
ঢাকার পাশে দেশের সবচেয়ে বড় সিটি করপোরেশন গাজীপুরে নির্বাচন আগামীকাল বৃহস্পতিবার (২৫ মে)। এই নির্বাচনে মেয়র পদে বেশ কয়েকজন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন দুইজন প্রার্থী। একজন ক্ষমতাসীন দলের আজমত উল্লা খান আরেকজন সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের মা স্বতন্ত্র প্রার্থী জায়েদা খাতুন। নিজে মেয়র পদের লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত টিকতে না পেরে মাকে নিয়ে লড়ছেন জাহাঙ্গীর আলম।
দল থেকে ছিটকে পড়া আওয়ামী লীগের এই তরুণ নেতা এই নির্বাচনকে নিজের অস্তিত্বের প্রশ্ন হিসেবে নিয়েছেন। মাকে বিজয়ী করে তিনি রাজনীতির মাঠে টিকে থাকতে চান। এজন্য মাকে যেকোনো মূল্যে জয় পাইয়ে দিতে তিনি মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তার ভক্ত-অনুসারীরাও মনে করছেন, মায়ের আড়ালে মূল প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলমই। জায়েদা খাতুন বিজয়ী হলে মূলত জাহাঙ্গীর আলমই মেয়র পদ পরিচালনা করবেন।
২০১৮ সালে গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে দলীয় প্রতীকে মেয়র নির্বাচিত হন জাহাঙ্গীর আলম। তবে ২০২১ সালের ৭ সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বিতর্কিত বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হলে গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে তাকে বহিষ্কার করা হয়। এরপর জাহাঙ্গীর আলমকে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র পদ থেকেও বরখাস্ত করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। তবে শর্তসাপেক্ষে চলতি বছরের জানুয়ারিতে জাহাঙ্গীরকে দলে ফেরানো হয়।
কিন্তু সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হন জাহাঙ্গীর। সেখানে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আজমত উল্লাহ খানকে বেছে নেয় দলটি। দলের মনোনয়ন না পেয়ে জাহাঙ্গীর আলম স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র কেনেন। পাশাপাশি মা জায়েদা খাতুনের নামেও মনোনয়নপত্র নেন তিনি। তবে ঋণখেলাপির জামিনদার হওয়ার কারণে গত ৩০ এপ্রিল জাহাঙ্গীরের মনোনয়নপত্র বাতিল করেন গাজীপুর সিটি নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা ফরিদুল ইসলাম। তবে তার মা জায়েদা খাতুনের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়।
পরে রিটার্নিং কর্মকর্তার ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীর আপিল করেন। গত ৪ মে ওই আপিল খারিজ করে দেন ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার মো. সাবিরুল ইসলাম। ফলে জাহাঙ্গীরের মনোনয়ন বাতিল নিয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তই বহাল রয়ে যায়। এরপর ৭ মে প্রার্থিতা বাতিলের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে গাজীপুরের সাবেক এই মেয়র হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চে রিট আবেদন করেন। পরদিন ৮ মে বিচারপতি ফারাহ মাহবুবের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চ রিট আবেদনটি খারিজ করে দেন।
এদিকে, জাহাঙ্গীর আলমকে দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে নৌকার প্রার্থী আজমত উল্লা খানের পক্ষে কাজ করতে বলা হয়েছিল। এটি না করে তিনি ‘বিদ্রোহী’ হন। তার এমন অবস্থানের পর থেকেই আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা নানা হুঁশিয়ারি দিচ্ছিলেন। এক পর্যায়ে তাকে দল থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হয়।
নিজের প্রার্থিতা ফিরে না পেলেও মা জায়েদা খাতুনকে নিয়ে প্রতিদিন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত গাজীপুরের অলিগলিতে চষে বেড়িয়েছেন জাহাঙ্গীর। নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন বলেও অভিযোগ আওয়ামী লীগের সাবেক এই নেতার।
ইতোমধ্যে গতরাতে গাজীপুরে ভোটের প্রচার-প্রচারণা শেষ হয়েছে। আগামীকাল এই সিটিতে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। ব্যালটে জাহাঙ্গীর আলম না থাকলেও মায়ের আড়ালে তাকেই প্রার্থী হিসেবে গণ্য করছেন অনুসারীরা। তারা জানিয়েছেন, জায়েদা খাতুনকে ভোট দিয়ে তারা জাহাঙ্গীরের ওপর যে ‘অবিচার’ করা হয়েছে এর জবাব দেবেন।
জাহাঙ্গীর সমর্থকরা জানান, গত ১৯ মে টঙ্গী পূর্ব থানার ৪৪ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম গোপালপুর এলাকায় জায়েদা খাতুনের গাড়িবহরে হামলার ঘটনা ঘটে। এ সময় প্রার্থী জায়েদা খাতুন, তার ছেলে সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলম, তার ক্যামেরাম্যান সুলতানসহ বেশ কয়েকজন আহত হন।
পরদিন ২০ মে টঙ্গী ৫৭নং ওয়ার্ডের গরুর হাট রোডে প্রচারণা চালাতে যান জায়েদা খাতুন ও তার ছেলে মো. জাহাঙ্গীর আলম। এ সময়ও তাদের ওপর হামলা করা হয়। এ ঘটনায় মজিবর ও আশরাফ নামের তাদের দুই সমর্থক আহত হয়েছিলেন। তবে এসময় স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী জায়েদা খাতুন ও তার নির্বাচনের প্রধান সমন্বয়ক সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলম গাড়িতে ছিলেন। তারপরও থেমে ছিল না জাহাঙ্গীরের প্রচারণা। কখনো মাকে নিয়ে ভোটারের দুয়ারে দুয়ারে গেছেন। আবার কখনো একা একা ভোটারদের কাছে ভোটভিক্ষা চেয়েছেন।
মঙ্গলবার (২৩ মে) রাতে স্থানীয়দের সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, জাহাঙ্গীর আলম নির্বাচনী মাঠে মরিয়া হয়ে নেমেছেন। মাকে বিজয়ী করতে দিন-রাত ভোটারদের কাছে ছুটেছেন প্রচার-প্রচারণার প্রায় দুই সপ্তাহ। দেয়াল ঘড়ি প্রতীকে ভোট চেয়ে বেড়িয়েছেন।
গাজীপুরের চৌরাস্তা এলাকার বাসিন্দা মেহেদী হাসান ঢাকা মেইলকে জানান, জাহাঙ্গীরের অনেক জনপ্রিয়তা রয়েছে। ওই জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে তার মাকে বিজয়ী করতে চান তিনি।
রবিউল ইসলাম নামের আরেক ভোটার ঢাকা মেইলকে বলেন, চলতি বছর জাহাঙ্গীরকে দলে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। তখন থেকে তিনি মাঠে রয়েছেন। তবে মনোনয়ন বাতিলের পর থেকে তার মাকে বিজয়ী করতে মাঠে রয়েছেন। তার মা বিজয়ী হলে জাহাঙ্গীরই মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, জাহাঙ্গীরের মা অনেক বয়স হয়েছে। এছাড়াও তার সিটি করপোরেশন পরিচালনা করার মতো দক্ষতা নেই। শুধু মেয়রের চেয়ার দখল করার ছাড়া আর কোনো কাজ নেই। বাকি সব কাজই জাহাঙ্গীর পরিচালনা করবেন।
শুধু মেহেদী হাসান ও রবিউলই নয়, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের বেশিভাগ বাসিন্দাই এমন মন্তব্য করছেন। তারা বলছেন, গাজীপুরে দৃশ্যত আজমত উল্লা ও জায়েদা খাতুনের লড়াই হলেও মূলত আজমত উল্লার সঙ্গে লড়াই হবে জাহাঙ্গীরের। এই লড়াইয়ে শেষ হাসি কে হাসেন তা জানার জন্য অপেক্ষা করতে হবে আগামীকাল বৃহস্পতিবার (২৫ মে) রাত পর্যন্ত।


