
‘গরুর মাংস কবে খেয়েছি মনে নেই। ঈদ ছাড়া খুব একটা খাওয়া হয় না। সপ্তাহে একদিন ব্রয়লার মুরগি, পাঙ্গাস মাছ খেতে পারতাম। এখন সেটাও কঠিন হয়ে গেছে। ডিমের দামও ধরাছোঁয়ার বাইরে। আমাদের মতো গরিবের কপালে আলু ছাড়া আর কিছুই নাই।’
মন খারাপ করে এভাবেই বলছিলেন রাজধানীর মুগদা ঝিলপাড় এলাকায় বাজার করতে আসা শরিফুল (ছদ্মনাম)।
শুধু মাংসের বাজারেই নয়, একই চিত্র দেখা গেছে মাছের বাজারেও। বছরখানেক আগেও যে পাঙ্গাস মাছ ১০০-১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতো, এখন সেই পাঙ্গাস কিনতে হচ্ছে প্রায় দুইশ টাকা কেজিতে। একই অবস্থা তেলাপিয়া মাছের। ১২০ টাকা কেজির তেলাপিয়া মাছ এখন দুইশ টাকার উপরে। আড়াইশ টাকার নিচে নেই রুই-কাতল-মৃগেল মাছ। পাবদা-চিংড়ি-ইলিশ তো এখন এলিট শ্রেণির খাবার। কইয়ের তেলে কই ভাজারও এখন আর উপায় নেই। চাষের কই মাছও সাধ্যের বাইরে চলে গেছে।
মাছ কিনতে আসা একজন বেসরকারি চাকরিজীবী বলেন, মাছ-মাংসসহ সব জিনিসের যে হারে দাম বাড়ছে তাতে আগে দিনে এক বেলা মাছ-মাংস খাওয়া হতো, এখন আর হয় না। অনেক হিসেব করে খেতে হয়। বেতন তো আর বাড়ে না।
মাছ-মাংস নাগালের বাইরে চলে গেলে ডিমে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে সাধারণ মানুষ। কিন্তু সেখানেও বড় ধাক্কা। ৯০-১০০ টাকা ডজনের লেয়ার মুরগির ডিম এখন দেড়শ টাকার উপরে। এক হালি ডিম কিনতে হচ্ছে ৫০-৫৫ টাকায়। যারা একসময় সারা মাসের জন্য খাঁচা ভর্তি ডিম কিনতেন তারা এখন কিনেন এক হালি ডিম। আর দেশি হাঁস-মুরগির ডিম তো এখন ‘রাজকীয় খাবার’! শুধু রাজধানীতে নয়। রাজধানীর বাইরে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও একই অবস্থা।
এদিকে বছরের ব্যবধানে কয়েক দফা বেড়েছে দুধের দাম। এক বছর আগে এক কেজি মিল্কভিটা তরল দুধের প্যাকেট বিক্রি হতো ৮০-৮৫ টাকায়। এখন তা বিক্রি হচ্ছে ৯৫ টাকায়। হাফ কেজি প্যাকেট বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকায়। অন্যান্য কোম্পানিগুলোও একই দামে বিক্রি করছে। অথচ খামারিরা বাড়তি দামের অর্ধেকও পাচ্ছেন না বলে জানা গেছে।
আবার বছরের ব্যবধানে প্রায় দেড়গুণ হয়েছে গুড়ো দুধের দাম। বাজারে এখন বিভিন্ন ব্র্যান্ডের গুড়ো দুধ ৮০০-৯০০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। যা বছরখানেক আগেও ছিল ৬০০-৭০০ টাকার মধ্যে।
যদিও দোকানদাররা বলছেন, আগে জিনিসপত্রের দাম দাম কম ছিল। লাভও বেশি হতো। চাহিদাও বেশি ছিল। এখন দাম বেশি, আবার লাভও কম। কমেছে বিক্রিও।
রাজধানীর মুগদা এলাকার দোকানি মিঠু মিয়া বলেন, আগে পণ্যের গায়ের রেট যা ছিল তার থেকে কম দামে বিক্রি করতে পারতাম। তাও লাভ থাকত। বিক্রি বেশি হত। কিন্তু এখন মানুষ কিনছে কম। আবার ঠিকমতো মালও সাপ্লাই পাওয়া যায় না। এছাড়া সবকিছুরই খরচ বেড়েছে। আমরা ব্যবসা করেও খুব ভালো অবস্থানে নেই।
একই কথা জানালেন মুরগির দোকানদার। তিনি বলেন, আগে এক কেজি ব্রয়লার মুরগি আমার কেনা পড়ত ১০০-১১০ টাকায়। তা বিক্রি করেছি ১৩০-১৪০ টাকায়। এখন এক কেজি মুরগি ২০০-২১০ টাকায় কিনে ২২০-২৩০ বিক্রি করতে হচ্ছে। মানুষ আগে বড় মুরগি খুঁজত। এখন খোঁজে ছোট মুরগি। বেচাকেনাও অনেক কমে গেছে।
প্রোটিনের চাহিদার অধিকাংশই আসে প্রাণিজ আমিষ থেকে। পুষ্টিবিদদের মতে, প্রোটিনের ঘাটতি হলে সেটা বিকল্প কিছু দিয়ে মিটানো সম্ভব না।
ঢাকা সেন্ট্রাল হাসপাতালের পুষ্টিবিদ শামসুন্নাহার নাহিদ বলেন, সাধারণত একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দৈনিক প্রোটিনের চাহিদা ১ গ্রাম/কেজি বডি ওয়েট। অর্থাৎ কারো ওজন যদি ৬০ কেজি হয়, আর সে যদি পরিশ্রমী না হন তাহলে তার দৈনিক প্রোটিনের দরকার পড়ে ৬০ গ্রাম। আর ভারি কাজ করলে আরও ৩০ গ্রাম বাড়বে, অর্থাৎ ৯০ গ্রাম প্রোটিন দরকার। এটা হচ্ছে স্বাভাবিক শারীরিক ক্রিয়া-প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিন।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা বলছে, বর্তমানে রাজধানীতে বসবাসরত চার সদস্যের একটি পরিবারের মাসে খাবারের পেছনে ব্যয় ২২ হাজার ৪২১ টাকা। মাছ-মাংস বাদ দিলেও খাদ্যের পেছনে ব্যয় হবে ৯ হাজার ৫৯ টাকা। এটা ‘কম্প্রোমাইজড ডায়েট’ বা আপসের খাদ্যতালিকা। সংস্থাটি বলছে, দেশে মূল্যস্ফীতি লাগামহীন, শিগগিরই সমাধানের লক্ষণ নেই। পাশাপাশি অনেকেই খাদ্য ব্যয় কমিয়ে আনতে খাবারের তালিকা থেকে বাদ দিচ্ছেন মাছ-মাংসসহ বিভিন্ন আমিষ।
নিয়মিত মাছ-মাংস না খেলে সাধারণ মানুষের শরীরে প্রোটিনের ঘাটতি থেকে যাবে। এতে চরম পুষ্টিহীনতার শঙ্কা দেখা দিতে পারে।
এ বিষয়ে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস চেয়ারম্যান কাজী আব্দুল হান্নান বলেন, নিত্যপণ্যের দাম যে হারে বাড়ছে, বিশেষ করে ব্রয়লার মুরগি, মাছ, মাংস এমনকি ডিমসহ ন্যূনতম যে আমিষ বা প্রোটিন তা নিম্নবিত্ত এমনকি সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। সাধারণ মানুষ এসব নিয়মিত খেতে পারছে না। এর একটা চরম প্রভাব মানুষের স্বাস্থ্যের উপর পড়তে পারে। স্বাভাবিকভাবেই পুষ্টিহীনতার একটা শঙ্কা রয়েছে। কাজেই সরকারের উচিৎ যে কোনো উপায়ে জরুরি দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ করা। সেটা আমদানি করে হোক আর যেভাবেই হোক।


