বিপিএল, আইপিএল, সিপিএল, লা লিগা, ইউরো কাপসহ যেকোনো ক্রিকেট ও ফুটবল টুর্নামেন্টের ম্যাচ ঘিরে দেশের ভেতর থেকে অনলাইন জুয়া (বেটিং) চলছে। বেটিং সাইটগুলোতে অ্যাকাউন্ট করলেই জুয়া খেলার পাশাপাশি কারাবারের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এ জন্য নিজস্ব যোগাযোগের অ্যাপও আছে। সেই অ্যাপে যুক্ত হয়ে বাংলাদেশিরা হয়ে যাচ্ছে এজেন্ট।
জুয়ার কারবার বাড়াতে পারলে তাদের ভার্চুয়াল মুদ্রায় (ক্রিপ্টোকারেন্সি) কমিশন দেওয়া হচ্ছে। আর সেই ভার্চুয়াল মুদ্রা প্রচলিত মুদ্রায় রূপান্তর করে হুন্ডি বা অবৈধ পথে পাচার করা হচ্ছে। এভাবে রাশিয়াসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অর্থপাচারের তথ্য পেয়েছেন পুলিশের গোয়েন্দারা।
গত কয়েক মাসে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সাইবার শাখা সাতটি সাইটে সক্রিয় জুয়ার কারবারি এক ডজন এজেন্টকে গ্রেপ্তার করেছে। সর্বশেষ ২ মার্চ রাতে ঢাকার কেরানীগঞ্জ থেকে এজেন্ট তোফায়েল ইসলাম রাসেল ও শাকিল খানসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে সিআইডি। চক্রটি বেট৩৬৫ ও নাইন উইকেটস নামের দুটি সাইটে সক্রিয় ছিল।
সিআইডি কর্মকর্তারা জানান, চক্রটি সাইটের অ্যাপের পাশাপাশি হোয়াটসঅ্যাপে গ্রুপে যোগাযোগ করে সদস্য সংগ্রহ করে। ভুয়া নামে ফেসবুক আইডিও করে। তারা নেটেলার ও স্ক্রিল নামের দুটি ক্রিপ্টোকারেন্সিতে জুয়ার কারবার করে। জুয়ার সাইটগুলোর প্রক্সি বা নকল ডোমেইন সার্ভার ব্রিটেন, ভারত ও মালেশিয়া থেকে পরিচালিত।
এর আগে মোস্টবেট-বিডি.কম ও ওয়ানএক্সবেটবিডি.কম নামের বেটিং সাইটের (রাশিয়া থেকে পরিচালিত) সঙ্গে জড়িত এজেন্টসহ ১২ জনকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি। রাশিয়ায় বসে এই কারবার নিয়ন্ত্রণ করছেন আল আমিন, আশিকুর রহমান ও নাঈম ওরফে হাল্ক নামের তিন বাংলাদেশি যুবক। ‘রেডি’ নামে একটি বিশেষ অ্যাপে এজেন্টদের যোগাযোগ এবং ‘ম্যানেজমেন্টডটআইও’ নামের অ্যাপে চলছে কারবারের হিসাব। একটি মোবাইল ব্যাংকিং কম্পানির তিন বিক্রয় কর্মকর্তার মাধ্যমে মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গায় অর্ধশত এজেন্টের সিম কার্ড নিয়েছে চক্রটি। বিটকয়েন, লিটকয়েন, রিপলসহ বিভিন্ন ক্রিপ্টোকারেন্সি ছাড়াও বিকাশ ও নগদে জুয়া খেলা হচ্ছে এসব সাইটে।
গত ২২ ফেব্রুয়ারি বেটবাজ৩৬৫.লাইভ ও মাজাপবু.কম নামের দুটি সাইটের জুয়া কারবারের মাস্টার এজেন্ট তরিকুল ইসলাম ওরফে বাবু ও রানা হামিদকে এক সহযোগীসহ গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ। তদন্তকারীরা বলছেন, পিবিইউ নামের ভার্চুয়াল কারেন্সি ব্যবহার করে তারা বছরে ৩০ কোটি টাকা পাচার করেছেন। সাথী আক্তার নামের এক তরুণী তাদের নিজস্ব যোগাযোগে সদস্য সংগ্রহ করেন। এ জন্য সাইটের গ্রুপ ছাড়াও অ্যাপ ব্যবহার করছেন তারা। একই রকম কারবারের তথ্য পেয়ে বেট৩৬৫বিডি.কম নামের আরেকটি সাইটে নজরদারি করছেন গোয়েন্দারা।
সিআইডির এক কর্মকর্তা জানান, প্রক্সি সার্ভার থেকে বা কাছাকাছি নাম দিয়ে অনেকগুলো জুয়ার সাইট চালু আছে। যেমন—বেট৩৬৫ নামের সঙ্গে কিছু যুক্ত করে ডোমেইন নিয়ে সাইট তৈরি করা হয়েছে। এই সাইটগুলোতে ক্লিক করলে আসল জুয়ার সাইটে নিয়ে যায়। বিটিআরসি অনেকগুলো সাইট বন্ধ করেছে। তবে বড় সাইটগুলোর জুয়া বন্ধ করা যায়নি। তিনি আরো বলেন, গোপন অ্যাপে যোগাযোগ করায় সাইবার প্যাট্রলিং করেও জুয়া খেলার তথ্য কম পাওয়া যায়। এ ক্ষেত্রেও বিটিআরসি ও গোয়েন্দাদের সমন্বিত নজরদারি দরকার।
সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি ইমাম হোসেন বলেন, বেটিংয়ের পর ডিজিটাল কারেন্সিকে তারা মোবাইল ব্যাংকে টাকায় কনভার্ট করে। পরে বিভিন্ন মাধ্যমে সে টাকা হাতবদল হয়ে পাচার হয়। গ্রেপ্তারকৃত তোফায়েল ইসলাম রাসেল জিজ্ঞাসাবাদে জানান, তিনি অনার্সের ছাত্র। তার ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা থাকায় অনলাইন গেমিংয়ের নামে ভার্চুয়াল মুদ্রা সংগ্রহ করে বেটিং ব্যবসা শুরু করেন। এ জন্য তারা নিজস্ব গ্রুপে যোগাযোগ করে থাকেন। তারা ডলার ‘বাই অ্যান্ড সেলিং’ বিভিন্ন গ্রুপের এজেন্ট হিসেবে কাজ করেন।
ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার এ কে এম হাফিজ আক্তার বলেন, ‘বেটবাজ৩৬৫.লাইভ ও মাজাপবু.কম নামের ওয়েবসাইটের অ্যাডমিন রয়েছে রাশিয়া, মালয়েশিয়া ও ভারতে। এগুলো বন্ধ করা হয়তো সম্ভব হবে না। তবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। বন্ধ করতে গেলে তারা অন্য সাইটে চলে যাবে। আমরা বিটিআরসির মাধ্যমে একসঙ্গে কাজ করব। মনিটরিং আরো বাড়াতে হবে। ’
সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের অতিরিক্ত ডিআইজি কামরুল আহসান বলেন, ‘আমরা দুটি বেটিং সাইট পেয়েছি, যেগুলো রাশিয়া থেকে পরিচালিত হলেও দেশে এজেন্ট নিয়োগ করেছে। তারা সাইটের বাইরে নিজস্ব অ্যাপে যোগাযোগ নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে। সেখানে জুয়া খেলা ও অর্থপাচারে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। যারা খেলে বা কারবার করে তাদের গ্রেপ্তার করে দেখা গেছে, অনেকে না বুঝেই যুক্ত হয়ে যাচ্ছে। ’
পিএসএন/এমঅাই


