ব্যাংক খাতে অতিরিক্ত তারল্য তৈরি হওয়ায় গ্রাহক পর্যায়ে ঋণের সুদহার ধীরে ধীরে কমছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখলেও বাজারে টাকার জোগান বৃদ্ধি, বিনিয়োগের মন্থর গতি এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা রাখা অর্থের ওপর সুদ কমিয়ে দেওয়ার প্রভাব পড়েছে ঋণ বাজারে। গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে সুদহার নিম্নমুখী প্রবণতায় রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে নতুন বিনিয়োগে গতি আসেনি। এর প্রভাব পড়েছে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধিতে। গত ডিসেম্বরে এ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৬ দশমিক ১০ শতাংশে, যা এযাবৎকালের মধ্যে সর্বনিম্ন।
চলতি অর্থবছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে মোট ৪৯০ কোটি ডলার কিনেছে। এর বিপরীতে বাজারে ছাড়া হয়েছে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা। এতে ব্যাংকিং খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। অনেক ব্যাংক এ উদ্বৃত্ত অর্থ কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা রাখছিল। তবে ব্যাংকগুলোকে এ প্রবণতা থেকে সরাতে বাংলাদেশ ব্যাংক স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটির (এসডিএফ) সুদহার দুই দফায় মোট ১০০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়েছে। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে টাকা রেখে আয় করার প্রবণতা কিছুটা কমেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বরে ব্যাংক খাতের ঋণের গড় সুদহার কমে দাঁড়িয়েছে ১২ দশমিক ০৩ শতাংশে। এর আগের দুই মাসে তা ছিল ১২ দশমিক ১৫ শতাংশ এবং সেপ্টেম্বর মাসে ছিল ১২ দশমিক ১৮ শতাংশ। অর্থাৎ সেপ্টেম্বর থেকে ধারাবাহিকভাবে সুদহার কমছে। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে বেশ কয়েকটি ব্যাংক নতুন করে সুদহার কমিয়েছে। তুলনামূলক ভালো আর্থিক অবস্থানে থাকা কিছু ব্যাংক বর্তমানে ১০ থেকে ১১ শতাংশ সুদে ঋণ দিচ্ছে।
একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ব্যাংকগুলোর হাতে তারল্য বেড়েছে, কিন্তু বিনিয়োগের চাহিদা সে অনুপাতে বাড়েনি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা রাখা অর্থের সুদও কমেছে। ফলে ভালো গ্রাহক পেলে কম সুদে ঋণ দেওয়ার দিকেই ঝুঁকছে ব্যাংকগুলো।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে প্রধান নীতি সুদহার (রেপো রেট) ১০ শতাংশে স্থির রেখেছে। বিভিন্ন মহল থেকে সুদ কমানোর দাবি উঠলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখনো সে পথে হাঁটেনি।
গভর্নর জানিয়েছেন, মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের নিচে না নামা পর্যন্ত নীতি সুদ কমানো হবে না। বর্তমানে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরায় বিনিয়োগে আস্থা বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দীর্ঘদিন ধরে স্থিতিশীল সরকারের প্রত্যাশায় থাকা উদ্যোক্তারা ধীরে ধীরে নতুন প্রকল্পে এগোতে পারেন। সে ক্ষেত্রে নীতি সুদ কমানোর দাবি জোরালো হতে পারে।
বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে মূল্যস্ফীতি কমানোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে বিদায়ী সরকার আগামী জুন নাগাদ মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে নামানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল। দীর্ঘদিন দুই অঙ্কে থাকা মূল্যস্ফীতি গত অক্টোবরে ৮ দশমিক ১৭ শতাংশে নেমে এলেও পরে টানা তিন মাস বেড়ে জানুয়ারিতে ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশে পৌঁছেছে। ফলে মূল্যস্ফীতির গতি না কমা পর্যন্ত নীতি সুদহারে পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা কম। রেপো রেটের পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর জন্য বিশেষ ধার সুবিধায় ব্যবহৃত স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটির (এসএলএফ) ঊর্ধ্বসীমা সাড়ে ১১ শতাংশেও আপাতত পরিবর্তন আসছে না।
২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত ব্যাংক ঋণের সুদহার সর্বোচ্চ ৯ শতাংশে সীমাবদ্ধ ছিল। পরে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ শর্তের অংশ হিসেবে ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ‘স্মার্ট’ পদ্ধতিতে সুদহার নির্ধারণ শুরু হয়। এ ব্যবস্থায় ১৮০ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের ছয় মাসের গড় সুদের সঙ্গে ৩ শতাংশ যোগ করে সর্বোচ্চ সুদহার নির্ধারণ করা হতো। একই বছরের নভেম্বরে সুদের ব্যবধানের ৪ শতাংশ সীমাও তুলে নেওয়া হয়। অবশেষে ২০২৪ সালের ৮ মে স্মার্ট পদ্ধতি বাতিল করে সুদহার পুরোপুরি বাজারভিত্তিক করা হয়।
সার্বিকভাবে ব্যাংকিং খাতে তারল্য বাড়লেও বিনিয়োগে কাঙ্ক্ষিত গতি না আসায় সুদহার কিছুটা নমনীয় হয়েছে। তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও নীতি সুদের অবস্থান ভবিষ্যতে ঋণবাজারের গতিপথ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


