খুলনা (০৫ ফেব্রুয়ারি)
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংসতা, ভয়ভীতি, নারী ও সংখ্যালঘু ভোটারদের ওপর হুমকি, কালো টাকা বিতরণ এবং সাইবার হামলার অভিযোগ তুলেছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি ও খুলনা-৫ আসনের (ডুমুরিয়া-ফুলতলা) ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য সমর্থিত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের সংসদ সদস্য প্রার্থী মিয়া গোলাম পরওয়ার।
তিনি অভিযোগ করেছেন, নির্বাচনের মাত্র এক সপ্তাহ আগে থেকেই মাঠপর্যায়ে ভয়াবহ অনিয়ম ও সহিংস পরিস্থিতি তৈরি হলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। প্রশাসন কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে এই নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে। এছাড়া নির্বাচিত হলে ডুমুরিয়া-ফুলতলার জলাবদ্ধতা নিরসনসহ বেশ কিছু উন্নয়ন কর্মকান্ড বাস্তবায়ন করার পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেন গোলাম পরওয়ার।
আজ বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টায় খুলনা প্রেসক্লাবের লিয়াকত আলী মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণাকালে তিনি এসব অভিযোগ করেন।
গোলাম পরওয়ার আরো অভিযোগ করে বলেন, জামায়াতে ইসলামীর আমিরের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট এবং পরবর্তীতে তার নিজের টুইটার অ্যাকাউন্ট হ্যাক করা হয়েছে। তদন্তে একটি সরকারি দপ্তরের একজন কর্মকর্তার ই-মেইল থেকে ভারতীয় উৎসের ভাইরাস ব্যবহার করে এই হ্যাকিং করা হয়েছে বলে তাদের সাইবার টিম শনাক্ত করেছে। এ ঘটনায় সাইবার আইনে মামলা করা হয়েছে এবং ডিবি পুলিশ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে ল্যাপটপসহ আটক করেছে বলেও তিনি দাবি করেন। তিনি আরও অভিযোগ করেন, ওই কর্মকর্তাকে ছাড়িয়ে নিতে উচ্চপর্যায়ে চাপ প্রয়োগ করা হয়েছিল, তবে শেষ পর্যন্ত পুলিশ তাকে মুক্তি দিতে পারেনি।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত ও ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য সমর্থিত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী মিয়া গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করে বলেন, নির্বাচনের মাত্র এক সপ্তাহ আগে থেকেই মাঠপর্যায়ে ভয়াবহ অনিয়ম ও সহিংস পরিস্থিতি তৈরি হলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন ও অন্তর্র্বতীকালীন সরকারের প্রধানের পক্ষ থেকে অবাধ, সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর নির্বাচনের আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তব পরিস্থিতি সেই আশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তার ভাষায়, নির্বাচনের এখনও এক সপ্তাহ বাকি, অথচ এখনই প্রার্থী, কর্মী ও ভোটারদের ওপর হামলা হচ্ছে। এভাবে পরিস্থিতি চলতে থাকলে জনগণ নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারবে না।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন খুলনা জেলা আমীর এমরান হুসাইন, সেক্রেটারি মুন্সি মিজানুর রহমান, সহকারী সেক্রেটারি মুন্সি মইনুল ইসলাম, সহকারী সেক্রেটারি মিয়া গোলাম কুদ্দুস, প্রিন্সিপাল গওসুল আজম হাদী, খুলনা জেলা আইনজীবি সমিতির সাবেক সহ সভাপতি এডভোকেট আবুল খায়ের ও সাবেক যুগ্ন সম্পাদক এডভোকেট শেখ জাকিরুল ইসলাম।
সংবাদ সম্মেলনে নারী কর্মীদের ওপর নির্যাতনের একাধিক অভিযোগ তুলে ধরে তিনি বলেন, দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের পক্ষে প্রচারণা চালাতে গেলে নারী কর্মীদের বোরকা ও মুখের কাপড় টেনে খুলে নেওয়া হচ্ছে। কোথাও প্রতিবাদ করলে তাদের শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হচ্ছে, এমনকি গর্ভবতী নারীদের ওপরও হামলার অভিযোগ রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও বক্তব্য ভাইরাল হয়েছে, যেখানে একজন রাজনৈতিক নেতা প্রকাশ্যে বলেছেন দাঁড়িপাল্লার পক্ষে ভোট চাইতে গেলে নারীদের পোশাক খুলে নিতে হবে।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, এটা শুধু রাজনৈতিক সহিংসতা নয়, এটি নারী মর্যাদার ওপর সরাসরি আঘাত। যারা ক্ষমতায় যাওয়ার আগেই এ ধরনের হুমকি দেয়, তারা ক্ষমতায় গেলে কী করবে সেটা ভেবেই আমরা আতঙ্কিত।
সংবাদ সম্মেলনে সংখ্যালঘু ভোটারদের নিরাপত্তা নিয়েও গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। তার অভিযোগ, খুলনা-৫ আসনের বিভিন্ন এলাকায় হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোটারদের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট দিলে ‘ভয়াবহ পরিণতির’ হুমকি দেওয়া হচ্ছে। কোথাও কোথাও মিটিং করতে গেলে তাদের জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে, দাঁড়িপাল্লার সভায় গেলে খবর আছে।
তিনি অভিযোগ করেন, অন্যদিকে কিছু এলাকায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সাবেক জনপ্রতিনিধিদের জোরপূর্বক বাড়ি থেকে তুলে এনে নির্দিষ্ট প্রার্থীর পক্ষে কাজ করতে বাধ্য করা হচ্ছে। এটা ভোট নয়, জোর করে রাজনৈতিক অবস্থান চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা, বলেন তিনি।
নিজের নির্বাচনী এলাকায় প্রচারণা বাধাগ্রস্ত হওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ফুলতলা ও ডুমুরিয়ার বিভিন্ন এলাকায় তার নির্ধারিত সভা-সমাবেশে পরিকল্পিতভাবে বাধা দেওয়া হয়েছে। একাধিক স্থানে চেয়ার-টেবিল ভেঙে সভা ভণ্ডুল করা হয়।
একটি ঘটনার বর্ণনায় তিনি বলেন, একটি এলাকায় গণসংযোগ শেষে নির্ধারিত সভাস্থলে পৌঁছানোর আগেই প্রতিপক্ষের লোকজন গিয়ে চেয়ার সরিয়ে নেয় এবং সভা করতে বাধা দেয়। বিষয়টি থানাকে জানানো হলেও পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলেও কাউকে আটক বা আইনি ব্যবস্থা নেয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
কালো টাকা ও ভোট কেনার অভিযোগ তুলে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, খুলনা-৫ আসনে সংগঠিতভাবে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ ঢালছে একটি পক্ষ। উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডভিত্তিক কোটা নির্ধারণ করে বাড়ি বাড়ি টাকা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
তার ভাষায়, দিনমজুর, গরিব মানুষ, সংখ্যালঘু নারীদের ২০০-৩০০ টাকা করে দেওয়া হচ্ছে। কেউ কেউ বিরিয়ানি আর নগদ টাকার বিনিময়ে ভোট কেনার চেষ্টা করছে। এটা নির্বাচনী আচরণবিধির চরম লঙ্ঘন।
তিনি বলেন, কালো টাকার দাপটে রাজনীতি কলুষিত হচ্ছে এবং প্রশাসন কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে এই নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রসঙ্গে জামায়াত প্রার্থী বলেন, প্রত্যেক থানার কাছে সন্ত্রাসী ও অপরাধীদের তালিকা থাকা সত্ত্বেও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার কিংবা পরিচিত সহিংসদের গ্রেপ্তারে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। তিনি দাবি করেন, নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে প্রয়োজনীয় সমন্বয় ও আন্তরিকতার অভাব রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনের শেষাংশে এই প্রার্থী নির্বাচন কমিশন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি কঠোর আহ্বান জানান। তিনি বলেন, অবিলম্বে কালো টাকা বিতরণ বন্ধ, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার এবং প্রার্থী ও ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
তার ভাষায়, সরকারের হাতে সক্ষমতা আছে। তারা চাইলে এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। কিন্তু এখনই ব্যবস্থা না নিলে এই আসনে সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে আমরা গভীরভাবে সন্দিহান।
সংবাদ সম্মেলনে জামায়াত ঘোষিত ২৬ দফা ইশতেহার ব্যখ্যা করে ডুমুরিয়া-ফুলতলায় তার কিছু পরিকল্পনার কথা জানান। এগুলো হচ্ছে-জলাবদ্ধতা স্থায়ী সমাধানে মাষ্টারপ্লান বাস্তবায়ন, বন্ধ মিল, কল-কাখানা চালু ও শ্রমিক-কর্মচারীদের বকেয়া পাওনা পরিশোধ, ডুমুরিয়ার জালিয়াখালীতে টেকসই বেড়িবাধ নির্মাণ, বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে টেকনিক্যাল ইনস্টিউট স্থাপন, ডুমুলিয়া ও ফুলতলায় দুটি মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণ, ফুলতলার শিকিরহাটে সেতু নির্মাণ, ডুমুরিয়ায় সবজি নিরাপদ রাখতে কোল্ড ষ্টেরোজ স্থাপন, খুলনা-চুকনগর সড়ক দুই লেনে উন্নতী, ৫০ শষ্য বিশিষ্ট হাসপাতাল ১০০ বেডে উন্নীত, মাদ্ক, সন্ত্রাস, দুর্ণীতি রোধ ইত্যাদি প্রতিশ্রুতি দেন।


