
ঘূর্ণিঝড় মোখার প্রভাবে কক্সবাজারের মহেশখালীর হোয়ানক ইউনিয়নে তিন লবণচাষির প্রাণহানি হয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মাহাফুজুর রহমান জানান, বৃষ্টিতে ভিজে ও ঠান্ডাজনিত কারণে তাদের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া একাধিক ব্যক্তি আহত হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। অন্যদিকে কক্সবাজারের ৩ হাজার ৫২০ জন কৃষকের ১১ কোটি ৪৪ লাখ ৬১ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার টেকনাফ ও মহেশখালীর গ্রীষ্মকালীন সবজি, পান ও লবণচাষিরা।
মারা যাওয়া চাষিরা হলেন—হোয়ানক ইউনিয়নের কালাগাজি পাড়ায় ফজল কাদেরের ছেলে মো. রিদুয়ান (৩৬), পানিরছড়া এলাকার আলতাজ কবিরের ছেলে মো. নেছার (৩৮) ও মতিনের ছেলে আনছার (৩৪)।
এদিকে খবর পেয়ে রাত ১০টার দিকে মহেশখালী হাসপাতালে ছুটে যান মহেশখালী-কুতুবদিয়ার সংসদ সদস্য আশেক উল্লাহ রফিক। তিনি মৃতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা ও সহযোগিতার আশ্বাস দেন। আহতদের চিকিৎসার খোঁজখবর নেন।
মহেশখালী থানার ওসি প্রণব চৌধুরী জানান, তিনজন লবণচাষির মৃত্যুর খবর পেয়ে আমরা হাসপাতালে গিয়ে খোঁজখবর নিয়েছি। আহতদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে সহযোগিতা করছে পুলিশ।
এদিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কক্সবাজারের উপপরিচালক মো. কবির হোসেন জানান, মোখার আঘাতে নিমজ্জিত হয়ে টেকনাফের মোট ৩৪০ হেক্টর জমির সবজি ও পানবরজের ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতির বিবরণী এরই মধ্যে সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হয়েছে।
টেকনাফের সাবরাং এলাকার পানচাষি গফুর উদ্দিন জানান, তার পানবরজ পুরোটাই ভেঙে গেছে। এতে ক্ষতির পরিমাণ ২০ লাখ টাকার বেশি। গ্রীষ্মকালীন সবজি ক্ষেত করে ফলন ভালো হয়েছিল টেকনাফের বাহারছড়া এলাকার আবদুল সালামের। তিনি বলেন, পুরো সবজি ক্ষেত ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেছে।
সেন্টমার্টিনে খোলা আকাশের নিচে হাহাকার:
মোখার প্রভাবে প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান জানান, প্রায় ৭০০ পরিবারের ঘরবাড়ি ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। ১০০ দোকান ও ৪-৫ হাজার গাছপালা ও ৭টি ফিশিং বোট ভেঙে গেছে। মাটির সঙ্গে মিশে যাওয়া এসব ঘরবাড়ির লোকজন খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছেন। ক্ষতিগ্রস্তরা জানান, আশ্রয়কেন্দ্রে কিছু শুকনো খাবার দেওয়া হলেও ঘূর্ণিঝড়-পরবর্তী সময়ে সরকারিভাবে কোনো খাদ্যসামগ্রী তারা পাননি।
আশ্রয়কেন্দ্র থেকে বাড়ি ফিরেছেন মানুষ:
কেটেছে ঘূর্ণিঝড় আতঙ্ক। নিজ নিজ বাড়িতে ফিরেছেন কক্সবাজার শহরের পৌর প্রিপারেটরি স্কুল, সৈকত স্কুলসহ বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা মানুষ। এর আগে গত শনিবার সকাল থেকে দলে দলে ছেলেমেয়ে, গৃহপালিত পশু ও আসবাবপত্র নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যান বাসিন্দারা।
চট্টগ্রাম বন্দরে কার্যক্রম শুরু:
চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ থেকে কনটেইনার ওঠানো-নামানোর কার্যক্রম শুরু হয়েছে। গতকাল সকাল ৯টা থেকে কনটেইনার ওঠানামা শুরু হয়। মোখার কারণে দুদিন ডেলিভারি বন্ধ থাকলেও বন্দরে কোনো কনটেইনার জট হবে না বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব ওমর ফারুক। তিনি বলেন, জেটি থেকে যেসব জাহাজ সাগরে পাঠানো হয়েছিল, সোমবার সকালের দিকে সেগুলোকে আবারও জেটিতে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে।
বিমানবন্দর চালু:
চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন তাসলিম আহমেদ জানিয়েছেন, সকাল থেকে বিমানবন্দর চালু হয়েছে। এর আগে মোখার সতর্ক সংকেত কমিয়ে আনার পর শাহ আমানত বিমানবন্দর সচল করার কাজ শুরু করা হয়।
৫১ ঘণ্টা বন্ধের পর লঞ্চ চলাচল শুরু:
দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌপথে লঞ্চ চলাচল শুরু হয়েছে। টানা সাড়ে ৫১ ঘণ্টা বন্ধ পর গতকাল সোমবার সকাল সাড়ে ৯টা থেকে ওই রুটে ফের লঞ্চ সার্ভিস চালু করা হয়। লঞ্চ চলাচল শুরুর বিষয়টি নিশ্চিত করে বিআইডব্লিউটিএর আরিচা অঞ্চলের বন্দর কর্মকতা এসএম সাজ্জাদুর রহমান বলেন, ‘দৌলতদিয়া-পাটুরিয়ায় ঘূর্ণিঝড় মোখার কোনো প্রভাব পড়েনি। নৌপথ পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকায় সোমবার সকাল সাড়ে ৯টা থেকে লঞ্চ সার্ভিস ফের চালু করা হয়েছে।’
ঘূর্ণিঝড়ে উল্লেখযোগ্য কোনো ক্ষয়ক্ষতি নেই: প্রতিমন্ত্রী
ঘূর্ণিঝড় মোখার আঘাতে কোনো উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হয়নি বলে জানিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী মো. এনামুর রহমান। গতকাল সোমবার সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ঝড়ে আমাদের সিগনিফিক্যান্ট কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। যেভাবে এটার পূর্বাভাস ছিল, সেই অনুযায়ী কিছু হয়নি।
এনামুর রহমান বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার শতভাগ মানুষকে আমরা আশ্রয়কেন্দ্রে আনতে পেরেছিলাম, যার জন্য হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। বাংলাদেশ এই প্রথম কোনো ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলা করল, যেখানে কোনো মৃত্যুসংবাদ নেই। সে কারণেই আমরা এটাকে বিশাল সফলতা বলছি। কারণ প্রাণহানিটাই আমাদের বড় লস। সবকিছু রিকভার করা যায়, কিন্তু মানুষের প্রাণকে ফিরিয়ে আনা যায় না।
প্রতিমন্ত্রী এনামুর জানান, প্রাণহানি না হলেও ঝড়ে অনেক গাছপালা পড়ে গেছে। ঘরবাড়িও বিধ্বস্ত হয়েছে। টেকনাফ ও সেন্টমার্টিনে ২০০০-এর মতো ঘর সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে। শুধু সেন্টমার্টিনেই ১২০০ ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে। আর সব মিলিয়ে ১০ হাজারের মতো ঘরবাড়ি আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গাছচাপায় কয়েকজনের আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তাদের স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া আর কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর আমরা পাইনি।
দুর্গতদের নিরাপদ পানি, ড্রাই কেক, খিচুড়ি দেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, মাঠপর্যায় থেকে তালিকা চাওয়া হয়েছে। সেই চাহিদা অনুযায়ী সহায়তা পাঠানো হবে। এ ছাড়া জেলাগুলোতে মানবিক সহায়তা মজুত থাকে। একান্ত জরুরি হলে সেখান থেকে সরবরাহ করা হবে। যেমন, জেলা প্রশাসকের কাছে ২০০ বান্ডল করে টিন থাকে, ১০ লাখ টাকা থাকে, ২০০ টন চাল ও ২০০০ প্যাকেট খাবার থাকে। এখান থেকে তারা জরুরি প্রয়োজন মেটাতে পারবে।
সহায়তা কবে নাগাদ মানুষের হাতে পৌঁছাবে জানতে চাইলে তিনি বলে, রিপোর্ট আসতে প্রায় ২ সপ্তাহ সময় লাগে। রিপোর্ট হাতে এলে ৩ সপ্তাহের মধ্যে কাজ শুরু হবে। আন্তঃমন্ত্রণালয়ে একটা সভা হবে। রাস্তায় যেসব গাছ পড়ে ছিল, সেগুলো কেটে এরই মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা স্বাভাবিক করা হয়েছে বলেও তিনি জানান।
-দৈনিক কালবেলা


