প্রতিষ্ঠার ৪৪ বছর শেষ করে ৪৫-এ পা রাখতে যাচ্ছে বিএনপি। একাধিকবার দেশের রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা অন্যতম বৃহৎ এই রাজনৈতিক দলটি নানামুখী চাপের মধ্য দিয়ে সময় পার করছে। নেতাদের ভাষ্য- প্রতিষ্ঠার পর থেকে এমন কঠিন সময় তাদের যায়নি। তবে এমন অবস্থার মধ্যেও নিজেদের মধ্যে ঐক্য ধরে রাখতে পেরে স্বস্তিতে আছে হাইকমান্ড।
মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা বলছেন, হামলা-মামলার মুখেও তারা আন্দোলন কর্মসূচিতে সক্রিয় থাকার চেষ্টা করছেন। সেই সঙ্গে এবার কেন্দ্রীয় নেতাদেরও শক্তভাবে মাঠে দেখতে চান তারা।
একাধিকবার রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকা দলটি প্রায় ১৫ বছর ধরে ক্ষমতার বাইরে। দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া দুর্নীতির মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে সরকারের নির্বাহী আদেশে সাময়িক মুক্তি পেয়ে গুলশান বাসভবনে থাকলেও কার্যত তিনি একরকম বন্দি। নানা অসুখ-বিসুখে দিন কাটে তাঁর। এমনকি প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর ঠিক আগের দিনেও বুধবার (৩১ আগস্ট) হাসপাতাল থেকে বাসায় ফিরেছেন খালেদা জিয়া।
অন্যদিকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বহুবছর ধরে লন্ডনে অবস্থান করছেন। তার বিরুদ্ধেও রয়েছে অর্ধশত মামলা। এরমধ্যে একটিতে তার যাবজ্জীবন দণ্ডও হয়েছে। ফলে সহসাই তার দেশে ফেরার সম্ভাবনাও দেখছেন না খোদ দলটির নেতারা।
এসবের মাঝে নিজেদের এই কঠিন সময়েও তৃনমূলের নেতাকর্মীদের সরব উপস্থিতিতে আশার আলো দেখছেন দলের নীতিনির্ধারকরা। ফলে এতদিন অনেকটা নরম কর্মসূচি পালন করলেও বেশ কিছুদিন ধরে দেশজুড়ে মাঠে নামার চেষ্টা করছে বিএনপি। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২২ আগস্ট থেকে সারাদেশে চলছে কর্মসূচি।
এসব কর্মসূচিতে দলের নেতাকর্মীরা হামলা-মামলার শিকার হলেও রাজপথে থাকার অবস্থানে অনড় রয়েছেন তারা। তাই আগামী ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টানা কর্মসূচি চলানোর ঘোষণাও দিয়েছেন। এরমধ্যে মাঝে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে পৃথকভাবে দুই দিনের কর্মসূচিও পালন করা হবে।
যদিও বিএনপির তিন বছরের নির্বাহী কমিটি ছয় বছর ধরে চলছে। তৃণমূলে অনেক জায়গায় নতুন নেতৃত্ব আনা হলেও বেশকিছু জায়গায় এখনো বহুবছরের পুরানো কমিটি কাজ করছে। এমনকি দু-একটি ছাড়া বাকি সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটিও মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে বহু আগে। তবে সবকিছু উপেক্ষা করে তৃণমূলেও এখন নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ দেখা গেছে।
এতদিন দল ক্ষমতার বাইরে থাকলেও কোনা দ্বিধা-বিভক্তির সৃষ্টি করতে পারেনি সরকার। আমাদের উপজেলায় একজন কর্মীও আওয়ামী লীগে যায়নি। উল্টো আওয়ামী লীগের লোকজন যোগাযোগ করছে।
পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক এস এম আহসান উল্লাহ পিন্টু
তৃণমূলের এই নেতা বলেন, ‘প্রতিনিয়ত নির্যাতন-নিপীড়ন চালানো হচ্ছে। বাড়িঘরে হামলা হচ্ছে। তবুও তৃনমূলের কর্মীরা শক্তভাবে মাঠে নামতে প্রস্তুত। শুধু অপেক্ষা কেন্দ্রীয় নির্দেশনার।’
এদিকে, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারাও বলছেন- ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর এখন অনেকটা কঠিন চ্যালেঞ্জ নিয়েই তাদের টিকে থাকতে হচ্ছে। তবে দেশে গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার ফিরিয়ে আনার যে চলমান আন্দোলন, তাতে শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়ও আছে তাদের কণ্ঠে।
যদিও ইতোমধ্যেই দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আন্দোলনে থাকা বিএনপি দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার ঘোষণাও দিয়েছে। তবে কেউ কেউ আবার ভেতরে ভেতরে নির্বাচনে যাওয়ার জন্য হাইকমান্ডকে চাপ দেওয়ার চেষ্টাও করছেন বলে জানা গেছে।
এসবের মাঝেই সারাদেশে মাঠের কর্মসূচিতে নামার পর প্রতিনিয়ত সরকার দলীয় সংগঠনের নেতাকর্মীদের হামলা-বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে বিএনপিকে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও কঠোর অবস্থানে থাকায় মাঠে নামতে বেগ পেতে হচ্ছে। অবশ্য এরমধ্যেও মাটি কামড়ে মাঠে থাকার চেষ্টা করছেন দলের নেতাকর্মীরা।
এদিকে, বিরোধী দলের কর্মসূচিতে বাধা না দিতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর শেখ হাসিনার নির্দেশনার পরও থামছে না হামলা। ফলে বিএনপি নেতাকর্মীরা ধরেই নিয়েছেন- সামনের পুরো সময় এমন প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েই পার করতে হবে।
এ প্রসঙ্গে একমত গাজীপুর জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক মিলনও। তিনি মনে করেন বিএনপি এখন অনেক বেশি শক্তিশালী।
বিএনপির সৃষ্টি হয়েছিল স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য। সে দায়িত্ব পালন করার কারণেই জনগণ একাধিকবার বিএনপিকে রাষ্ট্র ক্ষমতায় বসিয়েছে। এখন প্রতিকূল অবস্থা চললেও তৃনমূল অনেক বেশি সুসংগঠিত, শক্তিশালী ও জনগণের মাঝে বিস্তৃত হয়েছে। সবাই ঐক্যবদ্ধ আছে, এটা অনেক বড় অর্জন।
ঢাকা মেইলকে ফজলুল হক মিলন
আগামী দিনের চ্যালেঞ্জের কথা বলতে গিয়ে ছাত্রদলের সাবেক এই সভাপতি বলেন, ‘এবারের প্রতিপাদ্য হলো- বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি, তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রতিবন্ধকতা দূর করা ও সুষ্ঠু নির্বাচন আদায় করা। এই লড়াইয়ে জিততে হবে। এর কোনো বিকল্প ভাবছি না।’
বিষয়টিতে বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস জাহান শিরিন বলেন, ‘দেশের মানুষও ভালো নেই, বিএনপিও ভালো নেই। কারণ বিএনপি মানুষের দল, জনগণের দল। কিন্তু এতবছর ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকলেও নির্যাতন, মামলা-হামলার হিসেবে সাংগঠনিক সক্ষমতা মোটেও কমেনি। বরং আগের চেয়ে ভালো আছে। আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ।’
সাবেক এই ছাত্রদল নেত্রী বলেন, ‘সামনের দিনে চ্যালেঞ্জ- চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করা, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ফিরিয়ে আনা ও শেখ হাসিনার পতন এবং ভোটের অধিকার ফিরিয়ে আনা।’
প্রতিকূল অবস্থার মাঝেও তৃণমূল আর কেন্দ্র মিলিয়ে বর্তমানে বিএনপির টার্গেট এখন সামনে থাকা চ্যালেঞ্জগুলো বাস্তবায়নের দিকে। খোদ দলের কর্ণধাররাও এ বিষয়ে ঐকে রয়েছে। তবে এতসবের মাঝেও দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে নেতাকর্মীদের শুভেচ্ছা জানাতে ভুলেননি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ইতোমধ্যেই নেতাকর্মীদের জন্য পৃথক বাণীও দিয়েছেন তারা।
এরমধ্যে বাণীতে বিএনপি মহাসচিব বলেছেন, এই ঘোর দুর্দিনে জনগণকে সংগঠিত করার কোনো বিকল্প নেই। ক্রান্তিকালে সকলকে ঐক্যবদ্ধ থেকে অন্যায় ও জুলুমের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। তাই দেশবাসীকে বিএনপির পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানাচ্ছি।
পি এস / এন আই


