
বিএনপির অবস্থান কর্মসূচির দিন সংঘর্ষ ও বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনার পাশাপাশি দলটির দুই নেতার প্রতি সরকারের আচরণ রাজনীতিতে নতুন বার্তা হয়ে এসেছে। এ বিষয়টিকে বিএনপি ‘নিম্নমানের মশকরা’ ও দলে বিভ্রান্তি সৃষ্টির অপচেষ্টা হিসেবে দেখলেও আওয়ামী লীগ বলছে, তারা সৌহার্দ্যরে বার্তা দেওয়ার নতুন কৌশল প্রয়োগ করেছে। এ ঘটনাটি বাদ দিলেও সম্প্রতি রাজনীতিতে দুই দল কাছাকাছি স্থানে কর্মসূচি পালন করলেও সংঘাতে জড়ায়নি। এ বিষয়ে কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আসন্ন নির্বাচন ঘিরে বিদেশিদের নজরদারি এবং সর্বোপরি যুক্তরাষ্ট্রের ভিসানীতির প্রভাব পড়েছে দেশের রাজনীতিতে। তারা বলছেন, সরকারপক্ষ যেমন বিরোধীদের ওপর চড়াও হওয়া থেকে দূরে থাকছে, তেমনি বিরোধীপক্ষও সহিংসতার দায় নিজেদের ঘাড়ে নিতে নারাজ।
বিএনপির অবস্থান কর্মসূচি ছিল গত ২৯ জুলাই। ওইদিনের সংঘাতের ঘটনায় পরদিন বিক্ষোভ মিছিল করে আওয়ামী লীগ। এর পরদিন সারা দেশে বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দেয় বিএনপি। আওয়ামী লীগ একইদিন সমাবেশের ঘোষণা দিলেও পরে কর্মসূচি বাতিল করে। যে কারণে বিএনপির সমাবেশ ঘিরে নতুন করে আর উত্তেজনা দেখা যায়নি।
গত ২৪ মে যুক্তরাষ্ট্র ঘোষিত নতুন ভিসানীতির উল্লেখ করে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে এখনকার রাজনীতিতে ভিসানীতির প্রভাব দেখা যাচ্ছে। সরকার ও বিরোধীপক্ষ, তথা রাজনৈতিক দল, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসনসহ নির্বাচনসংশ্লিষ্ট সব পক্ষই সহিংসতা থেকে দূরে থাকতে চাচ্ছে। সরকারপক্ষ অর্থাৎ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ওপর প্রত্যক্ষভাবে ভিসানীতির চাপ একটু বেশি হলেও, বিরোধীপক্ষের আচরণেও চাপে থাকার ছাপ দেখা যাচ্ছে।
কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, গত ২৮ জুলাই বিএনপির মহাসমাবেশ ও জামায়তের সমাবেশ এবং একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের শান্তি সমাবেশ ঘিরে দেশব্যাপী জনগণের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দেয়। বৃহস্পতিবার থেকে রাস্তাঘাটে চলাচল ছিল সীমিত। বিএনপির সমাবেশে যোগ দিতে ঢাকার বাইরে থেকে ঢাকায় প্রবেশের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাধা ও হয়রানির শিকার হওয়ার অভিযোগও উঠেছিল। কিন্তু বাস্তবে সমাবেশ ঘিরে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেনি। পরদিন শনিবার বিএনপি ঢাকার প্রবেশমুখে অবস্থান কর্মসূচি ঘিরে সংঘাতের ঘটনা ঘটে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বিরোধীদের আন্দোলন কর্মসূচিতে সরকারি দল বাধা দিয়ে আসছিল বিগত সময়ে। বিরোধীপক্ষকে মাঠে কঠোরভাবে মোকাবিলা করেছে। কিন্তু এবার তারা কর্মসূচি নিয়ে মাঠে থাকলেও কোনো ধরনের সহিংসতায় জড়াচ্ছে না। আবার ভিসানীতির কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও নজির স্থাপন করছে। বিএনপি নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায়কে ডিবি অফিসে আপ্যায়ন করা হয়েছে। আমানউল্লাহ আমানকে হাসপাতালে দেখতে গেছেন প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধি। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এটা ব্যতিক্রমী ঘটনা। কাজেই বিদেশিদের এ নজরদারির ইতিবাচক দিক আছে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, গত দুই বছর ধরে দেশের রাজনীতি, মানবাধিকার এবং অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরব। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে র্যাবের ওপর দেওয়া নিষেধাজ্ঞা এখনো আছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাথায়ও বিষয়টি রয়েছে। আবার নির্বাচন বানচাল বা নির্বাচন প- করতে কোনো পক্ষ যদি সক্রিয় থাকে তাদের জন্য ভিসানীতি প্রয়োগ করা হবে। এ ঘোষণায়ও সব পক্ষই কিছুটা সহনশীল আচরণ করছে। তাছাড়া গত ছয় মাস ধরে দেশে নির্বাচন ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদল সফরে রয়েছে। আর গত মাস থেকে তো দেখা যাচ্ছে, কোনো না কোনো প্রভাবশালী দেশের প্রতিনিধিদল থাকছে বাংলাদেশে। তারা নির্বাচনকেন্দ্রিক ঘটনাপ্রবাহ প্রত্যক্ষ করছে।
যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত ও বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট হুমায়ুন কবীর বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমারা চায় বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া পূর্ণ হোক। তারা খেয়াল রাখছে এবং ঘন ঘন সফরে আসছে। এর আগে এ বছরের শুরুতে ডোনাল্ড লু এসেছেন। তারপর ডেরেক শোলে এসেছেন। আর গত মাসে এসেছেন উজরা জেয়া। এরা কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যে ঘন ঘন আসছেন। তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের এ আসার ইন্ডিকেশনটা হলো এই যে, তারা আমাদের সব কর্মকা-ে সংযুক্ত থাকতে চাচ্ছে। তারা বুঝতে চাচ্ছে, আমরা কোথায় যাচ্ছি, আমাদের কী অগ্রগতি হয়েছে। সক্রিয়তা কতটুকু। কাজেই সেই সক্রিয়তা বা সেই উদ্যোগ যদি আমরা না দেখাই তাহলে আমার ধারণা, তারা এখন পর্যন্ত যে ইতিবাচকভাবে জিনিসটা গাইড করার জন্য সচেষ্ট আছে, সেই জায়গাটাতে ভিন্ন চিন্তা আসতে পারে।’
হুমায়ুন কবীর বলেন, ‘অনেকে শঙ্কা করছেন, তারা আরেকটা স্যাংশন দেবে কি না। সেটা আমি এভাবে দেখতে চাই না। তাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী যদি তারা আমাদের সক্রিয়তা না দেখে মানে তারা যে নির্বাচন ও গণতন্ত্রের কথা বলছে। সে ক্ষেত্রে কিন্তু তারা তাদের মতো করে সিদ্ধান্ত নেবে। এখানে কার সঙ্গে দেখা করলেন সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাদের বক্তব্যটা গুরুত্বপূর্ণ।’
সাবেক এ রাষ্ট্রদূত বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বলছে, তারা কোনো দলের পক্ষ নয়। তারা বলছে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার কথা। এ কথা আওয়ামী লীগের জন্য যেমন প্রযোজ্য, তেমনি ১৫ বছর আগে বিএনপির জন্য প্রযোজ্য ছিল। আগামী ১০ বছর পরে হয়তো অন্য কারও জন্য প্রযোজ্য হবে। তারা মূলত ডেমোক্রেসিটাকে (গণতন্ত্র) শক্তিশালী করতে চায়। একটা নির্বাচন শুধু ডেমোক্রেসির একটা অংশ। এখন তারা বড় প্রেক্ষাপট নিয়ে কথা বলছে। তারা নাগরিক অধিকার, মিডিয়া ফ্রিডমের কথা বলছে, নাগরিক সমাজের কথা বলছে। নানা বিষয় নিয়ে আসছে। এগুলো যদি না থাকে তাহলে নির্বাচন হলেও আবার একই সমস্যা হবে। বাতাবরণটা যদি একই থাকে তাহলে যে-ই আসবে, সে-ই সেভাবে কাজটা করবে। তাহলে ভবিষ্যতে আর এ সংকট হবে না। তিনি বলেন, ‘আমার ধারণা ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং যুক্তরাষ্ট্র সেই জায়গাটাতেই মনোযোগ দিচ্ছে। তাদের মধ্যে এ বিষয়ে একটা সমন্বয় রয়েছে।’
জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণ পরিষদের (জানিপপ) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ বলেন, আগে তো বিরোধী দলকে সভা-সমাবেশ করারও অনুমতি দেওয়া হতো না। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান চাইলে গোলাপবাগ মাঠ দেয়। বিদেশিরা নির্বাচন নিয়ে সহায়ক ভূমিকা নেওয়ার ফলে বিরোধীপক্ষকে অন্ততপক্ষে কর্মসূচি করতে দিচ্ছে। আবার র্যাব এবং ওই সংস্থাটির সাবেক কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকায় বিরোধীপক্ষের কর্মসূচিগুলোতে পুলিশের মধ্যেও বেশ সহনশীল আচরণ লক্ষ করা গেছে। পুলিশ প্রধানের বক্তব্য থেকেও তা পাওয়া যায়। বিশেষ করে বিএনপির দুই নেতাকে আটক করার পর পুলিশ যে সৌজন্য দেখিয়েছে, সেটাও সবাই লক্ষ করেছে। বিগত সময়ে দেখা গেছে, এ ধরনের কর্মসূচিতে ভয়াবহ পরিস্থিতি হয়। বিরোধীপক্ষও শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালন করছে, যা অতীতে দেখা যায়নি। এর কারণ মার্কিন ভিসানীতিতে সবাই পড়বে।
এদিকে গত সোমবারও বাংলাদেশে চলমান বিক্ষোভে সহিংসতা ও ভীতি প্রদর্শন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এ ছাড়া সহিংসতা ও হামলার ঘটনায় স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত করা এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনার আহ্বানও জানিয়েছে দেশটি। একই সঙ্গে মানুষকে শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করার সুযোগ দেওয়া এবং সেই লক্ষ্যে নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র ম্যাথিউ মিলার। নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এ আহ্বান জানান।
এ ছাড়া গত মঙ্গলবার ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত পিটার ডি হাস প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বৈঠক শেষে তিনি সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে আগামী অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক-নির্বাচনী পর্যবেক্ষক দল আসবে।
পিএসএন/এমঅাই



