নিত্যপণ্যের দাম দিন দিন যে হারে বাড়ছে তাতে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের সংসার চালানোই দায় হয়ে উঠেছে। কথাগুলো বলছিলেন সরকারি চাকরিজীবী ফয়সাল চৌধুরী।
শুক্রবার (১১ মার্চ) সকালে নগরের মদিনা মার্কেটে সাপ্তাহের বাজার করতে এসে তিনি জানান, ভোজ্য তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিত্যপণ্যের বাজারেও আগুন লেগেছে। সাপ্তাহের ব্যবধানে প্রতিটি পণ্যের দাম ১০ টাকা থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
সুবিদবাজার এলাকার বাসিন্দা স্কুল শিক্ষিকা সানজিদা শারমিন বলেন, মাস খানিক ধরে ভোগ্যপণ্যের বাজার অস্থিতিশীল। শুধু ভোগ্যপণ্য নয়- তেল, গ্যাস সব কিছুর দামই উর্ধ্বমুখি। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত নিম্নমধ্যবিত্ত, এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জীবন চালানোই এখন দায় হয়ে উঠছে।
তিনি আরও বলেন, অতিমারি করোনার প্রভাবে গত দুই বছর ধরে মানুষের আয়-রোজগার কমেছে। এর মধ্যে নিত্যপণ্যের বাড়তি দাম যেন ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে হু হু করে চাল-ডাল-তেল-সবজির দাম বাড়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছে মানুষজন।
সকালে সিলেট নগরের লালবাজার, আম্বরখানা, রিকাবীবাজার, সুবিদবাজার, মদিনা মার্কেটসহ বিভিন্ন পাইকারি ও খুচরা বাজার ঘুরে দেখা যায়, তেল-ডাল-পেঁয়াজ, রসুন, মাছ-সবজিসহ বেশির ভাগ ভোগপণ্যের দাম আগের তুলনায় ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
শুক্রবার বাজারে প্রতি কেজি টমেটোর দাম ছিল ৬০-৭০ টাকা, শিম ৫০-৬০ টাকা, বেগুন (গোল) ৮০ টাকা, ফুলকপি ও বাঁধাকপি প্রতিটি সর্বোচ্চ ৬০ টাকা, গাজর প্রতি কেজি ৬০ টাকা, চালকুমড়া একটি ৬০ টাকা লাউ আকার ভেদে ৭০-১০০ টাকা, মিষ্টি কুমড়ার কেজি ৫০ টাকা, কচুর লতি ৬০ টাকা ও পেঁপের কেজি ৪০ টাকা বিক্রি হচ্ছে।
বাজারে বেড়েছে পেঁয়াজ, মসুর ডাল ও ডিমের দাম। গত দুইদিন আগে খুচরা বাজারে দেশি পিয়াজ কেজিতে আকারভেদে ৫০-৬০ টাকায় পাওয়া গেছে। এখন একই মানের পেঁয়াজ বিক্রেতাদের ৬০-৬৫ টাকা দামে বিক্রি হচ্ছে।
ব্রয়লার মুরগির কেজি ১৬০-১৭০ এবং সোনালি মুরগি ২৬০-২৯০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। লাল ডিমের ডজন ১১৫-১২০ টাকা, হাঁসের ১৯৫ টাকা, দেশী মুরগির ডিমের ডজন বিক্রি হচ্ছে ২১০ টাকায়। সোনালি মুরগির ডিমের ডজন বিক্রি হচ্ছে ১৮০ টাকায়। গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে ৬২০ থেকে ৬৫০ টাকায়। খাসির মাংস বিক্রি হচ্ছে ৮৫০ থেকে ৯০০ টাকায়। সব ধরণের মাংসের দাম গত সপ্তাহের চেয়ে কেজিতে ২০ থেকে ৫০ টাকা বেড়েছে।
একইভাবে সব ধরনের মাছের দামও কেজিতে ১০ থেকে ১৫ টাকা বেড়েছে। শুক্রবার বাজারে প্রতিকেজি রুই মাছ বিক্রি হচ্ছে ৩২০ থেকে ৩৬০ টাকায়, কাতল মাছ ৩৭০ টাকায়, শোল মাছ ৪৫০ টাকা। তেলাপিয়া আকারভেদে ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা। গলদা চিংড়ি বিক্রি হচ্ছে ৭০০ থেকে ৭৫০ টাকা কেজি। এছাড়া আকারভেদে ইলিশ মাছ বিক্রি হচ্ছে ৮০০ থেকে ১২০০ টাকা কেজি।
এ ব্যাপারে বিক্রেতারা বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় প্রভাব ফেলছে দ্রব্যমূল্যে।
এদিকে বাজারে সয়াবিন কোম্পানী ভেদে লিটার প্রতি ১৬৮-১৭০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। করোনাকালে লিটার ছিল ৯০-৯৫ টাকা। এরপর লিটার প্রতি ৫-১০ টাকা করে বাড়তে শুরু করে। সর্বশেষ ১৬৮ টাকায় এসে দাঁড়িয়েছে। আর ৫ লিটার বোতলের দাম বেড়ে ৮১০-৮৩০ টাকায় এসে দাঁড়িয়েছে। আর পলিপ্যাক সয়াবিন খুচরা বাজারে লিটার বিক্রি হচ্ছে ১৫৬-১৫৮ টাকায়, পামওয়েল সুপার বিক্রি হচ্ছে ১৫৮ থেকে ১৬০ টাকায়। তবে বাজারে অপরিবর্তিত রয়েছে চালের দাম।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক বিক্রেতা বলেন, ভোজ্য তেলের বাজার হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় অধিক মুনাফা লোভী কিছু অসাধু ব্যবসায়ীরা সিলেটের বাজারেও তেলের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করছেন।
লালবাজারে মাছ কিনতে আসা আব্দুল মতিন বলেন, সাপ্তাহের ব্যবধানে সব ধরনের মাছের দাম কেজিতে ১০ থেকে ১৫ টাকা বেড়েছে। রুই মাছ কিনতে বাজারে আসছিলাম। বিক্রেতারা যে দাম হাঁকাচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে মাছ না কিনেই বাড়ি ফিরতে হবে।
আম্বরখানা বাজারে সাপ্তাহের বাজার করতে আসা ইউসুফ আলী বলেন, তেল, পেঁয়াজ, ডাল ও ডিম কিনতে বাজারে এসেছি। বাজারে দাম শুনে রিতীমত অবাক হতে হচ্ছে। এভাবে দাম বাড়তে থাকলে আমাদের মতো মধ্যবিত্তদের না খেয়ে থাকতে হবে।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর সিলেট বিভাগীয় উপপরিচালক মো. ফখরুল ইসলাম বলেন, কয়েকদিন ধরে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ে বাজার কিছুটা অস্থিতিশীল রয়েছে। তবে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে কৃত্রিম সংকট তৈরি করলে তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, এভাবে দাম বাড়তে থাকলে মানুষের জীবন যাত্রার ব্যয় বেড়ে আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠবে। বাজার নিয়ন্ত্রণে এখনই সংশ্লিষ্টদের কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
পিএসএন/এমঅাই


