খুলনার তেরোখাদা উপজেলার শেখপুরা বাজারে অবস্থিত শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী নৌকা, মাছ ধরার জাল ও ফাঁদের হাট এখনো চার জেলার হাজার হাজার মানুষের জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে ভূমিকা রাখছে। সপ্তাহে দুই দিন—শুক্রবার ও সোমবার—এই হাট বসে, যেখানে আসে আশপাশের খুলনা, নড়াইল, গোপালগঞ্জ এবং বাগেরহাট জেলার ক্রেতা ও বিক্রেতারা।
প্রায় শত বছর আগে প্রতিষ্ঠিত এই বাজারটি মূলত ঐতিহ্যবাহী কাঠের নৌকা কেনাবেচার জন্য বিখ্যাত। জলাভূমি-সমৃদ্ধ এলাকাগুলোর মানুষের জন্য এই নৌকাগুলো মাছ ধরা, কৃষিকাজ এবং চলাচলের ক্ষেত্রে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
বাজারে বিক্রি হওয়া বেশিরভাগ নৌকাই বাগেরহাট জেলার চিতলমারী উপজেলায় তৈরি হয় এবং হাটের দিনে সড়কপথে শেখপুরায় আনা হয়।
আগে এসব নৌকা কোদালিয়া ও কেন্দুয়া বিল এবং আঠারোবেকি নদী দিয়ে পানিপথে পরিবহন করা হতো। কিন্তু খাল ও নদীর স্বল্পতা দেখা দেওয়ায় এখন সেগুলো স্থানীয়ভাবে তৈরি তিন চাকার যান—নছিমন, টমটম বা ভ্যানের মাধ্যমে আনা হয়। প্রতিটি যান সাধারণত ১০-১২টি নৌকা একসাথে বহন করে সকাল ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে বাজারে পৌঁছায়।
যেসব নৌকা বিক্রি হয় না, সেগুলো ব্যবসায়ীরা আবার ফিরিয়ে নিয়ে যান বা স্থানীয় কারো জিম্মায় রেখে দেন পরবর্তী হাটের জন্য। সংরক্ষিত নৌকাগুলোকে নিয়মিত পানি দিয়ে ভিজিয়ে রাখতে হয়, না হলে কাঠ ফেটে যেতে পারে।
সময়ের পরিবর্তন হলেও নৌকার নকশা তেমন একটা বদলায়নি। তেরোখাদা, নেবুদিয়া, শিয়ারী, চরকুলিয়া, কালিয়া, নড়াগাতি, গোপালগঞ্জ, মোল্লাহাট, রূপসা ও দিঘলিয়ার মানুষ এখনও তাদের দৈনন্দিন কাজে এই নৌকার উপর নির্ভর করেন, যার ফলে এর চাহিদা অব্যাহত রয়েছে।
গতকাল (১ আগস্ট) বাজার পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, এক ব্যবসায়ী শাহিদুল আলম জানান, তিনি চিতলমারী থেকে ২০টি নৌকা এনেছিলেন, যার মধ্যে দুপুর ১টার মধ্যে ১১টি বিক্রি করেছেন। ১০ থেকে ১৩ হাত দৈর্ঘ্যের নৌকাগুলোর প্রতিটি থেকে তিনি ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা লাভ করেছেন। অবিক্রিত নৌকাগুলো ফেরত নিতে গেলে বাড়তি খরচ হয়।
দ্বিতীয় প্রজন্মের ব্যবসায়ী বারকত আলী পটু বলেন, তিনি নিজেই বাড়িতে মহগনি কাঠ ও মজুর দিয়ে নৌকা তৈরি করেন। এটি তার পিতামহ ও পিতার পেশা ছিল।
ক্রেতাদের মধ্যে তেরোখাদার কাটেঙ্গার অবনীভূষণ পল জানান, জলাভূমির কাজে মাছ ধরা ও কৃষিকাজের জন্য নৌকা অত্যন্ত জরুরি। তিনি একটি নৌকা ৩,৫০০ টাকায় কিনেছেন। নড়াইলের নড়াগাতি থেকে আসা মোতিয়ার রহমান খান বলেন, তিনি মাছ ধরার পাশাপাশি গরুর ঘাস আনতেও নৌকা ব্যবহার করেন।
এই বাজার আরও অনেক পার্শ্ববর্তী পেশাজীবীর জীবিকার উৎস। বারাসাতের ভ্যানচালক শরীফুল ইসলাম বলেন, প্রতি নৌকা পৌঁছে দিতে তিনি ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকা আয় করেন, দূরের গন্তব্য হলে আরও বেশি। একবারে একাধিক নৌকা পরিবহন করলে আয় বাড়ে।
বাজারের ইজারাদার মো. এসকান্দার মোল্লা জানান, প্রতি হাটে প্রায় ৬০-৭০টি নৌকা বিক্রি হয়। প্রতিটি নৌকার জন্য ৩০ থেকে ৪০ টাকা হাট কর ধার্য থাকে, তবে আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে কর মওকুফ করা হয়।
তিনি আরও জানান, “এই নৌকার বাজার প্রতি বছর জুনের মাঝামাঝি থেকে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত তিন মাস সক্রিয় থাকে। এ সময়ে প্রায় ৪০ কোটি টাকার নৌকা বিক্রি হয়।”
প্রতিটি নৌকার সাথে কমপক্ষে আটটি শ্রেণির পেশাজীবী অর্থনৈতিকভাবে জড়িত—কাঠ পরিবহনকারী, স’মিল শ্রমিক, কাঠমিস্ত্রি, ব্যবসায়ী, পরিবহনকর্মী, ব্যবহারকারী, ইজারাদার এবং স্থানীয় খাবারের দোকানদার—ফলে শেখপুরা নৌকা বাজার এই অঞ্চলের মৌসুমি অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।


