।
নওগাঁ থেকে আসা আ্ব্দুল (ছদ্মনাম) তিনি দালালকে সাড়ে ৫ লাখ টাকার দেয়ার পরও আজ আরও ৩০ হাজার টাকা দিয়েছেন। যখন কথা বলছিলেন তার চোখ বেয়ে পানি ঝড়ছিল। বলছিলেন, তিনি যে বিমানবন্দর থেকে গ্রামের বাড়িতে যাবেন সেই টাকাও নেই। পকেটে মাত্র এক থেকে দেড়শ টাকা রয়েছে। অবস্থা এতটাই করুন যে, বাড়ি যাওয়ার জন্য মনে হয় তাকে পরার জুতাটা বিক্রি করে খেতে হবে। তারা একসঙ্গে ১৬ জন এসেছেন। সকলে অপেক্ষা করছেন ফ্লাইটের জন্য। তিনি জানেন না বাড়ি যাবেন নাকি কোন দিকে যাবেন।
তিনি জানান, তার এখন বাড়ি ছাড়া কিছুই নেই। সব বিক্রি করে তিনি এই সাড়ে ৫ লাখ টাকা দিয়েছিলেন।
এখানেই শেষ নয়, দালাল ও এজেন্সিগুলো তাদেরকে জাল ভিসা ধরিয়ে দিয়ে বসিয়ে রেখেছে। তারা বিকেল থেকে বিষয়টি বুঝতে না পারলেও রাত যত গভীর হচ্ছে ততোই অনুধাবন করতে পারছেন।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, তাদের ভিসা, পাসপোর্ট দিয়েছে দালালরা। কিন্তু টিকেট দিতে পারেনি। বিকেলে বলা হয়েছে আপনারা বিমানবন্দরে যান, আজকেই ফ্লাইট দেবেন তারা। তবে গত ৫ দিন থেকে এই মানুষগুলো ঢাকায় অবস্থান করছেন শুধুমাত্র মালয়েশিয়া যাবেন বলে।
তারা বলছেন, আমরা আমাদের টাকাগুলো ফেরত চাই। এজন্য এ কাজে একমাত্র সহযোগিতা করতে পারে বাংলাদেশ সরকার। এছাড়া কেউ দেখবে না।
বিষয়টি নিশ্চিত করেন হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের কর্মকর্তা হেলাল। তিনি বলেন, মোট ১২টি ফ্লাইটে আজ সারাদিন ধরে প্রায় দুই হাজার কর্মী কলিং ভিসায় মালয়েশিয়ায় গেছেন। আজ ছিল শেষ দিন। তবে দেশটিতে রাত ১২টার মধ্যে ঢুকতে হবে বলে ঘোষণা দেয়ায় রাত ১১টায় ছিল শেষ ফ্লাইট। এছাড়াও আরও তিনটি ফ্লাইট মালয়েশিয়া যাবে কিন্তু সেগুলোতে যারা ছুটিতে আসছেন তারা। তারা কোন কলিং ভিসার যাত্রী নন।
প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক সূত্র জানায়, প্রথম দিকে ১০টি ফ্লাইট যাওয়ার কথা ছিল। পরে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) একটি বিশেষ ফ্লাইটের অনুমোদন দেয়। পরে সেটি রাত ১১ টায় রওনা হয়।


