
বাংলাদেশে সড়ক বলতে বিটুমিনের তৈরি সড়কই বোঝায়। বিটুমিন ব্যবহার করে সড়ক নির্মাণে খরচ কিছুটা কম হলেও ভারি যানবাহন, বেশি তাপমাত্রা, বৃষ্টিসহ নানা কারণে বিটুমিনের তৈরি সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাড়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও। ফলে প্রায় প্রতি বছরই এসব সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ করতে হয় এবং ব্যয় হয় প্রচুর টাকা ও কর্মঘণ্টা।
অন্যদিকে কংক্রিটের সড়ক নির্মাণে খরচ বেশি হলেও রক্ষণাবেক্ষণে খরচ বিটুমিনের সড়কের তুলনায় খুব কম। বিটুমিনের তৈরি সড়কের ক্ষেত্রে ডিজাইন লাইফ ধরা হয় সাধারণত ১০-১৫ বছর। সেখানে কংক্রিটের তৈরি সড়কের ডিজাইন লাইফ কমপক্ষে ২০-২৫ বছর। বিটুমিনের সড়ক পানি, উষ্ণতা ও উচ্চ লোডে সংবেদনশীল হলেও কংক্রিটের সড়ক এগুলো সহজেই হজম করতে পারে।
রাজধানীর দুই-একটি এলাকায় খুবই ছোট পরিসরে কংক্রিটের সড়ক দেখা যায়। তবে এবার কংক্রিটের মহাসড়ক নির্মাণে হাত দিয়েছে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ)। এলেঙ্গা-হাটিকুমরুল-রংপুর জাতীয় মহাসড়কের প্রায় অর্ধেক নির্মাণ হচ্ছে কংক্রিটে।
বাংলাদেশ বৃষ্টিবহুল ও গ্রীষ্ম প্রধান দেশ। ক্রমাগত ভারী বর্ষণ এবং অধিক তাপমাত্রায় বিটুমিনাস সড়ক দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এছাড়া মাত্রাতিরিক্ত ভারী যানবাহন, ব্রেকিং লোডে ২-৩ বছরের মাথায় প্রয়োজন হয় সংস্কারের। এতে সওজকে প্রতি বছর গুণতে হয় বিপুল পরিমাণ অর্থ ও শ্রম। বিপরীতে কংক্রিটের সড়কের ক্ষেত্রে ডিজাইন লাইফ কমপক্ষে ২০-২৫ বছর এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় নেই বললেই চলে।
কংক্রিটের সড়ক সাধারণত তিন ধরনের। রড ছাড়া আড়াআড়ি জোড়াযুক্ত কংক্রিট সড়ক (জেপিসিপি), রডসহ আড়াআড়ি জোড়াযুক্ত কংক্রিট সড়ক (জেআরসিপি) এবং রডসহ আড়াআড়ি জোড়াবিহীন কংক্রিট সড়ক (সিআরসিপি)।
দেশের মহাসড়ক নেটওয়ার্কের মধ্যে বিভিন্ন বাজার, টোল প্লাজা, নাজুক অংশ স্বল্প পরিসরে ও বিচ্ছিন্নভাবে কংক্রিট দিয়ে গতানুগতিক পদ্ধতিতে নির্মাণ করা হয়েছে। তারপরও সেগুলি বছরের পর বছর টিকে আছে। বর্তমানে সওজ-এর বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় সড়কের গুরুত্বপূর্ণ ও নাজুক অংশে জেআরসিপি (রডসহ আড়াআড়ি জোড়াযুক্ত) পদ্ধতিতে সড়ক নির্মাণ চলছে।
এদিকে দেশে প্রথম জেআরসিপি (রডসহ আড়াআড়ি জোড়াযুক্ত) এবং সিআরসিপি (রডসহ আড়াআড়ি জোড়াবিহীন) পদ্ধতিতে মহাসড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে। ১৯১ কিলোমিটার দীর্ঘ এলেঙ্গা-হাটিকুমরুল-রংপুর জাতীয় মহাসড়কের প্রায় অর্ধেক নির্মাণ হচ্ছে কংক্রিটে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট প্লানিং ইঞ্জিনিয়ার রুবায়েত আজম বলেন, প্রাথমিকভাবে কংক্রিটের সড়ক নির্মাণে খরচ কিছুটা বেশি। তবে সংস্কার এবং লাইফটাইম হিসেবে খরচ প্রায় অর্ধেক কম। রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় প্রায় শূন্য।
তিনি বলেন, নির্ধারিত সময় পর এ সড়কে বিটুমিনের আস্তরণ দেওয়া হবে। এ সড়কে যাতায়াতে বিঘ্ন হয় এমন ফাটল সৃষ্টি হওয়ার ঝুঁকি নেই, তবে কখনও হলে বিটুমিন দিয়েই সংস্কার করা হবে। কংক্রিটের উপর বিটুমিনের আস্তরণ দেওয়া হবে। সনাতন পদ্ধতি বাদ দিয়ে উন্নত প্রযুক্তিতে এ সড়ক নির্মাণে ঝাঁকুনি কমে আরামদায়ক যাতায়াত নিশ্চিত হবে বলেও জানান তিনি।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী সন্তোষ কুমার রায় বলেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ও জলবায়ুগত দিক চিন্তা করলে কংক্রিট সড়কের বিকল্প নেই। কারণ বাংলাদেশ বৃষ্টিপ্রবণ দেশ। বছরে ৫-৬ মাসই বৃষ্টি থাকে। কখনও কখন সপ্তাহ জুড়ে বৃষ্টি থাকে। বিটুমিনের প্রধান শত্রু পানি। অন্যদিকে এর বিপরীত চিত্র কংক্রিটে। পানি পেলে আরও শক্ত হয়। যা ওভারলোডেও টিকে থাকে। অধিক তাপে বিটুমিন নরম হয়ে গেলেও কংক্রিট টিকে থাকে। বর্তমান বাজার মূল্য বিবেচনায় বিটুমিন থেকে কংক্রিটের সড়ক নির্মাণে ১০ শতাংশ খরচ বেশি হলেও লাইফ টাইম হিসেবে ৫০ শতাংশ খরচ কম। কারণ ঘন ঘন সংস্কার করার প্রয়োজন হবে না।
কংক্রিটের সড়ক সংস্কারের প্রক্রিয়া জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, ১০ বছর পর কংক্রিটের উপর বিটুমিনের লেয়ার দেওয়া হবে। যার স্থায়িত্ব হবে ৫ বছর। এছাড়াও কংক্রিটে কোনো ধরনের ফাটল ধরলে বিটুমিন দ্বারাই সংস্কার করা হবে। কংক্রিটের এ স্তর দুইটি ভাগে বিভক্ত- নিচের অংশ চার ইঞ্চি, উপরের অংশ ১১ ইঞ্চি। মোট ১৫ ইঞ্চি।
উল্লেখ্য, বর্তমানে বাংলাদেশে নির্মিত ঢাকা-চট্টগ্রাম ও জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বাজার অংশ, সিলেট-ভোলাগঞ্জ সড়ক, বিভিন্ন টোলপ্লাজা এবং পোর্ট সংযোগ সড়ক কংক্রিটের তৈরি, যা কার্যকরভাবে সার্ভিস দিচ্ছে।


