
নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনে থাকা বিএনপি মাঠের কর্মসূচির বাইরেও সরকারকে চাপে রাখতে নানা কর্মকাণ্ডে জোর দিচ্ছে। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভিসানীতি ঘোষণার পর তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করছে দলটি।
দলীয় সূত্র বলছে, দিনে দিনে এই তালিকায় পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি কনস্টেবল পর্যায়ের সদস্যদের নামও যুক্ত হচ্ছে। বিএনপির এই বিশেষ তালিকায় এ পর্যন্ত (১৮ জুন) ৮০২ জন পুলিশ সদস্যের নাম যুক্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।
দায়িত্বপ্রাপ্তরা বলছেন, বাংলা ও ইংরেজিতে আলাদা করে তৈরি এই তালিকা যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দূতাবাস ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে পৌঁছানো হচ্ছে।
বিএনপির অভিযোগ, দলীয় কর্মসূচিতে বাধা দেওয়া, নেতাকর্মীদের গুম-খুন ও অন্যায়ভাবে গ্রেফতার করার সঙ্গে এসব পুলিশ সদস্য জড়িত। ২০১৮ সালের নির্বাচনের সময় সারাদেশে থানা, জেলা পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের নাম বেশি জায়গা পাচ্ছে।
কোথায় পাঠানো হচ্ছে এই তালিকা- এমন প্রশ্নের অবশ্য সুনির্দিষ্ট উত্তর দিচ্ছেন না তালিকা তৈরির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। তালিকা তৈরির সঙ্গে যুক্ত এমন একজনের কাছে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে রোববার (১৮ জুন) তিনি ঢাকা মেইলকে বলেন, কোথায় কোথায় যাচ্ছে এটা জানি না। তালিকা আপডেট হচ্ছে, আর একটা জায়গায় দেওয়ার জন্য বলা আছে সেখানে পাঠানোর পর কি হচ্ছে তা জানা নেই।
বিএনপির অভিযোগ, দলীয় কর্মসূচিতে বাধা দেওয়া, নেতাকর্মীদের গুম-খুন ও অন্যায়ভাবে গ্রেফতার করার সঙ্গে এসব পুলিশ সদস্য জড়িত। ২০১৮ সালের নির্বাচনের সময় সারাদেশে থানা, জেলা পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের নাম বেশি জায়গা পাচ্ছে।
এরআগে গত ২৩ মে ১৪ সদস্যের ‘তথ্য সংগ্রহ কমিটি’ করে বিএনপি। পরে বিএনপির সব জেলা সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের কাছে চিঠি দিয়ে দেশব্যাপী কর্মসূচিতে বাধাদানকারী ব্যক্তিদের তথ্য দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়। এই কমিটি গায়েবি ও মিথ্যা মামলা, গুম-খুন, সহিংস আক্রমণ, অগ্নিসংযোগসহ কর্মসূচিতে বাধা প্রদানকারী ব্যক্তিদের তথ্য সংগ্রহ করছে। বিশেষ করে বিএনপির দাবি অনুযায়ী যেসব পুলিশ কর্মকর্তা এসব ‘কর্মকাণ্ডে’ জড়িত তাদের তথ্য-উপাত্ত দেওয়ার জন্য বলা হয়।
এই তালিকা করে বিএনপি কী অর্জন করতে চায়- এমন প্রশ্নের জবাবে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান ঢাকা মেইলকে বলেন, তালিকা করা খুবই স্বাভাবিক। কারণ কে আমাকে মারল, কে নির্যাতন করেছে তাকে আমি চিনবো না? জনগণের টাকায় বেতন হয় অথচ জনগণের সঙ্গে অন্যায় আচারণ যারা করবে তাদের তো চিহ্নিত করা জরুরি। এজন্যই এই তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
যদিও বিএনপির এমন তালিকার বিষয় নিয়ে কথা বলতে রাজি নন পুলিশের কোনো পর্যায়ের কর্মকর্তা। তবে তালিকায় কাদের নাম রয়েছে তা জানতে অনেকের মধ্যে কৌতুহল দেখা দিয়েছে।
পুলিশের বিরুদ্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগ করার সুযোগ আছে। না হলে আদালতেও যেতে পারে যে কেউ। সেটা না করে বিএনপি যেটা করছে এটা লজ্জাকর। আর বিদেশিরাও তালিকা পেয়ে চোখ বন্ধ করে দেখবে তাও তো নয়।
—এ কে এম শহীদুল হক, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি)
তবে পুলিশের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তারা বিএনপির এমন কর্মকাণ্ডকে নেতিবাচক হিসেবে দেখছেন। কোনো কর্মকর্তা বা সদস্যের কাজে সংক্ষুদ্ধ হলে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগ করা কিংবা উচ্চ আদালতের দারস্থ হওয়া উচিত বলে মনে করেন পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক।
রোববার (১৮ জুন) রাতে তিনি ঢাকা মেইলকে বলেন, পুলিশের বিরুদ্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগ করার সুযোগ আছে। না হলে আদালতেও যেতে পারে যে কেউ। সেটা না করে বিএনপি যেটা করছে এটা লজ্জাকর। আর বিদেশিরাও তালিকা পেয়ে চোখ বন্ধ করে দেখবে তাও তো নয়।
তিনি আরও বলেন, এমন তালিকা করায় বিএনপির কতটা লাভ হবে জানি না। তবে তাদের প্রতি বাহিনীর সদস্যদের অসন্তোষ বাড়তে পারে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বিএনপি গঠিত কমিটি সহিংসতায় জড়িত থাকার অভিযোগ যাদের বিরুদ্ধে তাদের নাম, পদবী, ভিডিও-অডিও রেকর্ড ও ছবি সংগ্রহ করছে। কেন্দ্রের নির্দেশনা পাওয়ার পর থেকে প্রতিনিয়ত এই তালিকা আসতে শুরু করে।
সবশেষ রোববার (১৮ জুন) যশোর, ঢাকা মহানগর, বগুড়া, পঞ্চগড়, কুষ্টিয়া, চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলা, রংপুর মহানগর, নীলফামারীসহ আরও বেশ কিছু এলাকার ৬৮ জন পুলিশ সদস্যের তথ্য কেন্দ্রে পৌঁছেছে।
এদের মধ্যে ডিআইজি ও পুলিশ সুপার পদমর্যাদার ৬ জন কর্মকর্তা আছেন বলেও জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য বলছে, শনিবার নতুন করে এই তালিকায় আরও ৭০ জন পুলিশ সদস্যের নাম যুক্ত হয়েছে। শনিবার উত্তরাঞ্চলের বেশ কিছু জেলা- পঞ্চগড়, নওগাঁ, বগুড়া, গাইবান্ধা, নীলফামারীর কিছু এলাকার তথ্য, পাবনা, খুলনা, রংপুর জেলা, সিরাজগঞ্জ, বান্দরবনসহ বেশ কিছু এলাকার পুলিশ সদস্যদের নাম কেন্দ্রে পৌঁছেছে।
কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ নয়, দলের পক্ষ থেকে নেতাকর্মীদের গুম, খুন, অন্যায়ভাবে গ্রেফতার, ভোট কারচুপিতে সহযোগিতা করার অভিযোগ যাদের বিরুদ্ধে তাদের তালিকায় আনা হচ্ছে।
—রুহুল কবির রিজভী, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, বিএনপি
এই তালিকায় ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের সময় বিভিন্ন জেলায় দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সুপারদের (এসপি) নাম দেওয়া হয়েছে। তবে পুরো তালিকায় ডিআইজি, অতিরিক্ত ডিআইজি, এসপিসহ মোট শতাধিক কর্মকর্তা রয়েছেন বলে জানা গেছে। যদিও সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তালিকার বিষয় নিয়ে জানতে চাইলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ঢাকা মেইলকে বলেন, কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ নয়, দলের পক্ষ থেকে নেতাকর্মীদের গুম, খুন, অন্যায়ভাবে গ্রেফতার, ভোট কারচুপিতে সহযোগিতা করার অভিযোগ যাদের বিরুদ্ধে তাদের তালিকায় আনা হচ্ছে।
জানা গেছে, দ্রুত সময়ের মধ্যে যেন তালিকা দেওয়া হয় সেজন্য স্থানীয় নেতাদের তাগাদাও দেওয়া হচ্ছে। সব জায়গার তথ্য আসার পর আনুষ্ঠানিকভাবে এ নিয়ে বিএনপির তরফ থেকে কথা বলারও সম্ভাবনা আছে।
বিএনপির দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ভিসানীতি ঘোষণার এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে চাপে রাখার কৌশল হিসেবে এই তালিকা তৈরিতে মন দিয়েছে বিএনপি।
এদিকে গত ২৪ মে বাংলাদেশের জন্য নতুন ভিসানীতি ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। সেখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে নির্বাচন ব্যবস্থায় জালিয়াতি ও অনিয়মের সঙ্গে কেউ জড়িত থাকলে, সেই ব্যক্তিকে ভিসা দেবে না ওয়াশিংটন। এই নীতির আওতায় থাকবেন বর্তমান ও সাবেক বাংলাদেশি কর্মকর্তা-কর্মচারী, সরকারপন্থী ও বিরোধী রাজনৈতিক দলের সদস্য।
আইন প্রয়োগকারী, বিচার বিভাগ এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরাও এর আওতাভুক্ত হবেন। এছাড়া বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে রাজনৈতিক দল, ভোটার, সুশীল সমাজ বা গণমাধ্যমকে তাদের মতামত প্রকাশে বাধা দিলেও ভিসা পাবে না জড়িত ব্যক্তি।
বিএনপির দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ভিসানীতি ঘোষণার এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে চাপে রাখার কৌশল হিসেবে এই তালিকা তৈরিতে মন দিয়েছে বিএনপি।
বিএনপির ঢাকা মহানগর উত্তরের সদস্য সচিব আমিনুল হক ঢাকা মেইলকে বলেন, আমরা তালিকা তৈরি করছি। এখনো পুরো কাজ শেষ হয়নি। দ্রুতই শেষ করে জমা দেওয়া হবে।
এই তালিকা করে বিএনপি কী অর্জন করতে চায় এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গত ১৫ বছরে আমাদের নেতাকর্মীদের ওপর যে পরিমাণ জুলুম-নির্যাতন হয়েছে এরমধ্যে সবাই নয়, সরকারের মদদপুষ্ট কিছু পুলিশ কর্মকর্তা জড়িত। প্রজাতন্ত্রের কর্মী হয়েও তারা যে অন্যায় করেছে সেটা চিহ্নিত করা। এটা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। কারণ কিছু মানুষের জন্য পুরো বাহিনী বদনামের ভাগিদার কেন হবে।


