ইরানের বিরুদ্ধে হামলা চালানো থেকে বিরত থাকতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে সতর্ক করে দিয়েছে তেহরান। শনিবার ইরানের সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল আমির হাতামি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক সামরিক উপস্থিতির পর ইরানের সামরিক বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে।
ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা এড়ানোর জন্য চুক্তিতে যেতে হবে বলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্য করেছেন। ওয়াশিংটনের এই হামলার বিরুদ্ধে চরম হুঁশিয়ারি দিয়ে হাতামি বলেছেন, ইসলামী প্রজাতন্ত্রের পারমাণবিক সক্ষমতা কখনোই ধ্বংস করা যাবে না। যেকোনও ধরনের হামলার পাল্টা জবাব দেওয়া হবে।
তিনি বলেছেন, শত্রু যদি ভুল করে তাহলে নিঃসন্দেহে তা নিজের নিরাপত্তা, পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা এবং ইহুদিবাদী শাসকগোষ্ঠীর নিরাপত্তাকে বিপদের মুখে ফেলবে। আমির হাতামি বলেন, ইরানের সশস্ত্র বাহিনী ‘‘সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক ও সামরিক প্রস্তুতিতে’’ রয়েছে।
ইরানি কর্তৃপক্ষের দুই সপ্তাহব্যাপী সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনের রক্তক্ষয়ী অভিযানের পর সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের নেতৃত্বে মধ্যপ্রাচ্যে একটি নৌ-বহর পাঠিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর এই রণসজ্জায় ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতের আশঙ্কা বৃদ্ধি পেয়েছে। ইরান আগেই সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, হামলা হলে তারা যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি, জাহাজ এবং মিত্রদের—বিশেষ করে ইসরায়েল লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাবে।
এর আগে, শুক্রবার ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের মুখোমুখি হওয়ার চেয়ে ইরান তাদের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় বসতে চাইবে বলে তিনি মনে করেন। যদিও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, তেহরান পারমাণবিক আলোচনার জন্য প্রস্তুত। তবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা কখনোই আলোচনার বিষয় হবে না।
গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র অল্প সময়ের জন্য ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধে ১২ দিনের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে এবং ইরানের গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়। ইসরায়েলের হামলায় দেশজুড়ে বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু করা হয়। এতে ইরানের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা ও শীর্ষস্থানীয় পারমাণবিক বিজ্ঞানী নিহত হন।
তবে শনিবার হাতামি জোর দিয়ে বলেছেন, ইরানের পারমাণবিক প্রযুক্তি কখনোই নির্মূল করা যাবে না; এমনকি এই জাতির বিজ্ঞানী ও সন্তানরা শহীদ হলেও।
শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) বলেছে, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালিতে দুই দিনব্যাপী সরাসরি গোলাবর্ষণসহ নৌ মহড়া পরিচালনা করবে। এক বিবৃতিতে সেন্টকম আইআরজিসিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর কাছে যেকোনো ধরনের অনিরাপদ ও অপেশাদার আচরণ থেকে বিরত থাকার সতর্কবার্তা দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ২০১৯ সালে আইআরজিসিকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করে। ইউরোপীয় ইউনিয়নও (ইইউ) বৃহস্পতিবার একই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। ইইউর এই সিদ্ধান্তে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে তেহরান। একই সঙ্গে এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার অঙ্গীকার করেছে।
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে গত ২৮ ডিসেম্বর ইরানে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়; যা পরে সরকারবিরোধী বৃহত্তর আন্দোলনে রূপ নেয়। পরে ৮ ও ৯ জানুয়ারি এই বিক্ষোভ দেশজুড়ে চরম আকার ধারণ করে। ইরানি কর্তৃপক্ষ বলেছে, বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণভাবে শুরু হলেও পরে তা হত্যা, ভাঙচুর ও দাঙ্গায় রূপ নেয়। এই অস্থিরতা উসকে দেওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দায়ী করে বিক্ষোভকে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ বলে অভিহিত করেছে তেহরান।
দেশটির কর্তৃপক্ষের দেওয়া সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বিক্ষোভ-সহিংসতায় ৩ হাজার ১১৭ জন নিহত হয়েছেন। যদিও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্টস নিউজ এজেন্সি বলেছে, তারা ৬ হাজার ৫৬৩ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে। এর মধ্যে ৬ হাজার ১৭০ জন বিক্ষোভকারী ও ১২৪ জন শিশু।


