প্রতিমাসে একবার গ্রামের বাড়ি নেত্রকোনায় যান সাকিব আব্দুল্লাহ। কয়েকবছর ধরে এই ধারা অব্যাহত রেখেছেন ঢাকায় বেসরকারি কোম্পানির এই চাকরিজীবী। বাস কিংবা ট্রেনে টিকিট পেতে ঝামেলা হওয়ায় সঙ্গী করে নিয়েছেন মোটরসাইকেল। এই তো গত ঈদে মোটরসাইকেলযোগে বাড়ি যেতে পেরেছিলেন বেশ অল্প সময়ে। এতে যানজটে পড়তে হয়নি তাকে। সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন— আসন্ন ঈদ-উল আজহাতেও বাড়ি যাবেন মোটরসাইকেলে। প্রস্তুতিও নিয়েছিলেন সেই হিসাব করে। কিন্তু ‘মোটরসাইকেল নিয়ে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় ঈদের আগে-পরে ৭ দিন যাওয়া যাবে না’ সরকারের এই সিদ্ধান্তে বেশ হতবাক হয়েছেন তিনি। সাকিবের কাঠখোট্টা জবাব— ‘পরিবহন মালিকদের খুশি করতেই সরকারের এমন সিদ্ধান্ত’।
মোটরসাইকেল চালকরা মনে করেন, গত ঈদে (ঈদুল ফিতর) পরিবহন মালিকরা তেমন যাত্রী পাননি। রাজধানীর গাবতলী, সায়দাবাদ ও মহাখালী বাস টার্মিনালগুলোতে ডেকে ডেকে যাত্রী তোলার প্রতিযোগিতাও করেছেন তারা। কারণ রমজানের ঈদে কয়েক লাখ মানুষ গ্রামে ছুটেছেন মোটরসাইকেল নিয়ে। চোখেমুখে ক্লান্তি থাকলেও স্বস্তি ছিল দূরপাল্লার যাত্রায়। কিন্তু এবার সেই স্বস্তির যাত্রাকে থমকে দেওয়া হলো।
বিগত বছরগুলোতে বাস, ট্রেন ও লঞ্চে টিকিট পেতে ভোগান্তির অভিজ্ঞতা অনেককে বিষিয়ে তুলেছে। তা থেকে রেহাই পেতে বিকল্প যানবাহন হিসেবে মানুষজন বেছে নিয়েছিল মোটরসাইকেল। কিন্তু সেই বিকল্প বাহনটিকে ঈদের আগে-পরে সাত দিন নিষিদ্ধ করায় অনেকে চটেছেন। দুর্ঘটনার অজুহাত দেখিয়ে হঠাৎ করে এক জেলার বাইক অন্য জেলায় যেতে না দেওয়ার সিদ্ধান্তকে কোনোভাবে মেনে নিতে পারছেন না অনেক মোটরসাইকেল চালক। পাশাপাশি রাইড শেয়ারিং বন্ধের বিষয়েও জানানো হয়েছে। এতে রাজধানীর বেশিরভাগ মানুষ দীর্ঘ যানজটে ভোগান্তিতে পড়বে।
নোমান আহমেদ। মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার বাসিন্দা তিনি। গত ঈদে বাড়িতে গেলেও এবার ঢাকায় থেকে রাইড শেয়ারিং করবেন বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু তার আশায় গুড়ে বালি। রাইড শেয়ারিং বন্ধের কথা শোনার পর যেন এক রাশ হতাশা ভর করেছে তার ওপর। ঢাকা মেইলের সঙ্গে বলছিলেন সেই কথাই। তিনি জানান, মহাসড়কে দুর্ঘটনার অজুহাতে মোটরসাইকেল বন্ধের পাশাপাশি রাইড শেয়ারিং বন্ধের বিষয়টি স্বল্প আয়ের মানুষের ওপর জুলুম হয়ে যাবে। এর কারণে অনেকে ভালোভাবে ঈদ করতে পারবে না। আমার মতো অনেকেই মনে করেছিলেন— রাইড শেয়ারিংয়ের মাধ্যমে বাড়তি আয় করে বাড়িতে পাঠাবেন। কিন্তু তা আর সম্ভব হচ্ছে না।
ঢাকাসহ সারাদেশে রাইড শেয়ারিং বন্ধের বিষয়টি ভালোভাবে নিতে পারছেন না সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তারা বলছেন, এই পেশার সঙ্গে জড়িয়ে আছেন লক্ষাধিক ব্যক্তি। এটা তাদের পরিবারের রুটি রুজির মাধ্যম। সরকার তাদের জন্য বিকল্প কোনো ব্যবস্থা না রেখে বন্ধের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়াটা অন্যায়।
অন্যদিকে মোটরসাইকেল চালকরা বলছেন, পরিবহন মালিকদের চাপেই সরকারের আমলারা মোটরসাইকেল চালকদের ওপর এমন সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়েছে। এট জুলুম। ঈদে স্বস্তির যাত্রাটাকে সড়ক বিভাগের মাধ্যমে থমকে দিয়েছে বাস মালিকরা।
মোটরসাইকেল চালকরা আরও বলছেন, মোটরসাইকেল ৭ দিন নিষিদ্ধ করার নেপথ্যে সরকার যে যুক্তি দেখিয়েছে তা ঠিক নয়। বাস, লেগুনা, ট্রাক, সিএনজি, ও নছিমন যতক্ষণ পর্যন্ত মোটরসাইকেলে ধাক্কা না দেয় ততক্ষণ এই বাহনে দুর্ঘটনা ঘটে না। অথচ সেসব বাহনকে নিষিদ্ধ করা হলো না।
ঈদের আগে ও পরে সাত দিন এক জেলার মোটরসাইকেল অন্য জেলায় চলাচল করতে পারবে না। রোববার দুপুরে সড়ক বিভাগের সচিব আমিন উল্লাহ নূরী এমন সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন। পাশাপাশি তিনি আরও জানিয়েছেন, শুধু তাই নয় ঈদের আগে ও পরে সাত দিন সারাদেশে রাইড শেয়ারিং বন্ধ থাকবে।
এদিকে সরকারের সিদ্ধান্তকে বাস্তবায়ন করতে মাঠে নেমেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ। ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মনিবুর রহমান জানিয়েছেন, আগামী ৭ জুলাই থেকে ঢাকার প্রবেশ মুখগুলোতে চেক পোস্ট বসানো হচ্ছে। এসব চেকপোষ্টে ঢাকা জেলার মোটরসাইকেল ছাড়া অন্য জেলার মোটরসাইকেলকে ঢাকায় ঢুকতে দেওয়া হবে না।
মনিবুর রহমান জানান, বিষয়টি তারা গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন এবং কড়া নজরদারি চালাবেন। গেল ঈদে মহাসড়কে মোটরসাইকেল বাহনের সংখ্যা বেশি হওয়ায় যানজট ও বিশৃঙ্খলা বেঁধে ছিল। এ কারণেই এবার এমন সিদ্ধান্ত বলে জানিয়েছেন তিনি।
সড়কে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার অজুহাতে ঈদের আগে ও পরে সাত দিন চলাচল নিষিদ্ধ করেছে সরকার।
এদিকে সম্প্রতি ১০ কারণে দেশে দুর্ঘটনা বেড়েছে বলে মনে করছে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করা সংগঠন রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। তারা বলছে, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, বেপরোয়াগতি, চালকদের বেপরোয়া মানসিকতা, অদক্ষতা ও শারীরিক মানসিক অসুস্থতা, বেতন ও কর্ম ঘণ্টা নির্দিষ্ট না থাকা অন্যতম কারণ। এছাড়াও তারা ট্রাফিক ও ব্যবস্থাপনাও দায়ী মনে করছে সংগঠনটি।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশন সারাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার কারণ পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করে জানিয়েছে ১০ কারণে সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েছে। এই কারণগুলোর মধ্যে তরুণ ও যুবকদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো, জনসাধারণের মধ্যে ট্রাফিকের না মানার প্রবণতা ও না জানা দুর্বল ট্রাফিক আইন ব্যবস্থাপনা বিআরটিএ’র সক্ষমতার ঘাটতি এবং গণপরিবনে চাঁদাবাজি অন্যতম ।
পি এস /এন আই


