
গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে চমক দেখিয়েছেন সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের মা স্বতন্ত্র প্রার্থী জায়েদা খাতুন। ১৬ হাজারের বেশি ভোটে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট প্রার্থী আজমত উল্লা খানকে পরাজিত করে তিনি তুমুল আলোচনার জন্ম দিয়েছেন। তবে স্থানীয়রা বলছেন, এই চমকের পেছনে জায়েদা খাতুনের তেমন কোনো ভূমিকা নেই। মূল ভূমিকা রেখেছেন ছেলে জাহাঙ্গীর আলম। নিজে ভোটের লড়াইয়ে টিকতে না পেরে মাকে সামনে নিয়ে লড়াই চালিয়ে যান গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত এই সাধারণ সম্পাদক।
ভোটের লড়াইয়ে ক্যারিশমা দেখিয়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন জাহাঙ্গীর আলম। সম্প্রতি তাকে দল থেকে চিরতরে বহিষ্কার করা হলেও নতুন করে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে, তিনি আবার আওয়ামী লীগে ফিরছেন। গাজীপুরে জাহাঙ্গীর আলমের বিকল্প নেই- এমনটা মেনে নিয়ে ক্ষমতাসীন দল জাহাঙ্গীরকে আবার আনুকূল্য দিতে পারে বলে মনে করছেন কেউ কেউ। রাজনীতিতে জাহাঙ্গীরের ফিরে আসার এমন গুঞ্জনে উজ্জীবিত হয়ে উঠেছেন তার অনুসারীরা। প্রায় দেড় বছর ধরে কোণঠাসা হয়ে থাকা জাহাঙ্গীর অনুসারী নেতাকর্মীরা এখন নিয়ম করে ভিড় করছেন জাহাঙ্গীরের বাড়িতে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র এক নেতা বলেন, ভুলত্রুটি তো মানুষেরই হয়। দলের জন্য এই মহানগরে জাহাঙ্গীরকেই দরকার। দল থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার হলেও জাহাঙ্গীর আলম নিজেকে এখনও আওয়ামী লীগের কর্মী মনে করেন।
বিজয়ী হওয়ার পর মা জায়েদা খাতুন এবং জাহাঙ্গীর আলমের প্রতিক্রিয়া তাদের আওয়ামী লীগে ফেরার গুঞ্জন জোরালো করেছে। জাহাঙ্গীর আলম জানিয়েছেন, নৌকা পরাজিত হয়নি, ব্যক্তির পরাজয় হয়েছে। তিনি এবং তার মা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চান বলেও জানিয়েছেন। এছাড়া মাকে নিয়ে জাহাঙ্গীর আলম টুঙ্গিপাড়ায় জাতির জনকের সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাতে যাবেন বলেও জানা গেছে।
এদিকে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারাও জাহাঙ্গীর ইস্যুতে সতর্ক বক্তব্য দিচ্ছেন। তাদের কেউই জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলেননি। দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের জায়েদা খাতুনকে অভিনন্দনও জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কাতার সফরে রয়েছেন। তিনি দেশে ফিরলে জাহাঙ্গীর ইস্যুতে আলোচনা হতে পারে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
মহানগর আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী মনে করছেন, জাহাঙ্গীর ইস্যুতে তার বিরোধী শিবিরের নেতারা প্রধানমন্ত্রীকে ভুল বুঝিয়েছেন। নতুন করে দেখা করার সুযোগ পেলে জাহাঙ্গীর আলমের দলে ফেরা সহজতর হতে পারে। স্থানীয় তৃণমূল নেতাকর্মীরা বলেছেন, জাহাঙ্গীর ইস্যুতে আওয়ামী লীগের মধ্যে অলিখিত বিরোধ রয়ে গেছে। ফলে দ্বিধা-বিভক্ত আওয়ামী লীগকে ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী করতে তার দলে ফেরা জরুরি বলে দাবি তাদের।
জাহাঙ্গীর আলমের দলে ফেরার গুঞ্জনের ব্যাপারে জেলা যুবলীগের আহ্বায়ক ও নবনির্বাচিত কাউন্সিলর আলতাফ হোসেন বলেন, আমরা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার কন্যা দেশরত্ন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আদর্শের রাজনীতি করি। জাহাঙ্গীর আলমের দলে ফেরা বা না ফেরা সম্পূর্ণ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এখতিয়ার। তিনি যেটা ভালো মনে করবেন সেটা সবাই মেনে নেবে।
নগর উন্নয়নে মা ছেলে প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতা চাইব। আমার নির্বাচন ছিল এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে নয়। আমার জন্ম আওয়ামী লীগে, আমার মায়ের কাছে আমি দলটি শিখেছি।
জাহাঙ্গীর আলম, সাবেক মেয়র, গাজীপুর
সাবেক মহানগর আওয়ামী লীগের দফতর সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম বলেন, হেভিওয়েট অনেক নেতা আওয়ামী লীগের ভেতরে দল, উপদল, পকেট দল করে আওয়ামী লীগকে ক্ষতি করেছেন। দলের ভেতর বিভেদ সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু সিটি নির্বাচনে জাহাঙ্গীর আলমের পক্ষে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। তিনি দীর্ঘদিন দলকে ঐক্যবদ্ধ রেখেছেন। আমি মনে করি, ঐক্যবদ্ধ আওয়ামী লীগের রাজনীতি জাহাঙ্গীর আলমের কাছে নিরাপদ।
মাজহারুল ইসলাম আরও বলেন, গাজীপুরে দলীয় বেশিরভাগ কার্যক্রমই আজ ঘরবন্দি। অথচ জাহাঙ্গীর পদে থাকা অবস্থায় আনাচে-কানাচে দলের কার্যক্রম ছড়িয়ে পড়েছিল। শুধু জাহাঙ্গীরের ইমেজের কারণেই তার মাকে নগরবাসী ভোট দিয়েছেন। আর তিনি যে কতটা জনপ্রিয়, সেটা মাঠে না নামলে বোঝা মুশকিল।
মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক উপদেষ্টা রিয়াজ মাহমুদ আয়নাল বলেন, নগরবাসীর প্রয়োজনেই জাহাঙ্গীরকে দলে ফিরিয়ে নেওয়া উচিত। রাজনীতি যে মুষ্টিমেয় মানুষের জন্য নয়, সব মানুষের জন্য, সেটা জাহাঙ্গীর প্রমাণ করেছেন। তিনি দলে থাকা অবস্থায় গাজীপুর আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে প্রাণ ছিল।
জাহাঙ্গীরকে বহিষ্কার করেছে দলের হাইকমান্ড। তাই তার দলে ফেরার বিষয়ে হাইকমান্ড, অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। দল যেটা ভালো মনে করে, সেটাই মেনে নেবেন বলেও জানান এই নেতা।
আতাউল্লা মণ্ডল, সাধারণ সম্পাদক, গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগ
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র এক নেতা বলেন, ভুলত্রুটি তো মানুষেরই হয়। দলের জন্য এই মহানগরে জাহাঙ্গীরকেই দরকার। দল থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার হলেও জাহাঙ্গীর আলম নিজেকে এখনও আওয়ামী লীগের কর্মী মনে করেন।
এ ব্যাপারে মহানগর আওয়ামী লীগ নেতা ও কাউন্সিলর নূরুল ইসলাম নূরু বলেন, আওয়ামী লীগ একটি আদর্শিক সংগঠন। এখানে কিছু নিয়ম-কানুন রয়েছে। জাহাঙ্গীর আলমকে প্রথমবার বহিষ্কারাদেশ দেওয়ার পর কিছু শর্তসাপেক্ষে তাকে আবার দলে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। কিন্তু তিন চার মাস পর তিনি দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন এবং তার মাকে নির্বাচনে মাঠে আনেন। এরপর তাকে আবার চিরস্থায়ী বহিষ্কার করা হয়। এখানে জাহাঙ্গীর আলম দলের জন্য কিছু না, তার দলে ফেরা পাগলেও বিশ্বাস করবে না।
তবে মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউল্লা মণ্ডল বলেছেন ভিন্ন কথা। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, জাহাঙ্গীরকে বহিষ্কার করেছে দলের হাইকমান্ড। তাই তার দলে ফেরার বিষয়ে হাইকমান্ড, অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। দল যেটা ভালো মনে করে, সেটাই মেনে নেবেন বলেও জানান এই নেতা।
সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলম বলেন, নগর উন্নয়নে মা ছেলে প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতা চাইব। আমার নির্বাচন ছিল এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে নয়। আমার জন্ম আওয়ামী লীগে, আমার মায়ের কাছে আমি দলটি শিখেছি।
গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জাহাঙ্গীর আলমের মা জায়েদা খাতুন টেবিল ঘড়ি প্রতীক নিয়ে দুই লাখ ৩৮ হাজার ৯৩৪ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের আজমত উল্লা খান নৌকা প্রতীক নিয়ে দুই লাখ ২২ হাজার ৭৩৭ ভোট পেয়েছেন। ১৬ হাজার ১৯৭ ভোটের ব্যবধানে জায়েদা খাতুন জয়লাভ করেন।
এর আগে সিটির প্রথম নির্বাচনে বিএনপির অধ্যাপক এম এ মান্নানের বিপরীতে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন আজমত উল্লা খান। দ্বিতীয় নির্বাচনে বিএনপির হাসান উদ্দিন সরকারকে হারিয়ে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম।
@ঢাকা মেইল


