পারস্য উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধির মাঝে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ৩৭ বছরের পুরোনো এক রীতি ভেঙেছেন। তিন যুগের বেশি সময়ের মধ্যে প্রথমবারের মতো দেশটির বিমানবাহিনীর কমান্ডারদের বার্ষিক এক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেননি তিনি।
যুক্তরাজ্য-ভিত্তিক ইরানি সংবাদমাধ্যম ইরান ইন্টারন্যাশনালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৮৯ সালে সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে প্রতি বছরই ওই বৈঠকে অংশ নিয়েছেন খামেনি। এমনকি কোভিড-১৯ মহামারির সময়ও দেশটির বিমানবাহিনীর বার্ষিক বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন তিনি।
বার্ষিক এই বৈঠক ১৯৭৯ সালের ৮ ফেব্রুয়ারির স্মরণে অনুষ্ঠিত হয়। ওই দিন দেশটির বিমানবাহিনীর একদল কর্মকর্তা পাহলভির রাজবংশ উৎখাতে রুহুল্লাহ খোমেনির প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করেছিলেন। খোমেনি ছিলেন ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা এবং খামেনির পূর্বসূরি সর্বোচ্চ নেতা।
পরবর্তী চার দশকে ইরানে ওই দিনটি বিশেষ প্রতীকী আয়োজনে পরিণত হয়। প্রতিবছর একই তারিখে (৮ ফেব্রুয়ারি) বিমানবাহিনীর সদস্য ও কমান্ডাররা দেশের ধর্মীয় নেতৃত্বের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আসছিলেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ বছর খামেনির পরিবর্তে সেনাবাহিনীর বিমানবাহিনীর কমান্ডারদের সঙ্গে বৈঠক করেন সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান স্টাফ কর্মকর্তা আবদোলরহিম মুসাভি।
• যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনা
খামেনির এই অনুপস্থিতি এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ওই অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি করেছে এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য মার্কিন সামরিক হামলার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। খামেনির অনুপস্থিতিকে দেশটির সর্বোচ্চ নেতার সম্ভাব্য হুমকি এড়িয়ে চলা অথবা জাতীয় নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট বিষয়ের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তেহরান বারবার সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কোনও হামলা হলে তা পুরো মধ্যপ্রাচ্যে বিস্তৃত সংঘাতে রূপ নেবে। তেহরান বলেছে, ‘‘এবার যদি যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শুরু করে, তাহলে তা পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে।’’ তেহরানের এই হুমকি কার্যত ২০২৫ সালের জুনের মাঝামাঝিতে সংঘটিত ১২ দিনের ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের দিকে ইঙ্গিত করে দেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সেই সময় যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হলেও ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মতপার্থক্য রয়ে গেছে। ইরানের সঙ্গে আলোচনায় তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত করতে চায় ওয়াশিংটন। আর ইরান বলছে, তারা কেবল পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েই আলোচনা করবে। এই অচলাবস্থার কারণে উভয় পক্ষ পাল্টাপাল্টি বিমান হামলার হুমকি দিয়েছে। আলোচনার পরিধি নিয়ে মতবিরোধ থাকায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে এবং এতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানে হামলা চালানোর হুমকি বাস্তবায়নের সম্ভাবনাও উন্মুক্ত রয়েছে।
ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ায় গত জানুয়ারির শেষ দিকে নিজেদের বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনকে আরব সাগরে পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। গত সপ্তাহে বিবিসি বলেছে, এক ডজন এফ-১৫ যুদ্ধবিমান, একটি এমকিউ-৯ রিপার যুদ্ধড্রোন এবং একাধিক এ-১০সি থান্ডারবোল্ট-২ স্থল আক্রমণ বিমান জর্ডানের মুয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটিতে পৌঁছেছে।
ব্রিটিশ এই গণমাধ্যম বলেছে, স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্রবাহী ডেস্ট্রয়ার ইউএসএস ডেলবার্ট ডি ব্ল্যাক ভূমধ্যসাগর থেকে মিসরের সুয়েজ খাল পেরিয়ে লোহিত সাগরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। পাশাপাশি পারস্য উপসাগরের ওপর একটি মার্কিন নৌবাহিনীর এমকিউ-৪সি ট্রাইটন নজরদারি ড্রোন সক্রিয় রয়েছে। এর আগে ওই অঞ্চলে ই-১১এ বিমান, পি-৮ পসেইডন এবং ই-৩জি সেন্ট্রি নজরদারি ও গোয়েন্দা বিমানের উপস্থিতির খবরও পাওয়া গেছে।


