বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছেন, বাজারে পণ্যের দাম বেড়েছে বলেই আমরা বারবার বাজারে আসছি, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বসছি। বাজারে পাইকারিতে তেমন সমস্যা না থাকলেও খুচরা-পাইকারিতে দামের বেশ পার্থক্য রয়েছে। রাস্তায় চাঁদাবাজির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কোথাও যদিও চাঁদাবাজির কারণে পণ্যের দাম বেড়ে যায় তাহলে আমার নম্বরটি নিন। কোন কোন পয়েন্টে চাঁদাবাজি হচ্ছে আমাকে জানান, আমি নিজে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলব।
পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকলেও রোজার প্রথম দিনেই কয়েকটি পণ্যে বেশি অস্থিরভাব দেখা যায়। বেলা বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেগুনের দাম এক লাফে পৌঁছে যায় ১১০ টাকায়। অথচ কয়েক ঘণ্টা আগে শনিবার রাতে প্রতিকেজি বেগুন বিক্রি হয়েছে মানভেদে ৫০-৬০ টাকায়। বেগুনের সঙ্গে দ্বিগুণ দামে বিক্রি হয় লেবু, শসা ও কাঁচা মরিচ। প্রতিহালি লেবু ৪০-৬০, শসা প্রতিকেজি ৮০-৯০ এবং প্রতিকেজি কাঁচা মরিচ ৮০ টাকায় বিক্রি হয়েছে খুচরা বাজারে। অন্যান্য শাক-সবজির দামও চড়া। এছাড়া পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকলেও তরমুজ, বাঙ্গিসহ বেশিরভাগ ফলমূলের দাম বেড়ে গেছে।
বেগুনসহ অন্যান্য সবজির দাম বাড়ার বিষয়টি বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশির নজরে এসেছে। তিনি জানান, ঢাকার পাইকারি বাজারে বেগুন ৫০ টাকা অথচ উত্তরবঙ্গে ১৫ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে বেগুন। এ কারণে ভোরে ট্রাক বাজারে আসার সময় মনিটরিং জোরদার করা হবে।
স্বল্পমূল্যের দুধ, মাংস ও ডিম কিনতে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ভ্রাম্যমাণ দোকানে নগরবাসীর ভিড় বাড়ছে। রমজান মাসে বাজারমূল্য স্থিতিশীল রাখতে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সুলভ মূল্যে দুধ, ডিম ও মাংসের ভ্রাম্যমাণ বিক্রয়ের বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। রবিবার রাজধানীর ফার্মগেটে প্রাণিসম্পদ অধিদফতর চত্বরে এই বিক্রয় কার্যক্রমের ভার্চুয়ালি উদ্বোধন করেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম।
১ রমজান থেকে ২৮ রমজান পর্যন্ত রাজধানী ঢাকার ১০টি স্থানে ভ্রাম্যমাণ এ বিপণন কার্যক্রম চালু থাকবে। প্রাথমিকভাবে সচিবালয় সংলগ্ন আব্দুল গণি রোড, খামারবাড়ি গোল চত্বর, জাপান গার্ডেন সিটি, মিরপুর ৬০ ফুট রাস্তা, আজিমপুর মাতৃসদন, নয়াবাজার, আরামবাগ, নতুন বাজার, কালশী এবং যাত্রাবাড়ী ভ্রাম্যমাণ বিপণন ব্যবস্থা চালু করা হবে।
মুখরোচক বেগুনি বাঙালীর ইফতার আয়োজনের অন্যতম অনুষঙ্গ। ফলে রোজা এলে বেগুনের কদর প্রতিবছরই বেড়ে যায়, ব্যবসায়ীরা সে সুযোগ নিতে সংযম দেখান না খুব একটা। রবিবার প্রথম রোজার সকালে যাত্রাবাড়ী, ফকিরাপুল, কাপ্তানবাজার, মুগদাপাড়া, খিলগাঁও এবং গোড়ান কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা গেছে, খুচরা বিক্রেতারা প্রতিকেজি বেগুন ১০০-১১০ টাকায় বিক্রি করছেন। একদিন আগেও এসব বাজারে বেগুন বিক্রি হয়েছে ৫০-৬০ টাকায়। আর এক সপ্তাহ আগে ছিল ৪০-৫০ টাকা।
এ প্রসঙ্গে কাপ্তানবাজারের সবজি বিক্রেতা মোঃ খলিল বলেন, রোজায় অধিকাংশ ক্রেতার প্রথম পছন্দ বেগুন। এ কারণে বেগুনের চাহিদা বেশি থাকে, তাই দামও বৃদ্ধি পায়। আর এ কারণেই বেগুনের দামে সেঞ্চুরি হয়েছে। তবে কয়েকদিনের ব্যবধানে আবার দাম কমে যাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। চাহিদার কারণে এই সময়ে প্রচুর বেগুন আসে মফস্বল থেকে। অন্যদিকে সবজির পাইকারি ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, শনিবার রাতে উত্তরবঙ্গের কয়েকটি জেলা এবং ময়মনসিংহ থেকে বেগুন নিয়ে কাওরানবাজারে এসেছে অন্তত ১০ থেকে ১২টি ট্রাক। সকালে রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে সরবরাহ করা হয়েছে সেই বেগুন। চাহিদা বাড়ায় বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেগুনের দাম বেড়ে যায়।
গোড়ানবাজার থেকে কাঁচাবাজার করছিলেন খিলগাঁওয়ের তিলপাপাড়ার বাসিন্দা আফরোজা আক্তার। তিনি বলেন, দুই থেকে তিনদিন আগে প্রতিকেজি বেগুন ৪০-৫০ টাকায় কেনা হয়েছে। এখন সেই বেগুন দ্বিগুণেরও বেশিদামে বিক্রি হচ্ছে খুচরা বাজারে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, না কিনেও উপায় নেই। ইফতারি বানাতে বেগুন লাগবেই। পরিবারের সবাই ইফতারিতে বেগুনি পছন্দ করেন। এদিকে, এ মৌসুমে বাজারে লম্বা ও গোল দুই ধরনের বেগুনই আছে। তবে বেগুনি বানাতে লম্বা বেগুন কাটতে সুবিধা। তাই বাজারে গাইবান্ধা, ময়মনসিংহ থেকে আসা লম্বা বেগুনের চাহিদা বেশি। বাসাবাড়ির পাশাপাশি রেস্তরাঁ ও খাবারের দোকানেও প্রচুর বেগুন দরকার হয় এ সময়। বিকেল থেকে দোকানের সামনে টেবিল বসিয়ে বিক্রি হবে হরেক রকমের ইফতার সামগ্রী। এর মধ্যে বেগুনিও থাকবে। এ প্রসঙ্গে মগবাজারের একটি রেস্তরাঁর সহকারী ব্যবস্থাপক আকরাম হোসেন বলেন, বিভিন্ন জায়গায় আমরা অর্ডার সরবরাহ করি। আজকে (রবিবার) চারটি প্রতিষ্ঠানে আমাদের ইফতার সামগ্রীর প্যাকেট যাবে। সেখানে অন্য খাবারের সঙ্গে দুটো করে বেগুনিও থাকবে।
চাঁদাবাজদের তথ্য দিন তাদের ধরা হবে ॥ নিত্যপণ্যের দাম বাড়াতে যারা মহাসড়ক ও বাজারে চাঁদাবাজি করছে তাদের তথ্য জানাতে আহ্বান জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। তিনি জানান, তাদের তথ্য দিন, নাম্বার দিন-চাঁদাবাজদের ধরা হবে। এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করা হবে। তিনি বলেন, বাজারে পণ্যের দাম বেড়েছে বলেই আমরা বারবার বাজারে আসছি, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বসছি। বাজারে পাইকারিতে তেমন সমস্যা না থাকলেও খুচরা-পাইকারিতে দামের বেশ পার্থক্য রয়েছে। রবিবার রাজধানীর কাওরানবাজার পরিদর্শন শেষে এসব কথা বলেন বাণিজ্যমন্ত্রী। এর আগে কাওরানবাজার ব্যবসায়ী কমিটির সঙ্গেও সভা করেন মন্ত্রী। বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, চালের বাজারে কিছুটা অসঙ্গতি দেখেছি। পাইকারিতে মোটা চাল ৪৩-৪৪ টাকা, খুচরায় সেটা আরও বাড়বে। তবে এখন আর মোটা চাল কেউ খান না। রিক্সাচালকও চিকন চাল খোঁজেন। আমরা খুচরায় আরও মনিটরিং বাড়াতে চাই, এ জন্য কাজ করবে টাস্কফোর্স। ফল ও কাঁচাবাজারের দাম নিয়ে তিনি বলেন, ঢাকায় বেগুন ৫০ টাকা আর রংপুরে ১৫ টাকা। আমরা ভোরে ট্রাক বাজারে আসার সময় মনিটরিং বাড়াতে চাই। এতে বোঝা যাবে দামের পার্থক্য। মাংসের হঠাৎ দাম বৃদ্ধি নিয়ে তিনি বলেন, মাংসের দাম সিটি কর্পোরেশন নিয়ন্ত্রণ করে। আমরা সিটি কর্পোরেশনের সঙ্গে বসতে চাই।
ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আল্লাহ আপনাদের মাফ করবেন না। যেখানে উৎসবের সময় বিশ্বের সব দেশে দাম কমে, আমাদের এখানে দাম বাড়ানো হয়। আমাদের প্রতিবেশী ভারতে পূজায় বিভিন্ন পণ্যের দাম কমে আর আমাদের এখানে সিয়াম-সাধনার মাসে দাম বাড়ানো হয়েছে। তবে কি আল্লাহ আপনাদের মাফ করবেন? এ সময় বাণিজ্য সচিব তপন কান্তি ঘোষ, ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের মহাপরিচালক এএইচএম সফিকুজ্জামান, পরিচালক মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ারসহ ব্যবসায়ীরা উপস্থিত ছিলেন।
স্বল্পমূল্যে দুধ মাংস-ডিম কিনতে মৎস্য প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ভ্রাম্যমাণ দোকানে ভিড় ॥ রমজান মাস উপলক্ষে নগরবাসীর জন্য ভ্রাম্যমাণ দোকানে সুলভ মূল্যে দুধ, ডিম ও মাংস বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, প্রতিটি ভ্রাম্যমাণ গাড়িতে পাস্তুরিত তরল দুধ প্রতি লিটার ৬০ টাকা, গরুর মাংস প্রতি কেজি ৫৫০ টাকা, খাসির মাংস প্রতি কেজি ৮০০ টাকা, ড্রেসড ব্রয়লার প্রতি কেজি ২০০ টাকা এবং ডিম প্রতি হালি ৩০ টাকা দরে বিক্রয় করা হবে। রাজধানী ঢাকার ১০টি স্থানে ভ্রাম্যমাণ বিক্রয় ব্যবস্থা চালু থাকবে। ২৮ রমজান পর্যন্ত এ কার্যক্রম চলবে।
প্রাথমিকভাবে সচিবালয় সংলগ্ন আব্দুল গণি রোড, খামারবাড়ি গোল চত্বর, জাপান গার্ডেন সিটি, মিরপুর ৬০ ফুট রাস্তা, আজিমপুর মাতৃসদন, পুরান ঢাকার নয়াবাজার, আরামবাগ, নতুন বাজার, মিরপুরের কালশী এবং যাত্রাবাড়ীতে ভ্রাম্যমাণ বিপণন ব্যবস্থা চালু করা হবে। প্রতিটি ভ্রাম্যমাণ গাড়িতে পাস্তুরিত তরল দুধ প্রতি লিটার ৬০ টাকা, গরুর মাংস প্রতি কেজি ৫৫০ টাকা, খাসির মাংস প্রতি কেজি ৮০০ টাকা, ড্রেসড ব্রয়লার প্রতি কেজি ২০০ টাকা এবং ডিম প্রতি হালি ৩০ টাকা দরে বিক্রয় করা হবে। নগরবাসী কিছুটা কমদামে পেতে ভ্রাম্যমাণ দোকানে ভিড় করছেন। নগরবাসীর অনেকেই এসব দোকানের খোঁজ করছিলেন। কিন্তু ১০টি দোকানের কারণে ঢাকার অল্প মানুষ স্বল্পমূল্যের এসব ভোগ্যপণ্য কিনতে পারছেন। এসব দোকান বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
রোজায় বাজারে নজরদারি করবে ব্যবসায়ী কমিটি ॥ রোজার মাসে ঢাকাসহ সারাদেশে নিত্যপণ্যের বাজারে নজরদারির পাশাপাশি সরবরাহ, উৎপাদন ও আন্তর্জাতিক বাজার পর্যবেক্ষণে ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি কমিটি করা হয়েছে। সম্প্রতি এফবিসিসিআই কার্যালয়ে নিত্যপণ্যের মজুদ, আমদানি, সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি নিয়ে মতবিনিময় সভায় ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই সভাপতি জসিম উদ্দিন এ কথা জানান। বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের পাশাপাশি ব্যবসায়ীদেরও দায়িত্ব আছে জানিয়ে তিনি বলেন, সারাবিশ্বে উৎসবকে সামনে রেখে ব্যবসায়ীরা পণ্যের দাম কমান। বাংলাদেশেও এমন সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে। এফবিসিসিআই সভাপতি জানান, রমজানে সারা দেশের বাজার মনিটরিংয়ের জন্য এফবিসিসিআইর জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবুকে আহ্বায়ক করে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। ৪৬টি নিত্যপণ্যের ব্যবসায়ী সমিতির প্রতিনিধিদের নিয়ে এই মনিটরিং কমিটি গঠন করা হয়েছে। এসব সদস্যরা নিজেদের এ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধিদের দিয়ে ঢাকাসহ সারা দেশে বাজার পর্যবেক্ষণ করবেন। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারদর, সরবরাহ পরিস্থিতি, উৎপাদন ও আন্তর্জাতিক বাজারদর সংগ্রহ ও পর্যালোচনা ও সরেজমিনে বাজার পরিদর্শন করবেন এই কমিটির সদস্যরা।
বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনায় ১৭ সদস্যের টাস্কফোর্স গঠন ॥ দ্রব্যমূল্য ও বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনায় বাণিজ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার সমন্বয়ে ১৭ সদস্যের টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। সম্প্রতি এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করে বলা হয়, এ কমিটি প্রতি মাসে অন্তত একটি সভায় বসবে। বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশিকে উপদেষ্টা ও বাণিজ্য সচিব তপন কান্তি ঘোষকে সভাপতি করে ‘দ্রব্যমূল্য ও বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনায়’ এ টাস্কফোর্স গঠন করা হয়।
পিএসএন/এমঅাই


