শবে বরাতে বাঙালি মুসলমানরা ভালো খাবারের আয়োজন করে থাকে। এদিন অনেকে হালুয়া রুটি, গরুর মাংসসহ সাধ্য অনুযায়ী ভালো ভালো খাবার রান্না করে থাকেন। সেসব খাবার পাড়া-প্রতিবেশীদের মধ্যে দেওয়া-নেওয়ার প্রচলন রয়েছে। বাজারেও এর প্রভাব রয়েছে। অসাধু ব্যবসায়ীরা শবে বরাত সংশ্লিষ্ট সব পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন।
বেড়েছে মাংসের দাম
রাজধানীর বাজারগুলোতে পবিত্র শবে বরাতকে সামনে রেখে গরুর মাংসের দাম উঠেছে ৭০০ টাকা কেজি। কোথাও কোথাও এক কেজি গরুর মাংস কিনতে ৭১০ টাকা লেগেছে। গত সপ্তাহে এই গরুর মাংস ৬৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছিল। তার আগের সপ্তাহে এই গরুর মাংস ৬২০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছিল। রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত গরুর মাংসের দোকানে ভিড় লেগে আছে। মানিকনগর এলাকার মাংস ব্যবসায়ী আকবর আলি বলছেন, তিনি গরুর মাংস ৭০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছেন। চাহিদা বেড়ে যাওয়া ছাড়াও গরুর দাম পড়ছে বেশি, এ কারণে মাংসের দাম বেড়ে গেছে।
শুধু গরুর মাংস নয়, শবে বরাতের অজুহাতে মুরগি ও খাসির মাংসের দামও বেড়েছে। খাসির মাংসের কেজি ১১০০ টাকা। গত সপ্তাহে এই মাংস ১০০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। কিছু দিন আগেও ৯০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়েছে খাসির মাংস।
এদিকে শবে বরাতের দোহাই দিয়ে ব্রয়লার মুরগির দাম বেড়েছে কেজিতে ১০ টাকা। গত সপ্তাহে ব্রয়লার মুরগির কেজি ছিল ১৬০ টাকা। শুক্রবার (১৮ মার্চ) ব্যবসায়ীরা সেই ব্রয়লার বিক্রি করছেন ১৭০ টাকা কেজি দরে। পাকিস্তানি মুরগির দামও কেজিতে ২০ টাকা বেড়েছে। আগে ৩০০ টাকায় বিক্রি হলেও শুক্রবার ৩২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত সপ্তাহে দেশি মুরগির কেজি ছিল ৫০০ টাকা, এই সপ্তাহে বিক্রি হচ্ছে ৫৫০ টাকা।
রাজধানীর গোপীবাগ এলাকায় বসবাস করেন হানিফ হাওলাদার। তিনি বলেন, এমনিতেই জিনিসপত্রের দাম নাগালের বাইরে চলে গেছে। নতুন করে শবে বরাত অজুহাতে মাংসসহ সব পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তার মতো সীমিত আয়ের মানুষের জন্য এত দাম দিয়ে বাজার সদাই করাটা কষ্টের বলে তিনি জানান।
বাজারের চিত্র বলছে, শবে বরাতের হালুয়া তৈরির আরেকটি অনুষঙ্গ গাজরসহ বিভিন্ন সবজির দামও বেড়েছে। গত সপ্তাহে ২০ টাকা কেজি বিক্রি হলেও আজ সেই গাজর ৪০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে।
এছাড়া আসন্ন রোজাকে সামনে রেখে দাম বৃদ্ধির তালিকায় যুক্ত হয়েছে ময়দা, ডাল, ছোলা, খেজুরসহ বেশ কিছু পণ্য। তবে দাম কমেছে পেঁয়াজের। নতুন করে দাম বাড়েনি ভোজ্য তেলের। অস্থির হয়ে ওঠা ভোজ্য তেলসহ নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকার বিভিন্ন পণ্যের আমদানিতে শুল্ক ছাড় ও তদারকি জোরদার করেছে।
কর ছাড়ের সুবিধা পাচ্ছেন না ভোক্তারা
ভোক্তার জন্য এখনও কোনও সুখবর নেই সয়াবিন তেল ও চিনির বাজারে। যদিও সয়াবিন তেলের উৎপাদন, খুচরা ও সর্বশেষ আমদানি পর্যায়ে সরকার মোট ৩০ শতাংশ কর ছাড় দিয়েছে ব্যবসায়ীদের। কিন্তু বাজারে এর তেমন প্রভাব এখনও দেখা যায়নি। আগের মতোই বোতলজাত সয়াবিনের এক লিটার ১৬৮ থেকে ১৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে সামান্য কমছে খোলা সয়াবিন ও পাম অয়েলের দাম। প্রতি কেজি খোলা সয়াবিন ১৬৫ থেকে ১৭০ এবং পাম অয়েল ১৫৫ থেকে ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অবশ্য বড় বোতলজাত সয়াবিনের দাম সামান্য কমেছে।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, দুই লিটার বোতলজাত সয়াবিনের দাম কমেছে ৫ থেকে ১০ টাকা। গত সপ্তাহে দুই লিটার বোতলজাত সয়াবিন বিক্রি হয়েছে ৩৩০ টাকা, এই সপ্তাহে বিক্রি হচ্ছে ৩৩০ টাকা। অর্থাৎ লিটারে দাম কমেছে আড়াই টাকার মতো। ৫ লিটার বোতলজাত সয়াবিনের দাম কমেছে ১০ টাকা। খুচরা ব্যবসায়ীরা গত সপ্তাহে ৫ লিটার বোতলজাত সয়াবিন বিক্রি করেছেন ৭৯০ টাকা, বর্তমানে এই সয়াবিন বিক্রি হচ্ছে ৭৮০ টাকা।
চিনি দাম আগের মতোই
এদিকে চিনি আমদানিতে শুল্ক ৩০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশ নির্ধারণ করেছে সরকার। কিন্তু এর প্রভাব দেখা যায়নি বাজারে। আগের মতোই ৮০ টাকায় চিনির কেজি বিক্রি হচ্ছে।
ময়দার দাম বেড়েছে ৪ টাকা
গত সপ্তাহে খোলা ময়দা বিক্রি হয়েছে ৪২ টাকা কেজি। এই সপ্তাহের সেই খোলা ময়দা বিক্রি হচ্ছে ৪৬ টাকা কেজি দরে। অর্থাৎ নতুন করে কেজিতে দাম বেড়েছে ৪ টাকা। তবে গত সপ্তাহে প্যাকেটজাত ময়দা বিক্রি হয়েছে ৫২ টাকা কেজি। এখন এই ময়দা বিক্রি হচ্ছে ৫৪ টাকা কেজি দরে।
বেড়েছে সব ধরনের ডালের দাম
দুই সপ্তাহের ব্যবধানে মসুর ডালের কেজিতে দাম বেড়েছে ১০ থেকে ১৫ টাকা। আমদানি করা বড় দানার মসুর ডালের কেজি ১১০, আর দেশি ছোট দানার ডালের কেজি বিক্রি হচ্ছে ১২৫ থেকে ১৩০ টাকায়। সরকারি বিপণন সংস্থা টিসিবির তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহের তুলনায় ছোলার দাম বেড়েছে কেজিতে ১০ টাকা। ব্যবসায়ীরা গত সপ্তাহে ৭০ টাকা কেজিতে যে ছোলা বিক্রি করেছেন, এই সপ্তাহে সেই ছোলা বিক্রি করছেন ৮০ টাকা কেজি দরে।
বেড়েছে শুকনো মরিচ, আদা ও জিরার দাম
গত সপ্তাহের চেয়ে ১০ টাকা বেশি দামে দেশি আদা ১০০ এবং চায়না আদা ১২০ টাকায় বিক্রি করছেন বিক্রেতারা। শুকনো মরিচের দাম বেড়েছে কেজিতে ২০ টাকা। গত সপ্তাহে ১৫০ টাকায় শুকনো মরিচ পাওয়া গেলেও এখন সেই শুকনো মরিচ কিনতে হচ্ছে ১৭০ টাকা দিয়ে। এছাড়া গত সপ্তাহে ৩২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হওয়া জিরা এই সপ্তাহে বিক্রি হচ্ছে ৩৫০ টাকা কেজি দরে। অর্থাৎ এক সপ্তাহের ব্যবধানে জিরার দাম বেড়েছে কেজিতে ৩০ টাকা মতো।
চালের দাম কমেনি
মিনিকেট চালের কেজি ৬৫ থেকে ৬৮, নাজিরশাইল ৭০ থেকে ৭৫ টাকা, বিআর-২৮ জাতীয় চাল ৫০ থেকে ৫৫ এবং মোটা চাল ৪৮ থেকে ৫২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
সবজির দাম চড়া
দু-একটি ছাড়া বেশিরভাগ সবজির কেজি ৪০ টাকার ওপরে। ফুলকপির পিস কিনতে ক্রেতার খরচ হচ্ছে ৫০ টাকা। এ ছাড়া চিচিঙ্গা ৫০ থেকে ৬০, শিম ৩৫ থেকে ৪০ টাকা, মুলা ২৫ থেকে ৩০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। প্রতি পিস লাউ কিনতে খরচ হবে ৫০ থেকে ৬০ টাকা। নতুন সবিজ ঢ্যাঁড়সের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৭০ টাকা। করোলা কিনতে ক্রেতার খরচ হচ্ছে ৬০ থেকে ৮০ টাকা। অবশ্য আলু বিক্রি হচ্ছে গত সপ্তাহের মতো ১৮ থেকে ২০ টাকা কেজি দরে।
কমেছে পেঁয়াজের দাম
রাজধানীর কাওরান বাজারসহ কয়েকটি খুচরা বাজারে ব্যবসায়ীরা বলছেন, দুই সপ্তাহ আগের বেড়ে যাওয়া পেঁয়াজের দাম কিছুটা কমেছে। গত সপ্তাহের ব্যবধানে পণ্যটির দাম কমেছে কেজিতে ১০ থেকে ১৫ টাকা। বাজারে প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ ৪৫ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি করছেন খুচরা বিক্রেতারা। গত সপ্তাহে দাম ছিল ৫৫ থেকে ৬৫ টাকা। গত সপ্তাহে আমদানি করা পেঁয়াজ ৫০ থেকে ৫৫ টাকায় বিক্রি হলেও এখন কমে দাঁড়িয়েছে ৪০ থেকে ৪৫ টাকায়।
পিএসএন/এমঅাই


