
কয়লা সংকট ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বারবার বন্ধ হচ্ছে এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন দুই ইউনিটের রামপাল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র। চালু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ৭ মাসে ৬ বার বন্ধ হয়েছে এই বিদ্যুৎকেন্দ্র। শুধুমাত্র জুলাই মাসেই বন্ধ হয়েছে তিনবার। এতে ব্যহত হচ্ছে বিদ্যুৎ উৎপাদন। এর প্রভাব পড়ছে জতীয় গ্রিডে। হচ্ছে লোডশেডিং। এতে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে বন্ধ আবার কিছুদিন চালু, এভাবে আর কতদিন চলবে বহুল আলোচিত ও সমালোচিত রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র।
কয়লা ফুরিয়ে যাওয়ায় গেল শনিবার (২৯ জুলাই) রাতে আবারও বন্ধ হয়ে গেছে কয়লাভিত্তিক রামপাল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন। ওইদিন দিবাগত রাত সাড়ে চারটার দিকে উৎপাদন বন্ধ করা হয়।
বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের (বিআইএফপিসিএল) উপমহাব্যবস্থাপক আনোয়ারুল আজিম জানান, কয়লা সংকটের কারণে ভোর সাড়ে তিনটায় প্রথম ইউনিটের উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। কয়লা আমদানির জন্য সব ধরনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে।
এরআগে গত ৩০ জুন যান্ত্রিক কিছু ত্রুটির কারণে বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বন্ধ হওয়ার কথা জানায় কর্তৃপক্ষ। তবে সেই সময় পিডিবির পক্ষ থেকে বলা হয় কয়লা সংকটের কারণে বন্ধ হয়েছে। ১০ দিন পর আবারও ১০ জুলাই কেন্দ্র চালু হয়। তার ছয় দিনের মাথায় গত ১৬ জুলাই দুপুর ১টা ৪৩ মিনিটে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে উৎপাদন বন্ধ হয়। চার দিন বন্ধ থাকার পর মেরামত শেষে ২০ জুলাই চালু হওয়ার ১০ দিনের মাথায় তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রটি ফের বন্ধ হলো।
ডলার সংকটের কারণে তরল জ্বালানিভিত্তিক, গ্যাসভিত্তিক ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সীমিত করা হয়েছে। যার ফলে প্রায় ২৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও গড়ে ১২-১৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। এতে বাড়ছে লোডশেডিং।
গেল বছরের ডিসেম্বরে চালু হওয়ার পর কয়লা সংকটের কারণে গত ১৪ জানুয়ারি প্রথমবারের মতো উৎপাদন বন্ধ হয়। এরপর ১৫ এপ্রিল, ২৩ এপ্রিল একই কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ হয় এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির। অর্থাৎ গেল বছরের ১৭ ডিসেম্বর উৎপাদন শুরুর পর থেকে কখনও যান্ত্রিক ত্রুটি, কখনও কয়লা সংকট মিলিয়ে অন্তত ছয়বার কেন্দ্রটি বন্ধ হওয়ার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। চলমান বিদ্যুতের ঘাটতির সময়ে ফের এমন ঘটনায় একটা বড় প্রভাব পড়ছে জাতীয় গ্রিডে। বাড়ছে লোডশেডিং।
সর্বশেষ কয়লা সংকটের কারণে বন্ধ হওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) পরিচালক (জনসংযোগ) মো. শামীম হাসান বলেন, ডলার সংকটের কারণে যথাসময়ে কয়লা আমদানি করা যায়নি। আমার জানা মতে ৫৫ হাজার টন কয়লার জন্য ইতোমধ্যে ঋণপত্র খোলার প্রক্রিয়া চালু আছে। আশা করছি ৮ আগস্টের মধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পুনরায় চালু করা যাবে।
একই কথা জানান বিআইএফপিসিএল উপমহাব্যবস্থাপক আনোয়ারুল আজিম। তিনি বলেন, আপাতত তিন জাহাজ কয়লা আনার জন্য এলসি খোলা গেছে। আশা করছি আগামী ৫ আগস্ট একটি জাহাজ চট্টগ্রামে পৌঁছাবে। সেখান থেকে রামপালে আসতে আরও দুই দিন লাগবে। সব মিলিয়ে আমরা ৮ অগাস্ট বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি আবার চালু করার আশা করছি।
বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য আসলে রামপাল করা হয় নাই। রামপাল করাই হয়েছে ভারতকে খুশি করার জন্য। যার কারণে মেশিনপত্রও ঠিক থাকে না, কয়লাও ঠিক থাকে না। জনগণের টাকার অপচয় করা হয়েছে। এটা থেকে উত্তরণের উপায় হচ্ছে এটা বন্ধ করে দিয়ে সেখানে নবায়নযোগ্য জ্বালানি চালু করতে হবে।
—আনু মুহাম্মদ, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও সাবেক অধ্যাপক ,অর্থনীতি বিভাগ, জাবি
বিদ্যুৎকেন্দ্র সূত্রে জানা যায়, উৎপাদন শুরু পর থেকে নিয়মিত ৫৬০ থেকে ৫৭০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করছিল রামপাল কেন্দ্র। উৎপাদিত বিদ্যুতের মধ্যে ৪৬০ মেগাওয়াট ঢাকার জাতীয় গ্রিডে এবং ২০০ মেগাওয়াট খুলনা-বাগেরহাটে সরবরাহ করা হচ্ছিল। নিয়মিত উৎপাদনের জন্য কেন্দ্রটিতে প্রায় পাঁচ হাজার মেট্রিক টন কয়লার প্রয়োজন।
এদিকে ডলার সংকটের কারণে তরল জ্বালানিভিত্তিক, গ্যাসভিত্তিক ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সীমিত করা হয়েছে। যার ফলে প্রায় ২৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও গড়ে ১২-১৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। এতে বাড়ছে লোডশেডিং।
পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী সোমবার (৩১ জুলাই) দুপুর ২টার দিকে লোডশেডিং ছিল ১৫৭২ মেগাওয়াট। দুপুর ৩টার দিকে লোডশেডিং ছিল ১৫৪১ মেগাওয়াট। নগরাঞ্চলে লোডশেডিংয়ের খুব বেশি প্রভাব না পড়লেও লোডশেডিংয়ের ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে গ্রামাঞ্চলগুলোতে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের ভুল নীতির কারণে বারবার ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে বিদ্যুৎ খাত। যখন সারা বিশ্বই নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে তখন শত বাধা সত্বেও সরকার কয়লভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দিকে অগ্রসর হয়েছে।
এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ আনু মুহাম্মদ বলেন, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে শুরু থেকেই সরকার মিথ্যাচার করে আসছে। সরকার যে মিথ্যাচর করেছে তার প্রমাণ হচ্ছে এটা একটা যে বারবার বন্ধ হচ্ছে। তারা বলেছে যে এটা হলো পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি। এখন দেখা যাচ্ছে কয়েকদিন পর পর কারখানায় সমস্যা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, মূল বিষয় হচ্ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য আসলে রামপাল করা হয় নাই। রামপাল করাই হয়েছে ভারতকে খুশি করার জন্য। যার কারণে মেশিনপত্রও ঠিক থাকে না, কয়লাও ঠিক থাকে না। জনগণের টাকার অপচয় করা হয়েছে। এটা থেকে উত্তরণের উপায় হচ্ছে এটা বন্ধ করে দিয়ে সেখানে নবায়নযোগ্য জ্বালানি চালু করতে হবে।
ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ অর্থায়নে নির্মিত হওয়া রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মোট উৎপাদন ক্ষমতা ১৩২০ মেগাওয়াট। বর্তমানে চলমান প্রথম ইউনিটের উৎপাদন ক্ষমতা ৬৬০ মেগাওয়াট, যা পূর্ণমাত্রায় উৎপাদনে প্রায় পাঁচ হাজার টন কয়লার প্রয়োজন হয়। আগামী সেপ্টেম্বরে দ্বিতীয় ইউনিটটিও চালু করার কথা রয়েছে।


