যশোরে কালবৈশাখী তাণ্ডব চালিয়েছে। পাঁচ মিনিটের ঝড়ে মোট ক্ষতির পরিমাণ দশ কোটি টাকা বলে কৃষক ও কৃষি বিভাগ সূত্র জানিয়েছে। এতে সদর উপজেলা এলাকার ছয়টি ইউনিয়নের ঘরবাড়ি লন্ডভন্ড হয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে একশ’ হেক্টর সবজি ক্ষেত। আম ও লিচুর ক্ষতি হয়েছে সবচেয়ে বেশি। ক্ষেতের মাঝারি সাইজের পাট নুয়ে পড়েছে। পাঁচ ভাগ জমির কেটে রাখা ধান পানিতে ভিজে গেছে।
ঘন্টায় ৩২ কিলোমিটার গতিবেগে বয়ে যাওয়া ঝড়ে শতাধিক ঘরবাড়ির চালের টিন উড়ে গেছে ও উপড়ে গেছে শতাধিক গাছ। এছাড়া, বজ্রপাতে শৈলকুপায় একজনের মৃত্যু হয়েছে ও ট্রেন লাইনে গাছ পড়ায় খুলনার সাথে দেশের ট্রেন চলাচল ৫ ঘন্টা বন্ধ ছিল।
যশোর আবহাওয়া অফিস সূত্র জানায়, শনিবার সকাল ৬টা ৩২ মিনিটে আচমকা যশোরাঞ্চলের উপর দিয়ে কালবৈশাখী ঝড় বয়ে যায়। এ ঝড়ের স্থায়ীত্ব ছিল ৫ থেকে ৭ মিনিট। ঝড়ের গড় গতিবেগ ছিল ঘন্টায় ৩২ কিলোমিটার। যশোরের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপর দিয়ে ঝড়টি বয়ে যায়। এসময়ে বৃষ্টিপাত হয়েছে ১০ মিলিমিটার। আচমকা ঝড়ে সদর উপজেলা এলাকার পাঁচটি ইউনিয়নে ব্যাপক ক্ষতি হয়। ইউনিয়নগুলো হলো, সদর, চুড়ামনকাটি, হৈবতপুর, কাশিমপুর, ইছালী ও লেবুতলা। এসব ইউনিয়নের মানুষের ঘুম ভাঙে ঝড়ের তান্ডবে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাদের মাথার ওপরের ছাউনি টিনের চাল ঝড়ে উড়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, ভাগলপুর, মিরা লাউখালী, রসূলপুর, নাটুয়াপাড়া, বারীনগর বাজার, জোড়াদাহ হৈবতপুর, মথুরাপুর, কাশিমপুর, পাঁচবাড়িয়া, চুড়ামনকাটি, দৌলতদিহী, নওদাগাঁ, কোদালিয়া, নোঙ্গরপুর, লেবুতলা, তেজরোল, এনায়েতপুর, গোবরা।
যশোর কৃষি অফিস সূত্র জানায়, সকালে পাঁচ মিনিট স্থায়ী এ ঝড়ে মানুষ ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। যশোরের ছয়টি ইউনিয়নের মানুষের শতাধিক বাড়িঘরের চাল ঝড়ে উড়ে গেছে। ভেঙে পড়েছে আরো শতাধিক বাড়িঘর ও গাছপালা। হৈবৎপুর ইউনিয়নে রসূলপুর সুজন সংঘের টিনের চাল উড়ে গেছে। যশোর শহরের টালিখোলা এতিমখানা ও মাদ্রাসার টিন উড়ে গিয়ে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া শীতের আগাম চাষ করা সবজির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে বলে সূত্রটি জানিয়েছে। তাদের হিসেব অনুযায়ী ১শ’ হেক্টর জমির সবজি ক্ষেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এরমধ্যে পটল ক্ষেতের বেশি ক্ষতি হযেছে। এসব ক্ষেতের বান ঝড়ে উড়ে গিয়ে গোটা ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। করোলা, টমেটো ও শাঁক জাতীয় ফসলের ক্ষেত ঝড় ও বৃষ্টির পানিতে নষ্ট হয়েছে। ঝড়ে মাঠের মাঝারি সাইজের পাট গাছ নুয়ে পড়েছে। বোরোর অবশিষ্ট ৫ ভাগ কেটে রাখা ধান মাঠেই ভিজে নষ্ট হয়েছে। এছাড়া, গ্রীস্মের রসালো ফল আম, লিচু, জাম, বাংগি ও কলাসহ সব ধরণের ফল ঝড়ে পড়ে গিয়ে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সব মিলিয়ে পাঁচ মিনিটের এ ঝড়ে মোট ক্ষতির পরিমাণ দশ কোটি টাকা বলে কৃষক ও কৃষি বিভাগ সূত্র জানিয়েছে।
সদর উপজেলার ভাগলপুর গ্রামের একজন প্রবীণ ব্যক্তি জানান, এই ঝড়ে চিরচেনা গ্রামগুলো সবই অচেনা মনে হচ্ছে। চারিদিক ঘরবাড়ি ভেঙে ও গাছপালা উপড়ে ধ্বংস স্তুপে পরিণত হয়েছে। একই গ্রামের বীরমুক্তিযোদ্ধা মকছেদ আলী বলেন, আমাদের গ্রামে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে। গাছপালা, বাড়িঘর ও বিদ্যুতের খুঁটি উপড়ে পড়েছে। শাক-সবজি ও ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। চোখের সামনে বড় বড় গাছপালা ঘরবাড়ি উড়িয়ে নিয়ে গেছে ঝড়ে।
হৈবতপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবু সিদ্দিক জানান, আচমকা কালবৈশাখী ঝড়ে ইউনিয়নের ১০ থেকে ১২ টি গ্রাম লন্ডভন্ড হয়ে গেছে। এ বিষয়ে তিনি সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন। যাতে সরকার অসহায় কৃষক ও ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ায়।
যশোর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অনুপ দাশ বলেন, শনিবারের হঠাৎ ঝড়ে উপজেলার বেশ কিছু জায়গায় ক্ষতি হয়েছে। আমরা বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে আছি। তাদের তালিকা কৃষি বিভাগের মাধ্যমে প্রণয়ন করা হবে।
যশোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক দীপংকর দাস বলেন, আচমকা ঝড়ে যশোরে ছয় ইউনিয়নে ঘরবাড়ি, গাছপালা ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ঝড়ের পর থেকেই উপ সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নগুলো পরিদর্শন করে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের চেষ্টা চালিয়েছেন। এ হিসেবে যশোরে একশ’ হেক্টর জমির সবজি ক্ষেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ক্ষতি উত্তরণে কৃষি বিভাগ সব সময় কৃষকের পাশে থাকবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
এদিকে, শৈলকুপা প্রতিনিধি জানান, ঝিনাইদহের শৈলকুপায় ঝড়ের সময় বজ্রপাতে কুলচাড়া গ্রামে রূপা (৩২) নামে এক নারী নিহত হয়েছেন। এ সময় পাশে থাকা স্বামী গোলাম নবী (৩৭) আহত হন। স্বামী গোলাম নবী ও স্ত্রী রূপা সকাল ৭টার দিকে ক্ষেতে বেগুন তুলতে যান। এ সময় বজ্রপাতে স্ত্রী ঘটনাস্থলেই মারা যান এবং স্বামী গোলাম নবী আহত হন।
আলমডাঙ্গা প্রতিনিধি জানান, কালবৈশাখীর কারণে পাঁচ ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর খুলনার সাথে সারাদেশের রেল যোগাযোগ স্বাভাবিক হয়েছে। রেললাইনের ওপর থেকে ভেঙে পড়া গাছ অপসারণ করার পর শনিবার বেলা পৌনে ১১টার দিকে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়। ঝড়ের তান্ডবে আলমডাঙ্গা-হালসার মাঝামাঝি স্থানে রেললাইনের ওপর বেশ কিছু গাছ ভেঙে পড়ে। এতে সারাদেশের সঙ্গে খুলনার ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
কুষ্টিয়া প্রতিনিধি জানান, কুষ্টিয়ায় কালবৈশাখী ঝড় ও বৃষ্টিতে অনেক গ্রাম লন্ডভন্ড হয়ে গেছে। আম, লিচুসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। উড়ে গেছে শত শত ঘরের টিনের চালা। উপড়ে গেছে অনেক গাছ। গাছের ডাল পড়ে তার ছিঁড়ে অনেক স্থানে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। শনিবার সকালে প্রায় ১৫ মিনিট স্থায়ী ছিল এ ঝড়। সরেজমিনে দেখা যায়, জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ঝড়ের তান্ডবে শত শত গাছপালা ভেঙে রাস্তায় পড়ে আছে। শত শত হেক্টর জমির আম, কাঁঠাল, লিচুসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফল ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।

