সমাজের নৈতিকতা, ধর্মীয় অনুশাসন ও সামাজিক সংহতির অন্যতম কেন্দ্র মসজিদ। আর সেই মসজিদের প্রাণ ইমাম ও মুয়াজ্জিনরা। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, জুমার খুতবা, জানাজা, বিয়ে থেকে শুরু করে জন্ম-মৃত্যুর প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে যারা মানুষের পাশে থাকেন, সেই সম্মানিত পেশাজীবীদের বড় একটি অংশ আজও নামমাত্র বেতনে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতির মধ্যেও যুগের পর যুগ আর্থিক অবহেলায় পড়ে আছেন দেশের লাখো ইমাম-মুয়াজ্জিন।
ধর্মীয় দায়িত্ব পালনকে ইবাদত হিসেবে গ্রহণ করায় নানা বঞ্চনার পরেও তারা এই পেশায় যুক্ত আছেন। বিশ্বনবী (সা.) ও সাহাবিরা এ দায়িত্ব পালন করেছেন বলে তারা আত্মমর্যাদার সঙ্গে বলতে পারেন, ‘আমি এই মসজিদের ইমাম/মুয়াজ্জিন।’ কিন্তু যোগ্য ইমাম-মুয়াজ্জিন নিয়োগ ও বেতনের প্রয়োজন বাস্তবে পূরণ হয় না।
সমাজে ইমাম-মুয়াজ্জিন সম্মানী ব্যক্তি। শহর ও শহরতলীর মসজিদে ইমাম-মুয়াজ্জিনরা প্রায়ই ফ্রি খাওয়া-থাকা ও স্বল্প বেতনে দায়িত্ব পালন করেন। দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় মেলে না বেতনের সঙ্গে, আর মসজিদ কমিটির চাপেও মানসিক স্বস্তি পান না তারা।
সময়ের পরিক্রমায় সবকিছু পরিবর্তন হলেও বদলাচ্ছে না দেশের প্রায় ১০ লাখ ইমাম-মুয়াজ্জিনের ভাগ্য। আমাদের বাংলাদেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য যেভাবে হু হু করে বাড়ছে এবং সেই চাহিদা বিবেচনায় সরকারি-বেসরকারি কর্মচারী ও শ্রমিকদের বেতন-ভাতায় সামঞ্জস্যতা-ভারসাম্যতা রক্ষা করা হলেও কেবল মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিনরা অবহেলায় থাকছেন যুগ যুগ ধরে।
শহরের বড় ও প্রতিষ্ঠিত মসজিদে তুলনামূলক ভালো বেতন দেওয়া হলেও গ্রাম ও ছোট বাজারের অধিকাংশ মসজিদে বেতন ৭-৮ হাজারের মধ্যে, যা একটি পরিবারের জীবনধারণে যথেষ্ট নয়। কিছু মসজিদে আলাদা বাসস্থানেরও ব্যবস্থা নেই; অনেকে মসজিদের ছোট কোণে বসবাস করেন, যেখানে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নেই।
প্রত্যন্ত এলাকায় এমনও মসজিদ আছে যেখানে ইমামদের বেতন এখনো ৪-৫ হাজারের গণ্ডি পেরোইনি।
রাজধানীতে একটি ছোট বাসায় থাকতে গেলেও বিদ্যুৎ, গ্যাস, বাড়িভাড়া, সন্তানের পড়াশোনা-সব মিলিয়ে মাসিক ব্যয় যেখানে ২০-২৫ হাজার টাকার কম নয়। সেখানে এই আয় দিয়ে সংসার চালানো প্রায় অসম্ভব। বাধ্য হয়ে বেশিরভাগ ইমাম পরিবার গ্রামে রেখে থাকেন মসজিদেই। অনেকেই অতিরিক্ত আয়ের জন্য টিউশনি, দোকানে হিসাব রাখা কিংবা খণ্ডকালীন কাজ করছেন।
হাফেজ মো. রবিউল ইসলাম। দেশের উত্তরের জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটি মসজিদে একসঙ্গে ইমামতিও মুয়াজ্জেনের দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি মাদরাসায় শিক্ষকতাও করেন। সবমিলিয়ে বেতন পান ১২ হাজার টাকা। এই টাকা দিয়েই পাঁচ সদস্যের সংসার চালাতে হয় তাকে। এর মধ্যে অসুস্থ মায়ের চিকিৎসা, পাঁচ সদস্যের সংসারের নিত্যপণ্য, পড়াশোনা-সব সামলাতে হয়। বাধ্য হয়ে কখনো মসজিদ-মাদরাসায় থাকেন, আবার কখনো বাড়ি থেকেই যাতায়াত করেন।
নীলফামারীর একটি মসজিদের ইমাম আবদুল আউয়াল বলেন, আগের থেকে ইমামদের বেতন সম্মানি কিছুটা বাড়ছে। তারপরও নিত্যপণ্যের যে দাম, সে তুলনায় অনেক কম। তবে গ্রামের মসজিদগুলোতে এখনো বেতন অনেক কম, যা দিয়ে সংসার চালানো অনেক কঠিন।
বেশ কয়েকটি জেলার গ্রামের মসজিদগুলোতে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, প্রায় মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিনের বেতন ১০ হাজার টাকার নিচে। এই টাকা দিয়ে সংসার চালাতে তাদের অনেক কষ্ট করতে হয়।
গ্রামের কয়েকটি মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিনরা জানান, বেতনে স্বল্পতার পাশাপাশি মসজিদ কমিটির পক্ষ থেকেও নানাভাবে মানসিক চাপ সহ্য করতে হয়। এমনকি অধিকাংশ মসজিদ কমিটির অনেক সদস্য আছেন, যারা ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেন না। সব সময় ভুল ধরার পেছনে লেগে থাকেন। সামান্য বিষয় নিয়ে অনেক ইমাম-মুয়াজ্জিনকে চাকরি হারাতে হয় বলে নিয়মিত অভিযোগ পাওয়া যায়।
তবে অধিকাংশ ইমাম বিশ্বাস করেন ইমামতি ও মুয়াজ্জিনি কোনো গতানুগতিক চাকরি নয়। তারা এ পেশাটাকে ইসলামের খেদমত হিসাবে গ্রহণ করছেন। এক্ষেত্রে যদিও অভাব-অনটনে জীবন কাটে তবু তারা এই পেশাকে চাকরি হিসেবে দেখেন না।
দেশের শীর্ষ আলেমরা বলেন, ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের উপযুক্ত সম্মানী দিলে তারা মানসিক অস্থিরতা ও আর্থিক দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারবেন। ইমামদের যথাযথ সম্মান দেশের ও জাতির কল্যাণে কাজে লাগবে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশে নিত্যপণ্যের দাম হু হু করে বেড়ে যাওয়ার মাঝেও সরকারি-বেসরকারি কর্মচারী ও শ্রমিকদের বেতন-ভাতায় ভারসাম্য রক্ষা করা হলেও মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিনরা যুগ যুগ ধরে অবহেলায় রয়েছেন।
এমন অবস্থায় আশার বিষয় হচ্ছে, গত জানুয়ারিতে ইমাম-মুয়াজ্জিনদের দীর্ঘদিনের বেতন বৈষম্য দূর করার পদক্ষেপ নেয় মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। সরকারি গেজেটে মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমদের জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫-এর আওতায় বিভিন্ন গ্রেডে অন্তর্ভুক্ত করে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা চূড়ান্ত করা হয়।
গত ১৯ জানুয়ারি বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় এটি প্রকাশ করা হয়। এ নীতিমালা প্রণয়নে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের একটি কমিটি কাজ করে। এটি চূড়ান্ত করার পূর্বে দেশের প্রখ্যাত আলেম-ওলামা ও ইমাম-খতিবদের বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে একাধিক মতবিনিময়সভা করেছে এ কমিটি। তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন এসব মতবিনিময়সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।
নীতিমালায় দেশের মসজিদসমূহের খতিব ছাড়া অন্যান্য জনবলের গ্রেডভিত্তিক বেতনকাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। খতিবের বেতন নির্ধারিত হবে চুক্তিপত্রের শর্তানুসারে। তবে, আর্থিকভাবে অসচ্ছল এবং পাঞ্জেগানা মসজিদের ক্ষেত্রে সামর্থ্য অনুসারে বেতন-ভাতাদি নির্ধারণের জন্য বলা হয়েছে। নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, মসজিদের পদভিত্তিক গ্রেডগুলো নির্ধারণ করা হয়েছে অত্যন্ত সম্মানজনকভাবে।
গেজেট অনুযায়ী নির্ধারিত গ্রেডগুলো সিনিয়র পেশ ইমাম: ৫ম গ্রেড, পেশ ইমাম: ৬ষ্ঠ গ্রেড, ইমাম: ৯ম গ্রেড, মুয়াজ্জিন: প্রধান মুয়াজ্জিন ১০ম এবং সাধারণ মুয়াজ্জিন ১১ তম গ্রেড, খাদিম: প্রধান খাদিম ১৫ তম এবং সাধারণ খাদিম ১৬ তম গ্রেড, অন্যান্য কর্মী: নিরাপত্তা প্রহরী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের জন্য ২০ তম গ্রেড।


